আবুধাবির উইকেট মন্দ ছিল না ব্যাটিংয়ের জন্য। লক্ষ্যটাও খুব বেশি বড় ছিল না। কিন্তু সেটি তাড়া করতে নেমেও লজ্জার হার দেখল বাংলাদেশ। এর দায়টা অবশ্য ব্যাটারদের। নিদারুণ ব্যর্থতা উপহার দিয়েছেন তাওহিদ হৃদয়-সাইফ হাসান-মোসাদ্দেক হোসেনরা। ফলে হার দিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজ শুরু হলো বাংলাদেশের।
আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) আবুধাবির শেখ জায়েদ ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচে আগে ব্যাট করতে নেমে নির্ধারিত ৫০ ওভার শেষে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৭১ রান তুলে জিম্বাবুয়ে। জবাব দিতে নেমে ৩৩.৪ ওভারে সবগুলো উইকেট হারিয়ে ১৭২ রান তুলতে পারে বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়ে জিতেছে ৯৯ রানে।
রান তাড়ায় নেমে শুরুটা ভালোই হয়েছিল বাংলাদেশের। ৬.৩ ওভার থেকেই ৪৭ রান তুলে নিয়েছিল টাইগাররা। এরপরই পতনের শুরু বাংলাদেশের। তাসের ধরের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইন। দায়িত্ব নিতে পারেননি একজন ব্যাটারও। পুরো ইনিংসে মাত্র ৪ জন ব্যাটার দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছাতে পেরেছেন।
ইনিংসের ৬.৩ ওভারে প্রথম উইকেটের পতন হয় বাংলাদেশের। ব্লেসিং মুজারাবানির বলে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন ওপেনার সৌম্য সরকার। শুরু থেকেই উইকেটে হাঁসফাঁস করতে দেখা যাচ্ছিল তাকে। ১৭ বলে ৯ রান করেন তিনি।
সৌম্য সরকার ফিরলেও সাবলীল ব্যাটিং করছিলেন আরেক ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম। বেশ আগ্রাসী মেজাজেই ছিলেন তিনি। দু’বার জীবনও পেয়েছিলেন। তবুও ইনিংসটিকে রঙিন করতে পারেননি।
দশম ওভারের পঞ্চম বলেই একবার ক্যাচ তুলে দিয়েছিলেন তামিম। তবে সেই ক্যাচ নিতে পারেননি জিম্বাবুয়ের ফিল্ডার। বাউন্ডারি পেরিয়ে যায় বল। তবে পরের বলেই পয়েন্টে ক্যাচ দেন তামিম। নিয়ামুরির বলে ক্যাচ দেওয়ার আগে করেন ৩৮ বলে ৪৬ রান। এটিই বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান।
উইকেটে তখন প্রায় ওভার দুয়েক ব্যাট করে ফেলেছেন অভিজ্ঞ নাজমুল হোসেন শান্ত। দ্রুত দুই উইকেট হারানোর পর দায়িত্ব ছিল তার কাধে। কিন্তু তিনিও সেটি নিতে পারেননি। ১১তম ওভারে ফেরেন ব্র্যাড ইভানসের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে। ফেরার আগে করেছেন ৮ বলে ৪ রান।
দ্রুতই তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়া বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল বড় একটি জুটি। সেই দায়িত্ব এসে পড়েছিল অধিনায়ক তাওহিদ হৃদয় আর সাইফ হাসানের কাঁধে। দু’জন শুরুটাও করেছিলেন ভালোই। কিন্তু আশা জাগিয়েও হতাশ করে ফেরেন হৃদয়। এতে চাপ আরও বাড়ে বাংলাদেশের। ফেরার আগে ২১ বলে ১৩ রান করেছেন হৃদয়।
তাওহিদ হৃদয় ফেরার পর শেষ ভরসা হিসেবে উইকেটে ছিলেন সাইফ আর মোসাদ্দেক। কিন্তু সেই ভরসার তারা প্রতিদান দিতে পারলেন কোথায়? দলকে ধংস্তুপে ঠেলে দিয়ে দুজনই ফেরেন তিন ওভারের মাঝে।
ইনিংসের ২২তম ওভারে ওয়েলিংটন মাসাকাদজার বলে মোসাদ্দেক এলবিডব্লিউ হয়ে ফিরলে পতন হয় বাংলাদেশের পঞ্চম উইকেটের। ১৮ বলে ১১ রান আসে তার ব্যাট থেকে। এক ওভার পরে সেই মাসাকাদজার বলেই সাইফ ক্যাচ দেন উইকেটের পেছনে। ফেরার আগে করেন ৩৭ বলে ২৬ রান।
বাংলাদেশও ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় এখান থেকেই। হারের ব্যবধানও কমাতে পারেননি নুরুল হাসান সোহান। আগের ব্যাটারদের পথ অনুসরণ করে ৮ বলে ৫ রান করে প্রশ্নবিদ্ধ আউট হয়ে ফিরে যান সোহান।
এরপর হারের ব্যবধান কমাচ্ছিলেন রিশাদ হোসেন। তবে তিনিও বেশি দূর যেতে পারেননি। ফিরেছেন ৩৩ বলে ২৩ রান এসেছে তার ব্যাট থেকে। এরপর মুস্তাফিজ ৬ বলে ৬ রান করে ফিরলে শেষ হয় বাংলাদেশের ইনিংস।
এর আগে টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে শুরুতেই বাংলাদেশের তোপের মুখে পড়ে জিম্বাবুয়ে। বিশেষ করে পেসার তাসকিন আহমেদের বোলিংয়ের কোনো জবাব খুঁজে পাচ্ছিলেন না জিম্বাবুয়ের ব্যাটাররা। ৭ ওভারের মধ্যেই তিন উইকেট তুলে নেন তাসকিন। ধস নামান জিম্বাবুয়ের ব্যাটিংয়ের।
ইনিংসের প্রথম ওভারেই ফেরান ওপেনার ব্রায়ান বেনেটকে। ওভারের শেষ বলে তাসকিনের দারুণ ডেলিভারি আঘাত হানে বেনেটের প্যাডে। বাংলাদেশের জোড়ালে আবেদনে সাড়া দেন আম্পায়ার। সেই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে রিভিউ নিয়েও সফল হতে পারেননি বেনেট। ফিরেন ৬ বল থেকে শূন্য রানে।
পঞ্চম ওভারে বোলিংয়ে এসে ফেরান আরেক ওপেনার বেন কারেনকে। তিনিও এলবিডব্লিউয়ের ফাঁদে পড়েন। ফেরেন ১১ বলে ৬ রান করে। পরের ওভারে এসে ফেরান তাফাদজওয়া সিগাকে। তাসকিনের শর্ট বলে পুল করতে গিয়ে টাইমিং মেলাতে পারেননি। বল জমা হয় উইকেটরক্ষক নুরুল হাসান সোহানের গ্লাভসে। ১৫ বলে ১৬ রান করে ফেরেন তিনি।
শুরুতেই তিন উইকেট হারিয়ে ব্যাটিং ধসে পড়া জিম্বাবুয়ের হাল ধরেন অভিজ্ঞ ব্রেন্ডন টেইলর আর ক্রেইগ আরভিন। ধংস্তুপে দাঁড়িয়ে লড়াই করেন তারা। চতুর্থ উইকেটে দেড়শ রানের জুটি গড়েন এই দুজন। বেশ খানিকটা সময় অপেক্ষায় রাখেন বাংলাদেশকে। ৬ জন বোলার ব্যবহার করেও উইকেট পাচ্ছিল না বাংলাদেশ।
অবশেষে সপ্তম বোলার হিসেবে আক্রমণে এসেই বাংলাদেশকে সাফল্য এনে দেন সাইফ হাসান। ইনিংসের ৩৭তম ওভারে মোসাদ্দেক হোসেনের ক্যাচ বানিয়ে ফেরত পাঠান টেইলরকে। হাফসেঞ্চুরি করে সেঞ্চুরির দিকে ছুটছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত থামেন ১০১ বলে ৮১ রান করে।
নিজের পরের ওভারে এসে দ্বিতীয় শিকার ধরেন সাইফ। এবার ফেরান নতুন ব্যাটার হিসেবে উইকেটে আসা জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক সিকান্দার রাজাকে। ফেরার ৫ বলে ৪ রান করতে পারেন তিনি।
দ্রুত দুই উইকেট হারানোর পর চাপে পড়ে গিয়েছিল জিম্বাবুয়ে। সেই চাপ কাটাতে উইকেটে এসে আগ্রাসী হওয়ার চেষ্টা করেন ওয়েসলি মাদাভেরা। তবে বেশি সময় তাকে উইকেটে থাকতে দেননি রিশাদ। ৪৩তম ওভারে ফেরান সৌম্য সরকারের ক্যাচ বানিয়ে। ফেরার আগে ১৫ বলে ১৭ রান করেন তিনি।
বাকিদের যাওয়া-আসার ভীরে একপ্রান্ত আগলে রেখে সেঞ্চুরির দিকে ছুটছিলেন ক্রেইগ আরভিন। তবে নার্ভাস নাইন্টিতে তাকে আটকে দেন বাঁহাতি পেসার শরিফুল ইসলাম। ৪৪তম ওভারে উইকরক্ষক নুরুল হাসান সোহানের ক্যাচ বানিয়ে ফেরত পাঠান তাকে। ফেরার আগে ১০৬ বলে ৯৩ রান করেন তিনি। পরের ওভারে বোলিংয়ে এসে আরও এক উইকেট তুলে নেন শরিফুল। এবার ফেরান ব্র্যাড ইভানসকে (৯ বলে ৫)।
এতে আড়াইশ পার করার শঙ্কায় পড়েছিল জিম্বাবুয়ে। তবে শেষদিকে দ্রুত রান তুলে স্কোরবোর্ড বড় করেন ওয়েলিংটন মাসাকাদজা ও নিউম্যান নিয়ামুরি। নবম উইকেটে ২৬ বলে ৩৭ রানের অপরাজিত জুটি গড়েন তারা। ১৭ বলে ২১ রানে নিয়ামুরি আর ১৫ বলে ২১ রানে অপরাজিত থাকেন মাসাকাদজা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
জিম্বাবুয়ে : ৫০ ওভারে ২৭১/৮ (বেনেট ০, কারেন ৬, সিগা ১৬, টেইলর ৮১, আরভিন ৯৩, রাজা ৪, মাদাভেরা ১৭, ইভানস ৫, নিয়ামুরি ২১*, মাসাকাদজা ২১*; তাসকিন ১০-২-৪৪-৩, শরিফুল ১০-১-৪৭-২, মুস্তাফিজ ১০-২-৪৪-০, মোসাদ্দেক ৬-০-৩৬-০, রিশাদ ৯-০-৬৬-১, সৌম্য ২-০-১৫-০, সাইফ ৩-০-১৭-২)
বাংলাদেশ : ৩৩.৪ ওভারে ১৭২/১০ (সৌম্য ৯, তানজিদ ৪৬, শান্ত ৪, হৃদয় ১৩, মোসাদ্দেক ১১, সাইফ ২৬, সোহান ৫, শরিফুল ০, রিশাদ ২৩, মুস্তাফিজ ৬, তাসকিন ১৬*; মুজারাবানি ৮-০-২৩-১, ইভানস ৬.৪-১-৪৫-৪, নিয়ামুরি ৬-১-৫৬-১, রাজা ৭-০-২৮-২, মাসাকাদজা ৬-০-১৮-২)
ফলাফল : জিম্বাবুয়ে ৯৯ রানে জয়ী।
ম্যাচসেরা : ক্রেইগ আরভিন
