পিঠে স্প্রে মেশিন, পরনে হাফহাতা গেঞ্জি ও লুঙ্গি। পায়ে নেই রাবারের বুট, হাতে গ্লাভস নেই। চোখে সুরক্ষা চশমা কিংবা মুখে মাস্কও নেই। এভাবেই আমন ধানের ক্ষেতে কীটনাশক ছিটাচ্ছেন কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার এক কৃষক। বাতাসে ছড়িয়ে পড়া বিষাক্ত কণার অনেকটাই লাগছে তাঁর খোলা শরীর, চোখ ও মুখে। কিছু অংশ শ্বাসের সঙ্গে প্রবেশ করছে শরীরে।
উপজেলার বিভিন্ন এলাকার আমন ধানের ক্ষেতে এখন প্রায় প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে এমন চিত্র। ফসলের পোকা দমনে কৃষকেরা নিয়মিত কীটনাশক ব্যবহার করলেও ব্যক্তিগত সুরক্ষার বিষয়টি অনেকের কাছেই গুরুত্ব পাচ্ছে না। কেউ নিরাপদে কীটনাশক ব্যবহারের নিয়ম জানেন না, আবার কেউ জানলেও তা মানছেন না। এতে তাৎক্ষণিক অসুস্থতার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন কৃষি ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকেরা কোমরে বেঁধে বা কাঁধে ঝুলিয়ে স্প্রে মেশিন নিয়ে ধানক্ষেতে কীটনাশক ছিটাচ্ছেন। তাঁদের অধিকাংশের পরনে হাফহাতা গেঞ্জি ও লুঙ্গি। মুখে মাস্ক নেই। অনেকে বাতাসের গতিপথও বিবেচনায় নিচ্ছেন না। ফলে স্প্রে করা কীটনাশক বাতাসে ফিরে এসে তাঁদের শরীরের উন্মুক্ত অংশে লাগছে।
শুধু স্প্রে করার সময়ই নয়, কাজ শেষ করার পরও সতর্কতার ঘাটতি দেখা গেছে। অনেক কৃষক হাত-মুখ ভালোভাবে ধুয়ে নেন না। কীটনাশক ব্যবহারের সময় পরা পোশাক আলাদাভাবে পরিষ্কার করার বিষয়েও সচেতনতা কম। ফলে শরীরে লেগে থাকা রাসায়নিকের সংস্পর্শ দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কীটনাশক ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় সুরক্ষা ছাড়াই তাঁরা ফসলে বিষ প্রয়োগ করছেন। এতে চোখ, ত্বক ও শ্বাসতন্ত্রে তাৎক্ষণিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কাও রয়েছে।
কৃষকদের ভাষ্য, কীটনাশকের বিষাক্ত উপাদান শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। বছরের পর বছর একইভাবে কীটনাশক ব্যবহার করলেও সুরক্ষা সরঞ্জামের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। আবার দীর্ঘদিন ব্যবহার করেও বড় কোনো সমস্যায় না পড়ায় তাঁরা বিষয়টিকে খুব একটা ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন না।
নিমসার গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, ধানক্ষেতে দীর্ঘ সময় কীটনাশক ছিটালে চোখ ও মুখ জ্বালাপোড়া করে। রাতে কাশিও হয়। তবে এসব সমস্যা কীটনাশকের কারণে হচ্ছে কি না, তা তিনি জানেন না।
একই কথা বলেছেন রাজাপুর গ্রামের কৃষক আবদুল খালেক। তাঁর ভাষ্য, কীটনাশক ছিটানোর পর মাঝেমধ্যে হাত, চোখ ও মুখে জ্বালাপোড়া হয়। পানি দিয়ে ধুয়ে নিলে আবার ঠিক হয়ে যায়। বড় কোনো সমস্যা হয়নি বলে তাঁরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। তবে চিকিৎসকেরা বলছেন, এ ধরনের উপসর্গকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. মালেকুল আফতাব ভূঁইয়া বলেন, ‘সুরক্ষা ছাড়া খোলামেলাভাবে কীটনাশক ব্যবহার মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এর বিষাক্ত উপাদান শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এতে চোখ ও ত্বকে জ্বালাপোড়া, কাশি, বমিসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। অসুস্থতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।’
স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি অতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত কীটনাশক ব্যবহারে পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কাও রয়েছে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ফসল ও পোকার ধরন অনুযায়ী সঠিক কীটনাশক নির্বাচন এবং নির্ধারিত মাত্রায় প্রয়োগ না করলে মাটি ও পানির গুণগত মান নষ্ট হতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে ফসলের জন্য উপকারী কীটপতঙ্গ ও জীববৈচিত্র্য।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আফরিণা আক্তার বলেন, কৃষকদের সচেতন করতে গ্রামে গ্রামে মাঠ সমাবেশ ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। ফসল ও এলাকার ধরন অনুযায়ী কীটনাশক নির্বাচন, সঠিক মাত্রা এবং প্রয়োগ পদ্ধতি হাতে-কলমে শেখানো হয়। কীটনাশক ব্যবহারের সময় প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারের পরামর্শও দেওয়া হয়। কিন্তু অনেক কৃষক এখনো এসব নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করছেন না।
কৃষি বিভাগের সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি কীটনাশক বিক্রেতারাও কৃষকদের ব্যবহারের নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। কালিকাপুর বাজারের কীটনাশক ব্যবসায়ী মো. ফারুক ও শংকুচাইল বাজারের আ. লতিফ বলেন, কৃষকেরা কীটনাশক কিনতে এলে ব্যবহারের নিয়ম ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষার বিষয়ে তাঁদের পরামর্শ দেওয়া হয়। প্যাকেট বা বোতলের গায়েও ব্যবহারবিধি লেখা থাকে।
তবে শুধু পরামর্শ দিয়ে পরিস্থিতির কতটা পরিবর্তন সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কৃষি বিভাগের মতে, কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমাতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বা আইপিএম পদ্ধতির ব্যবহারে গুরুত্ব দিতে হবে। এতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি পরিবেশের ওপর চাপও কমানো সম্ভব হবে।
ফসল রক্ষায় কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে আনার পাশাপাশি নিরাপদ ব্যবহারবিধি মেনে চলা জরুরি। সুরক্ষা ছাড়া নিয়মিত বিষাক্ত রাসায়নিকের সংস্পর্শে এসে কৃষকেরাই যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন, তাহলে ফসল উৎপাদনের পুরো ব্যবস্থাপনাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই কৃষকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা, রাসায়নিকের বিকল্প খুঁজে বের করা এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা জোরদার করাকে জরুরি বলে মনে করছেন কৃষিবিদরা।
এমএ
