আগামী ৩ নভেম্বরের মার্কিন নির্বাচনের আগে নির্বাচনী অর্থায়নের অন্যতম শেষ ও গুরুত্বপূর্ণ চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে, যেখানে দুটি রাজনৈতিক দলই নিজেদের জন্য ইতিবাচক দিক খুঁজে পেয়েছে।
তহবিলের উৎস ও অর্থ প্রবাহের বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ভোটের সার্বিক আর্থিক চিত্রটি বর্তমানে ডেমোক্র্যাটদের বেশ অনুকূলে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
একদিকে ডেমোক্রেটিক প্রার্থীরা সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় বহুগুণ বেশি অনুদান সংগ্রহ করে তহবিলের দিক থেকে একপ্রকার রেকর্ড গড়েছেন।
অন্যদিকে, রিপাবলিকানদের প্রধান শক্তি হয়ে উঠেছে বাইরের বিভিন্ন সুপার প্যাক, বিশেষ করে টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্কের নেতৃত্বে গুটি কতক বিলিয়নেয়ারের কাছ থেকে আসা অভাবনীয় পরিমাণ তহবিল।
মূল্যস্ফীতি ও ট্রাম্পের নিম্নমুখী জনপ্রিয়তার কারণে রিপাবলিকান পার্টির যে রাজনৈতিক কোণঠাসা অবস্থা তৈরি হয়েছে, সেখান থেকে দলকে রক্ষা করতে বহিরাগত ফান্ডের এই বিপুল প্রবাহ মূল ভূমিকা রাখছে।
বৃহস্পতিবার মার্কিন ‘ফেডারেল ইলেকশন কমিশন’ বা এফইসি’তে জমা দেওয়া বিবরণীতে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রার্থীদের আয়-ব্যয়ের তথ্য সামনে এসেছে।
ডেমোক্র্যাটদের শক্তিশালী তৃণমূল অনুদান
নির্বাচনে যদি ডেমোক্র্যাটরা বড় জয় দাবি পেতে চায় তবে তাদের প্রথম যুক্তি হবে প্রার্থীদের সংগৃহীত বিপুল অর্থ।
তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ডেমোক্রেটিক সিনেট প্রার্থীরা চমকপ্রদ অনুদান তুলেছেন। টেক্সাসে জেমস ট্যালারিকো ৬ কোটি ২ লাখ ডলার, জর্জিয়ায় জন অসফ ৩ কোটি ৩১ লাখ ডলার ও মিশিগানে আব্দুল এল-সায়েদ ৩ কোটি ৭০ লাখ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছেন।
এ ছাড়া ওহাইওতে শেরড ব্রাউন ২ কোটি ৩১ লাখ, মেইনে ট্রয় জ্যাকসন ২ কোটি ৪০ লাখ, আলাস্কায় মেরি পেলটোলা ১ কোটি ৪১ লাখ ও নর্থ ক্যারোলাইনায় রয় কুপার ১ কোটি ২২ লাখ ডলার অনুদান পেয়েছেন।
প্রচলিতভাবে রিপাবলিকান দুর্গ হিসেবে পরিচিত কানসাসেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিল্টন ৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার সংগ্রহ করেছেন।
বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে রিপাবলিকানদের সংগৃহীত অর্থ ডেমোক্র্যাটদের ধারের কাছেও ছিল না।
টেক্সাসে কেন প্যাক্সটন ১ কোটি ২০ লাখ ডলার, মিশিগানে মাইক রজার্স ৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার, মেইনে সুসান কলিন্স ৫ কোটি ২০ লাখ ডলার এবং ওহাইওতে জন হাস্টেড মাত্র ৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার সংগ্রহ করেছেন।
নির্বাচনী প্রচারণার শেষ মুহূর্তে সরাসরি প্রার্থীর তহবিলে জমা হওয়া অর্থের কার্যকারিতা সবচেয়ে বেশি। কারণ এই অর্থ কোথায় কীভাবে খরচ হবে তা প্রার্থীর নিজস্ব প্রচার দল নির্ধারণ করে ও প্রার্থীরা সুপার প্যাকগুলোর তুলনায় অনেক কম খরচে টেলিভিশন বিজ্ঞাপনের সুযোগ পান।
রিপাবলিকানরা যদি বহিরাগত সুপার প্যাকের অর্থ দিয়ে প্রার্থীদের ১ ডলারের ঘাটতি মেটাতে চায় তবে বিজ্ঞাপনে সেই ১ ডলারের সমান প্রভাব ফেলতে তাদের ১ ডলারের চেয়েও বেশি খরচ করতে হচ্ছে।
একই ধরনের অনুদানের ব্যবধান দেখা গেছে প্রতিনিধি পরিষদেও।
কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের বিশ্লেষণে বর্তমানে ‘টপ টস-আপ’ বা চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ২১টি হাউস আসনের মধ্যে ১৩টিতেই ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বেশি অর্থ তুলেছেন।
নর্থ ক্যারোলাইনার ১১ নম্বর ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমি এগার জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ২ কোটি ১০ লাখ ডলার সংগ্রহ করেছেন, যেখানে রিপাবলিকান জেনিফার বলকম তুলেছেন কেবল ৩ লাখ ১৩ হাজার ডলার।
অনুদানের এই উল্লম্ফনের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাচনের রাজনৈতিক সমীকরণও বদলে যেতে দেখা যাচ্ছে।
কুক পলিটিক্যাল রিপোর্ট তাদের সাম্প্রতিক অনুমানে বলেছে, ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে অতিরিক্ত ২ থেকে ৬টি আসন পেতে পারে, যা তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার দ্বারে নিয়ে যাবে।
পাশাপাশি, প্রতিনিধি পরিষদে তারা ৯ থেকে ১৯টি আসন যুক্ত করে পুরো চেম্বারের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে ফিরিয়ে নিতে পারে।
রিপাবলিকান গোপন ট্রাম্পকার্ড মাস্ক
প্রার্থীদের সরাসরি তোলা অনুদানে ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে থাকলেও নির্বাচনী লড়াইয়ের হাল ছাড়েনি রিপাবলিকানরা। তাদের পাল্টা চাল হয়ে উঠেছে বহিরাগত সুপার প্যাকগুলোর নজিরবিহীন অর্থ ঢালার সক্ষমতা।
ফেডারেল ইলেকশন কমিশনের নথি অনুসারে, রিপাবলিকান পার্টির মূল সিনেট সুপার প্যাক ‘সিনেট লিডারশিপ ফান্ড’ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে রেকর্ড ২৭ কোটি ২৯ লাখ ডলার তুলেছে, যা ডেমোক্র্যাটদের ফান্ডের চেয়ে প্রায় ১২ কোটি ২০ লাখ ডলার বেশি।
অন্যদিকে, প্রতিনিধি পরিষদের ক্ষেত্রে ‘কংগ্রেশনাল লিডারশিপ ফান্ড’ বা এসএলএফ এ প্রান্তিকে তোলা ৯ কোটি ৪৪ লাখ ডলারসহ মোট ১৫ কোটি ৬০ লাখ ডলারের তহবিল নিয়ে অক্টোবরে প্রবেশ করেছে।
প্রার্থীদের সরাসরি ফান্ডের বড় ঘাটতি মেটাতে রিপাবলিকান পার্টির জন্য এই বহিরাগত অর্থ যেন এক আর্থিক সুরক্ষাবলয় হিসেবে কাজ করছে।
টেক্সাস অঙ্গরাজ্য এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ, সেখানে প্যাক্সটনকে সমর্থনের জন্য এসএলএফ একাই ১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার পাঠিয়েছে ‘টেক্সাস প্যাক’-এ।
এ ছাড়া, নেবরাস্কায় সিনেটর পিট রিকেটসকে রক্ষায় দেড় কোটি ডলার ও আলাস্কায় সিনেটর ড্যান সালিভানের পেছনে ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার ঢেলেছে এসএলএফ।
এই বিপুল বাজেটের কল্যাণে শীর্ষ ৮টি সিনেট লড়াইয়ের ৭টিতে ও গুরুত্বপূর্ণ ৪২টি হাউস আসনের ২৫টিতেই টিভিতে বিজ্ঞাপন দেওয়ার প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছে রিপাবলিকানরা।
‘অ্যাডইমপ্যাক্ট’-এর তথ্যমতে, টিভিতে এত প্রচারের পরও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে জনমত জরিপের চিত্রে খুব একটা পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি।
টেক্সাস রক্ষায় কোটি কোটি ডলার ঢালছেন মাস্ক
বহিরাগত এই ফান্ডের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী উৎস হলেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক।
তৃতীয় প্রান্তিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ফান্ডে মাস্ক এককভাবে প্রায় ২৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারেরও বেশি অনুদান দিয়েছেন, যা তাকে এ মধ্যবর্তী নির্বাচনের সবচেয়ে বড় একক দাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
মাস্কের দেওয়া তহবিলের সিংহভাগই খরচ হচ্ছে তার নিজস্ব বাসস্থান ও ব্যবসার সদর দপ্তর টেক্সাসকে রক্ষার বিশেষ অভিযানে।
সেপ্টেম্বরের ৯ ও ২৩ তারিখে দুই দফায় তিনি এসএলএফ’কে মোট ১৫ কোটি ৮০ লাখ ডলার দিয়েছেন, যা পরদিনই সরাসরি পাঠানো হয় টেক্সাস প্যাক-এর ফান্ডে।
রিপাবলিকান পার্টিকে যাতে টেক্সাস বাঁচাতে অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ আসনের বাজেট কাটছাঁট করতে না হয়, তার জন্য একাই বড় আর্থিক প্রাচীর গড়ে তুলেছেন মাস্ক।
মাঠে নেমেছেন ডেমোক্র্যাট মেগা-ডোনাররাও
অন্যদিকে, দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে শেষ মুহূর্তে মাঠে নেমেছেন ডেমোক্র্যাট ঘরানার বড় অর্থদাতারাও।
ফেইসবুকের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডাস্টিন মস্কোভিচ ও তার স্ত্রী ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার ও লিংকডইনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যান ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছেন।
প্রচারণার শেষ মুহূর্তে ডেমোক্র্যাটদের বাড়তি শক্তি জোগাচ্ছে মেগা-ডোনারদের এ প্রত্যাবর্তন।
রেকর্ড ভাঙা নির্বাচনী ব্যয়
সব মিলিয়ে ২০২৫-২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচন হতে চলেছে।
অ্যাডইমপ্যাক্টের হিসাব অনুসারে, এবার রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনে সম্ভাব্য মোট খরচ ১ হাজার ১৬০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ৮৯০ কোটি ডলার ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ১১২০ কোটি ডলারকেও পেছনে ফেলবে।
বিপুল অংকের অর্থপ্রবাহ বাড়ার পাশাপাশি, এবার অনুদানের মূল উৎস আড়াল করার প্রবণতাও দেখা গেছে।
অনেক সুপার প্যাক এমন সব অলাভজনক সংগঠন থেকে লাখ লাখ ডলারের ফান্ড পাচ্ছে, যাদের নিজেদের মূল অর্থদাতার নাম প্রকাশের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই।
