ওয়াশিংটন, ১৪ অক্টোবর-মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আগামী ১৭ থেকে ২২ অক্টোবর ভারত সফর করবেন। এ সফরের মূল লক্ষ্য হলো দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা, জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানো এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করা।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এ তথ্য জানিয়েছে।
সফরের সময় রুবিও ভারতের মুম্বাই ও জামনগর শহরে যাবেন। সেখানে তিনি দেশটির জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, এসব বৈঠকে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে।
ভারত সফরের আগে উজবেকিস্তানের সমরকন্দে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠকে অংশ নেবেন রুবিও। সেখানে বৈঠক শেষ করে তিনি ভারতে যাবেন।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ভারত সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে রুবিও যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন। একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ নিয়েও কথা বলবেন তিনি।
এ ছাড়া দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা খুঁজতে ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
চলতি বছরের মে মাসের পর এটি হবে রুবিওর দ্বিতীয় ভারত সফর। এর আগে মে মাসে নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের আয়োজনে কোয়াডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াকে নিয়ে গঠিত কোয়াডের সদস্য দেশগুলো ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সহযোগিতা ও কৌশলগত সমন্বয় বাড়াতে কাজ করে।
রুবিওর এবারের সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ও ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করা, অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানো এবং জ্বালানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের চেষ্টা চালাচ্ছে।
সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতে সহযোগিতা দুই দেশের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
রুবিওর সম্ভাব্য সফরসূচিতে গুজরাটের জামনগর শহরের নাম থাকায় বিষয়টি নিয়ে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এই শহরে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের বিশাল তেল শোধনাগার কমপ্লেক্স রয়েছে, যা বিশ্বের বৃহত্তম একক স্থানের তেল শোধনাগার স্থাপনাগুলোর একটি।
এই কমপ্লেক্সে প্রতিদিন প্রায় ১৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করা যায়। ভারতের জ্বালানি ও তেল পরিশোধন শিল্পে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর আলোচনা চলার কারণে জামনগর সফরকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়গুলো এ সফরে গুরুত্ব পেতে পারে।
গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প টেক্সাসের ব্রাউনসভিলে একটি নতুন তেল শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। তিনি প্রকল্পটিকে গত ৫০ বছরের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম নতুন তেল শোধনাগার প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করেন।
ট্রাম্পের ঘোষণায় বলা হয়েছিল, এই প্রকল্পে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ ৩০ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে। এ বিপুল বিনিয়োগের ঘোষণায় যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের জ্বালানিসংক্রান্ত বাণিজ্যিক সম্পর্কের আলোচনা নতুন মাত্রা পায়।
রুবিওর জামনগর সফরে জ্বালানিসংক্রান্ত বিনিয়োগ এবং দুই দেশের বৃহত্তর বাণিজ্যিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো আলোচ্যসূচি বা সমঝোতার কথা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়নি।
ভারত সফরের আগে রুবিও সমরকন্দে অনুষ্ঠিতব্য ‘সি৫+১’ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেবেন। এই কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশ—উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান ও কিরগিজ প্রজাতন্ত্র—অংশ নেয়।
এই প্ল্যাটফর্মের মূল লক্ষ্য হলো মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা বাড়ানো এবং আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, বৈঠকে কৌশলগত যোগাযোগ ও সহযোগিতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর জন্য আরও শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার উপায় নিয়ে আলোচনা হবে।
সমরকন্দে অবস্থানকালে রুবিও মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাদা দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
রুবিওর মধ্য এশিয়া সফরে যুক্তরাষ্ট্রের ২০০ জনেরও বেশি ব্যবসায়ী নেতা অংশ নেবেন। এই বাণিজ্যিক প্রতিনিধিদলের সফরের লক্ষ্য হলো ওই অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করা এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজে বের করা।
যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগে মধ্য এশিয়ায় বাণিজ্যিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।
মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠক শেষে রুবিওর ভারত সফর যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক তৎপরতার অংশ। এ সফরের মাধ্যমে একদিকে মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য ও কৌশলগত যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চলবে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে জ্বালানি, বিনিয়োগ ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করার সুযোগ তৈরি হবে।
এস এম/ ১৪ অক্টোবর ২০২৬
