শিক্ষাজীবন শেষে অধিকাংশ মানুষেরই লক্ষ্য থাকে একটি সুন্দর ও সফল কর্মজীবন গড়ে তোলা। তবে সময়োপযোগী পরিকল্পনা, সঠিক সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির অভাবে অনেকের সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়।
পেশাগত জীবনে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনের জন্য সবার আগে নিজের আগ্রহ, পছন্দ ও দক্ষতাকে গুরুত্ব দিয়ে পেশা নির্বাচন করা জরুরি। কারণ, নিজের পছন্দের বাইরে গিয়ে কোনো কাজে দীর্ঘমেয়াদে সফল হওয়া বেশ কঠিন। তাই উপযুক্ত পেশা নির্বাচন থেকে শুরু করে কর্মজীবনে ধাপে ধাপে এগিয়ে যাওয়ার কৌশল সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। এসব বিষয় নিয়েই বিস্তারিত জানাচ্ছেন তারেক বিন ফিরোজ
ক্যারিয়ার কী?
ক্যারিয়ার বলতে সাধারণত একজন মানুষের পেশাজীবনকে বোঝায়। জীবিকা নির্বাহ ও অর্থ উপার্জনের জন্য মানুষ যে পেশা বা কর্মক্ষেত্র বেছে নেয়, সেটিই তার ক্যারিয়ারের পথ। কেউ চিকিৎসক, কেউ শিক্ষক, আবার কেউ চাকরি বা ব্যবসাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে একজন মানুষ কর্মজীবনে গড়ে প্রায় তিনবার পেশার পথ পরিবর্তন করেন। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের কাঠামোর কারণে পেশা পরিবর্তনের সুযোগ অনেকের ক্ষেত্রেই সীমিত। ফলে শিক্ষাজীবনেই নির্দিষ্ট একটি পেশার জন্য প্রস্তুত হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তবে যে পথই বেছে নেওয়া হোক না কেন, ক্যারিয়ারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নিজের জ্ঞান, দক্ষতা ও যোগ্যতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে ক্রমাগত উন্নতি করা।
ক্যারিয়ার প্ল্যান কী?
ভবিষ্যতে আপনি আপনাকে কোথায় দেখতে চান, সেটা নির্ভর করে সঠিক ক্যারিয়ারের ওপর। ক্যারিয়ার-সংক্রান্ত যত ধরনের পরিকল্পনা বা প্ল্যান করা হয়, সেটাকেই এক কথায় ক্যারিয়ার প্ল্যান বলা যায়। অর্থাৎ, আপনি আপনার জীবনের অগ্রগতি বা উৎকর্ষসাধনের জন্য যে প্ল্যান করেন, সেটাই ক্যারিয়ার প্ল্যান। ক্যারিয়ার প্ল্যান দুই ধরনের হতে পারে। যথা–স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি। স্বল্পমেয়াদি ক্যারিয়ারে সফলতা অর্জন করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ারে ভালো করা যায়।
আরো পড়ুন: ক্যারিয়ার গড়ুন ভেটেরিনারিতে
ক্যারিয়ার প্ল্যানের প্রয়োজনীয়তা কী?
সঠিক পরিকল্পনা বা প্ল্যান ছাড়া কোনো কাজেই যথাযথ সাফল্য পাওয়া যায় না। আপনি যদি একটা সুন্দর বাগান বানাতে চান, তাহলে তারও প্ল্যান লাগবে। সেই ক্ষেত্রে বাগান তৈরির প্ল্যান যার যত সুন্দর, তার বাগানও তত সুন্দর হবে। ঠিক একইভাবে একটি সুন্দর ক্যারিয়ার প্ল্যান আপনার ক্যারিয়ারকে সুন্দর ও মসৃণ করে তুলতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে আপনাকে অবশ্যই সঠিক সময়ে সঠিক প্ল্যান করতে হবে।
ক্যারিয়ার প্ল্যান কখন করা উচিত?
আমাদের ক্যারিয়ার প্ল্যান প্রকৃতপক্ষে শুরু হয় শৈশব থেকে। প্রথমে আমাদের মা-বাবা, ভাইবোন কিংবা কোনো নিকটাত্মীয় থেকে আমরা ক্যারিয়ার সম্পর্কে প্রভাবিত হই। তবে আমাদের ছোটবেলার ক্যারিয়ার প্ল্যানগুলো বাস্তবতার নিরিখে না হয়ে অবচেতন মনে কিংবা অন্যদের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে ঠিক করা হয়। তাই একটা সময় দ্রুতই সেগুলোর পরিবর্তন ঘটে। ধরুন, আপনি পড়েছেন মানবিক বিভাগে, হতে চেয়েছেন ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার। প্রকৃতপক্ষে মানবিক বিভাগে পড়াশোনা করে ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া আদৌ সম্ভব নয়।
আমরা যখন ভালোভাবে বুঝতে শিখেছি, নিজের দক্ষতা ও ভালো লাগা জানতে শিখেছি, তখন আসলে সুপরিকল্পিতভাবে টেকসই ক্যারিয়ার প্ল্যান করা সম্ভব। অর্থাৎ, আপনি যখন ভালোভাবে নিজের দক্ষতা, যোগ্যতা ও ভালো লাগা সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারবেন, তখনই ক্যারিয়ার প্ল্যান করা উচিত। উচ্চ শিক্ষিতদের ক্ষেত্রে ক্যারিয়ার প্ল্যানিংয়ের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সময় উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাজীবনে। তখন দ্রুত পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের যোগ্যতা ভালোভাবে জেনে-বুঝে ক্যারিয়ারবিষয়ক যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়। কারণ, আপনি কোন বিষয়ে বা সেক্টরে উচ্চশিক্ষা নেবেন, তার ওপর ক্যারিয়ার নির্ভর করে। যেমন–কেউ যদি বিজ্ঞান বিভাগে পড়ে ইঞ্জিনিয়ারিং সেক্টরে ক্যারিয়ার গড়তে চায়, তাহলে তাকে উচ্চশিক্ষা নিতে হবে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর এবং সে অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। ঠিক একইভাবে মানবিক বিভাগ থেকে কেউ যদি আইনজীবী হতে চান, তাকে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে হবে।
কীভাবে ক্যারিয়ার প্ল্যান করা উচিত?
আপনি অন্যের মাধ্যমে প্রভাবিত না হয়ে বরং আপনার যেটা করতে ভালো লাগে কিংবা যেটায় আপনার দক্ষতা ও যোগ্যতা আছে, সেটা নিয়েই ক্যারিয়ার প্ল্যান করা বুদ্ধিমানের কাজ।
ক্যারিয়ার বলতে কেবল বিসিএস ক্যাডার হওয়া, সরকারি চাকরিজীবী হওয়া কিংবা ব্যাংকার হওয়াকে বোঝায় না। ক্যারিয়ার হতে পারে ফ্রিল্যান্সিং, সাংবাদিকতা, ক্রিকেট, ফুটবল, উদ্যোক্তা কিংবা ব্যবসা অথবা অন্য কিছু। অর্থাৎ যার যেটা ভালো লাগে। ক্যারিয়ার প্ল্যান করার ক্ষেত্রে আপনার নিজের পছন্দে জোর দিতে চেষ্টা করুন।
আরো পড়ুন: প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালে চাকরি, আবেদন শেষ ২৮ অক্টোবর
যে বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখা উচিত
প্রথমত, আপনি যে সেক্টরে ক্যারিয়ার গড়তে চাচ্ছেন, সেটা আপনার ভালো লাগে কি না। দ্বিতীয়ত, আপনি যে বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চাচ্ছেন, সেই সেক্টরে আপনার দক্ষতা বা যোগ্যতা আছে কি না। কিংবা, পরবর্তী সময়ে আপনি সেই সেক্টরের জন্য দক্ষতা ও যোগ্যতা অর্জন করতে পারবেন কি না। ভবিষ্যতে সেখানে ভালো করার সম্ভাবনা কতটুকু, সেটাও ক্যারিয়ার প্ল্যানের সময় বিবেচনায় রাখা উচিত।
ক্যারিয়ারে ভালো করার উপায়
নিজের দক্ষতা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি করার মাধ্যমে আপনি ক্যারিয়ারকে নিরাপদ ও শক্তিশালী করে তুলতে পারেন। আপনি যে সেক্টরেই কাজ করবেন বা করছেন, সেই কাজকে যেন ভালো লাগে সে অভ্যাস গড়ে তুলুন। কারণ, আপনি যে সেক্টরে কাজ করছেন, সেই কাজ যদি আপনার ভালো না লাগে বা কাজ করতে বিরক্তিবোধ আসে, তা হলে সেই সেক্টরে আপনি কখনো ভালো ক্যারিয়ার গড়তে পারবেন না।
ভালো ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আপনার সহকর্মী বা টিম মেম্বারদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। তাদের প্রতি ভালো মনোভাব পোষণ করা এবং ভালো আচরণ করা।
ভালো ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বারবার চাকরি পরিবর্তন না করা। আপনি যদি কোথাও স্থির হতে না পারেন কিংবা বারবার চাকরি বা পেশা পরিবর্তন করেন, তাহলে সেখানে ক্যারিয়ারে সফল হওয়া কঠিন। তাই কোনো চাকরি বা পেশায় প্রবেশ করার আগে কয়েকবার ঠাণ্ডা মাথায় ভেবেচিন্তে তারপর ঠিক করুন সিদ্ধান্ত–যেন কিছুদিন পরই সেই চাকরি বা পেশা পরিবর্তন করা না লাগে।
কোনো মানুষের সুচিন্তিত ও পরিকল্পিত ক্যারিয়ার ভাবনা ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনা জীবনকে এনে দিতে পারে অনেক বড় সাফল্য আর খ্যাতি। তাই কোনো মানুষের যেমন ক্যারিয়ার নিয়ে যথাসময়ে চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন, ঠিক তেমনিভাবে ক্যারিয়ারে ভালো করার জন্য সঠিক সময়ে যথাযথ পরিকল্পনা করাও প্রয়োজন। কারণ, একটি সঠিক পরিকল্পনাই জীবনকে সফলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
তারেক/
