Published on
:
3 min read
সুমন ঘোষ, খড়্গপুর
ময়দান ছেড়ে অন্যরা চলে যাওয়ায় আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন বাসব রামবাবু। নিজের ক্ষমতার বৃত্ত আরও বাড়াতে পা রাখেন রাজনীতিতে। এক সময়ে ফরওয়ার্ড ব্লকের নেতা হিসেবে তাঁর নাম উঠে এসেছিল। ফরওয়ার্ড ব্লকের একটি মিটিংয়ে যোগ দিতে খড়্গপুরে এসেছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। বুদ্ধবাবুর সঙ্গে সেই মঞ্চে দেখা গিয়েছিল রামবাবুকেও। যা নিয়ে সেই সময় হইচই কম হয়নি রাজনৈতিক মহলে। ঘটনার প্রতিবাদে সিপিএমের কয়েকজন নেতা মিটিং বয়কট করেছিলেন। প্রশ্ন উঠেছিল, রামবাবুকে কি তা হলে ভিতর থেকে সমর্থন করছে সিপিএম? যদিও সিপিএম নেতৃত্বের দাবি, ওই সময় মুখ্যমন্ত্রীর সভা বয়কট করেই তারা বুঝিয়ে দিয়েছিল, তাদের দলে মাফিয়াদের কোনও জায়গা নেই।
যদিও এ সব নিয়ে রামবাবুর মাথা ঘামানোর সময় ছিল না। কেননা তখন রাজনীতিতে আরও বেশি অক্সিজেন পেয়ে গিয়েছেন তিনি। সাধারণ মানুষের মনে তাঁকে নিয়ে আরও বেশি ভয়মিশ্রিত 'শ্রদ্ধা'র সঞ্চার হয়েছিল। এর মধ্যেই খুন হন সিপিআই নেতা তথা প্রাক্তন সাংসদ নারায়ণ চৌবের দুই ছেলে। প্রথম খুন হন মানস চৌবে। রামবাবুর একাধিপত্যের বিরুদ্ধে টেন্ডার ফেলতে গিয়েই তিনি খুন হয়েছিলেন বলে অভিযোগ। তারপরে ২০০১-এ খুন হন মানসের দাদা গৌতম। তিনিও রামবাবুর বিরুদ্ধে গিয়ে রেলের কাজে টেন্ডার ফেলায় স্বচ্ছতা আনতে গিয়ে বিবাদে জড়ান। তাঁকেও গুলি চালিয়ে খুন করা হয় মালঞ্চ এলাকায়। দু'টি ক্ষেত্রেই অভিযোগে আঙুল ওঠে রামবাবুর দিকে।
গৌতম খুনের ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে রাজনীতিও। কারণ, তিনি তখন তৃণমূলের। পুলিশের উপর চাপ বড়াতে থাকে। অবশেষে গ্রেপ্তার হন রামবাবু। সাজা হয় রামবাবু সহ একাধিক সাগরেদের। সেই সময় রামবাবুর সাম্রাজ্যের কিছুটা নড়বড়ে অবস্থায় তাঁর জায়গা দখলের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন আর এক জন। উত্থান হয় শ্রীণু নাইডুর। শ্রীণুর নামে একাধিক ছিনতাই, বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ঘোরার অভিযোগ ওঠে। তার মধ্যেই তিনি তৈরি করে ফেলেন বড় গ্যাং।
আধিপত্য কায়েম করার সেই আবহে ছন্দপতন ঘটে ২০১৭য়। নিজের তালুক নিউ সেটলমেন্ট এলাকাতেই জনা কয়েক মুখোশধারীর গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান শ্রীণু। গুরুতর আহত হন শ্রীণুর সহযোগী ভি ধর্ম রাও। পরে তাঁর মৃত্যু হয় হাসপাতালে। যে ঘটনায় পুলিশের অনুমান ছিল, এটাও গ্যাং ওয়ারের ফল। শ্রীণু খুন হওয়ার পরে আর সেভাবে প্রকাশ্যে বড় গ্যাং ওয়ারের ঘটনা ঘটেনি। তা ছাড়া দিনে দিনে রেলের ঠিকাদারি থেকে স্ক্র্যাপের নিলামও অনলাইন ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ায় এলাকার দখলদারি থাকলেও মুনাফা কমছিল মাফিয়াদের। ফলে পরবর্তী কালে তাদের নজর গিয়ে পড়ে জমিতে। অনেকেই জমি কেনাবেচা, প্রোমোটারি বা উদ্যোগপতিদের জমি পাইয়ে দিতে ময়দানে নেমে পড়েন। কিন্তু আধিপত্যের লড়াই ছিল সেখানেও। জমি নিয়ে বিবাদেই ২০২২-এ খুন হতে হয় শ্রীণুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ভেঙ্কটপ্রসাদ রাওকে। অভিযোগে নাম জড়ায় 'শুভ গ্যাং'-এর। একদা জেলবন্দি রামবাবু এখন জামিনে মুক্ত। তাঁর সঙ্গে ফোনে কথা বলার চেষ্টা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তাঁর এক ঘনিষ্ঠ ফোন ধরে বলেন, 'দাদা এখন অসুস্থ। সুস্থ হওয়ার পরে কথা বলতে পারবেন।'
দিন কয়েক আগে ওল্ড সেটলমেন্ট এলাকায় সাগরের সঙ্গে স্কুটারে যাওয়ার সময় অক্ষয়ের বুকে গুলি লাগে বলে রটে যায়। পুলিশ জানায়, ওই বেআইনি অস্ত্র ছিল শ্রীণু ঘনিষ্ঠ প্রসাদের বাড়িতে। প্রসাদের ছেলে সাগরই সেটি দেখিয়েছিলেন অক্ষয়কে। সাগর বাথরুমে গেলে অক্ষয় সেটা নাড়াচাড়া করতে গিয়ে আচমক ট্রিগারে চাপ পড়ায় দু'রাউন্ড গুলি চলে। যার একটি লাগে অক্ষয়ের শরীরে। যা থেকে পুলিশের কাছে এটা প্রমাণিত, এখনও বেআইনি অস্ত্র ঘোরাফেরা করছে মাফিয়া গ্যাংয়ের সদস্যদের হাতে। ঘটনার পরে জেলা পুলিশ সুপারের ঘোষণা, 'এ বার তালিকা তৈরি করে প্রত্যেক মাফিয়া ও তার সাগরেদের বাড়িতে তল্লাশি চলবে। বেআইনি অস্ত্র থাকলেই তা উদ্ধারের পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা খড়্গপুরে আর অন্ধকার দিন ফিরতে দেব না। খড়গপুরের সাধারণ মানুষ থাকবেন শান্তিতে।' একই প্রতিধ্বনি প্রবীণ বামনেতা অনিল দাসের গলাতেও, 'আমরা চাই না খড়্গপুরে গ্যাং ওয়ার ফিরে আসুক। সেই অন্ধকার যুগ যাতে আর না ফেরে সে জন্য পুলিশকে সতর্ক থাকার আবেদন জানাব। রেলশহরের মানুষ শান্তি চান।' (শেষ)
