পুনর্মূল্যায়নের পর পাঁচটি করবর্ষের বিপরীতে গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ের জন্য পদক্ষেপ নিতে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশ স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত।
হাইকোর্টের পৃথক রায়ের বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণের করা পৃথক লিভ টু আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক আজ রোববার এ আদেশ দেন। রাষ্ট্রপক্ষের তথ্যমতে, পাঁচটি করবর্ষের বিপরীতে গ্রামীণ কল্যাণের কাছে প্রদেয় কর দাবির পরিমাণ ৬৬৬ কোটি টাকা।
একই সঙ্গে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণের করা পৃথক দুটি লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) শুনানির জন্য আগামী ১৩ ডিসেম্বর তারিখ নির্ধারণ করেছেন চেম্বার আদালত। আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে এ শুনানি হবে। গ্রামীণ কল্যাণের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি।
পুনর্মূল্যায়নের পর ২০১২-১৩, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭—এসব করবর্ষের বিপরীতে প্রদেয় কর দাবি ঘিরে কর কমিশনারের সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে গ্রামীণ কল্যাণের করা পৃথক দুটি রিট খারিজ (রুল ডিসচার্জ) করে গত ১০ সেপ্টেম্বর রায় দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি রেজাউল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
গ্রামীণ কল্যাণের করা দুটি রিট খারিজ (রুল ডিসচার্জ) করে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় ১২ অক্টোবর প্রকাশিত হয়। দুটি রিটের একটিতে দেওয়া রায় ১৫ পৃষ্ঠার, অপরটি ৩২ পৃষ্ঠার। ৩২ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের শেষাংশে আইন অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব রিট আবেদনকারীর (গ্রামীণ কল্যাণ) কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ঢাকার সংশ্লিষ্ট কর কমিশনারসহ বিবাদীদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়। ১৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের শেষাংশে আবেদনকারীর বকেয়া করসংক্রান্ত বিষয়ে নোটিশ জারির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ঢাকার সংশ্লিষ্ট কর কমিশনারসহ বিবাদীদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর গ্রামীণ কল্যাণ পৃথক দুটি লিভ টু আপিল করে। লিভ টু আপিল দুটি চেম্বার আদালতের আজকের কার্যতালিকায় ওঠে। আদালতে গ্রামীণ কল্যাণের পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ফিদা এম কামাল, আবদুল্লাহ আল মামুন ও সরদার জিন্নাত আলী। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মেহেদি হাসান।
পরে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, যত দ্রুত সম্ভব রিট আবেদনকারী গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশ স্থগিত করেছেন চেম্বার আদালত। আপাতত অর্থ আদায়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে বিষয়টি ১৩ ডিসেম্বর শুনানির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। লিভ টু আপিল নিষ্পত্তির মধ্য দিয়ে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।
পৃথক রিটে হাইকোর্টের রায়ের নির্দেশনা অংশটুকু স্থগিত করা হয়েছে বলে জানান ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ মেহেদি হাসান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, রায়ে যত দ্রুত সম্ভব, রিট আবেদনকারীর (গ্রামীণ কল্যাণ) কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বিবাদীদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অপর রায়ে আবেদনকারীর বকেয়া করসংক্রান্ত বিষয়ে নোটিশ জারির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বিবাদীদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়। দুটি রায়ের নির্দেশনা অংশটুকু স্থগিত করা হয়েছে। লিভ টু আপিল দুটি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য আগামী ১৩ ডিসেম্বর দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
মামলার পূর্বাপর
আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রামীণ কল্যাণ ও গ্রামীণ টেলিকমের মধ্যে একটা চুক্তি হয়। এ অনুসারে গ্রামীণ ফোনে বিনিয়োগ করা হয়। চুক্তির আওতায় শেয়ার থেকে প্রাপ্ত লভ্যাংশের ওপর অর্জিত মুনাফার ৪২ দশমিক ৬৫ শতাংশ পাবে গ্রামীণ কল্যাণ। তবে যে অর্থ পেয়েছে, তা লভ্যাংশ আয়—নাকি ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কর কর্তৃপক্ষের মতে, ওই অর্থ প্রকৃতপক্ষে সুদ বা বিনিয়োগের ওপর প্রাপ্ত আয় এবং এটি লভ্যাংশ হিসেবে গণ্য না করে ‘অন্যান্য উৎস থেকে আয়’ হিসেবে বিবেচিত হবে।
পুনর্মূল্যায়নের পর ওই পাঁচ করবর্ষের জন্য প্রদেয় কর দাবি ঘিরে কর কমিশনারের সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে গ্রামীণ কল্যাণ ২০১৭ সালে পৃথক দুটি রিট করে। এর প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দেন।
চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর হাইকোর্ট নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণসহ রুল নিষ্পত্তি করে রায় দেন। রায়ে কর কমিশনারের আদেশ বাতিল করা হয়। বিলম্ব মার্জনা করে শর্তসাপেক্ষে আইন অনুসারে ৬০ দিনের মধ্যে গ্রামীণ কল্যাণকে আপিল (অতিরিক্ত কর কমিশনারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে) করার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয় রায়ে।
হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পৃথক লিভ টু আপিল (আপিল করার অনুমতি চেয়ে আবেদন) করে। পৃথক লিভ টু আপিল নিষ্পত্তি করে ২০২৪ সালের ১১ মার্চ আদেশ দেন আপিল বিভাগ। গ্রামীণ কল্যাণের করা ওই রিটের মূল বিষয়বস্তুর ওপর হাইকোর্টে পুনঃ শুনানি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর ধারাবাহিকতায় শুনানি নিয়ে রিট দুটি খারিজ করে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ। অবশ্য ওই বছরের ২৯ আগস্ট তা প্রত্যাহার করে নেন একই বেঞ্চ। কারণ হিসেবে বলা হয়, দ্বৈত বেঞ্চের দ্বিতীয় বিচারক একসময় এসব মামলায় সরকারপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। যেহেতু তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, সুতরাং রায়টি ডিফেকটিভ (ক্রটিপূর্ণ) হবে। পাশাপাশি মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়।
প্রধান বিচারপতি গত ১৩ মে এক আদেশে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য বিচারপতি মো. মজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বাধীন দ্বৈত বেঞ্চে পাঠান। এই বেঞ্চ রুল খারিজ করে নির্দেশসহ রায় দেন। হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে গ্রামীণ কল্যাণের করা পৃথক লিভ টু আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে রায়ের নির্দেশনা অংশ স্থগিত হলো।
