ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা এবার আরও শক্তিশালী ও দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন থেকে পাঠানো বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ব্যবহার করে এমন সব মিসাইল তৈরির চেষ্টা চলছে, যা দিয়ে সরাসরি সৌদি আরব ও ইসরাইলে হামলা চালানো সম্ভব।
যুদ্ধক্ষেত্রের অস্ত্রশস্ত্র ও এর সরবরাহ চেইন নিয়ে কাজ করা গবেষণা সংস্থা ‘কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চ’ (সিএআর)-এর এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য।
জানা গেছে, তৈরি হতে যাওয়া এই অস্ত্রগুলো মূলত ইরানের তৈরি ‘খাইবার শেকান’ মিসাইলের আদলে তৈরি। এটি একটি অত্যন্ত নিখুঁত নিশানাভেদী ব্যালিস্টিক মিসাইল, যা শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে অনায়াসেই দিক পরিবর্তন করতে পারে।
ইরানি এই ডিজাইনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি মিসাইলগুলো প্রায় ১ হাজার ২০০ মাইল পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে সক্ষম। ফলে এর আওতার মধ্যে চলে আসবে পুরো সৌদি আরব এবং ইসরাইল।
এমন এক সময়ে এই প্রযুক্তির বিস্তার ঘটল, যখন গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সৌদি আরবের ওপর হুথিদের হামলার মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। এর পাশাপাশি, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর ইরানের লাগাতার হামলা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সোশ্যাল ট্রুথ প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক পোস্টে হুথিদের আচরণকে ‘খুবই বাজে’ বলে তীব্র সমালোচনা করেছেন।
চীনা যন্ত্রাংশ যেভাবে হুথিদের শক্তি বাড়াচ্ছে
গত বছর দুটি চালান আটকের পর ইয়েমেনি কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের জুলাই মাসে সিএআর-এর কাছে কিছু তথ্য সরবরাহ করে। আর সেই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে এই প্রতিবেদন। ওই সময় অন্য পণ্যের আড়ালে খুব সুকৌশলে মিসাইল তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম লুকিয়ে পাচার করা হচ্ছিল।
আটককৃত এই সামগ্রীগুলোর মধ্যে ছিল মিসাইলের মোটর ও এয়ারফ্রেমের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ধাতব যন্ত্রাংশ এবং ফ্লাইট চলাকালীন মিসাইলকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্যকারী লেজ বা ফিন। এ ছাড়াও গবেষকরা ‘খাইবার শেকান’ মিসাইল সিরিজের সলিড-প্রপেল্লান্ট রকেট মোটরের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন যন্ত্রাংশও শনাক্ত করেছেন।
কর্তৃপক্ষ এ সময় বিভিন্ন পরীক্ষার সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি এবং কাঁচামালও জব্দ করে। এর মধ্যে এমন অ্যাবলেটিভ উপাদানও ছিল, যা চরম গতিতে ওড়ার সময় সৃষ্ট তীব্র তাপ থেকে মিসাইলের সংবেদনশীল অংশগুলোকে রক্ষা করতে পারে।
সিএআর-কে দেখানো শিপিং নথিপত্র অনুযায়ী, এই যন্ত্রাংশগুলো সরবরাহ করেছে চীনের এমন একটি নির্ভুল ধাতু প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান, যারা নিজেদের কাস্টম অ্যারোস্পেস যন্ত্রাংশ তৈরির বিশেষজ্ঞ হিসেবে দাবি করে। তবে প্রতিবেদনে সেই কোম্পানির নাম প্রকাশ করা হয়নি।
আমদানিকৃত এই যন্ত্রাংশগুলোর কিছু অংশ অবশ্য সাধারণ বেসামরিক কাজেও ব্যবহার করা সম্ভব। তবে এর মধ্যে বেশ কিছু যন্ত্রাংশ বিশেষভাবে কেবল মিসাইলের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল। আর এতেই প্রশ্ন উঠেছে যে, এই সরঞ্জামগুলো কীভাবে এবং কোন উৎস থেকে সরবরাহ করা হলো।
‘খাইবার শেকান’ কেন এত বিপজ্জনক অস্ত্র?
২০২২ সালে তেহরানে প্রথম প্রকাশ্যে আসা খাইবার শেকান তুলনামূলকভাবে কম খরচে তৈরি একটি অস্ত্র। এর চলার পথ বদলানোর অদ্ভুত ক্ষমতার কারণে প্রচলিত ব্যালিস্টিক মিসাইলের চেয়ে একে আটকে দেওয়া এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমগুলোর জন্য বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
জাতিসংঘের ইয়েমেন নিষেধাজ্ঞা প্যানেলের সাবেক বিশেষজ্ঞ হেনরি থম্পসন জানান, প্রমাণ মিলছে যে হুথিরা অন্তত গত দুই বছর ধরে চীন থেকে সলিড-ফ্যুল ব্যালিস্টিক মিসাইলের যন্ত্রাংশ আমদানি করে আসছে।
তিনি আরও বলেন, মাঝারি পাল্লার এই ব্যালিস্টিক মিসাইলগুলোর মাধ্যমে ক্রুজ মিসাইল বা ড্রোনের চেয়েও অনেক বড় পে-লোড বা বিস্ফোরক নিয়ে হুথিরা সৌদি আরবের গভীরে আঘাত হানতে পারবে। ফলে তারা এক আরও বড় ও মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হতে চলেছে।
হুথিদের অস্ত্র সরবরাহে চীনের ভূমিকা
হুথিদের অস্ত্র কর্মসূচিকে টিকিয়ে রাখতে বিদেশি সরবরাহকারীদের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন এবং অস্ত্র বিশেষজ্ঞদের সংগৃহীত তথ্য বলছে, বিদ্রোহী এই গোষ্ঠীর কাছে যাওয়া আটককৃত পণ্যের সবচেয়ে বড় উৎস হয়ে উঠেছে চীনা কোম্পানিগুলো। তথ্যে আরও দেখা যায়, হুথিদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া ড্রোন যন্ত্রাংশের বেশিরভাগ সরবরাহকারীই চীনের মাটিতে অবস্থিত।
হুথিরা গত কয়েক বছরে চীন এবং অন্যান্য সরবরাহকারীদের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্র লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজে হামলা চালাতে সাহায্য করার অভিযোগে একটি চীনা কোম্পানির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এনেছিল।
অন্যদিকে বেইজিং সবসময়ই দাবি করে আসছে যে, ইয়েমেনি এই গোষ্ঠীর কাছে অস্ত্র বিক্রির ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা তারা পুরোপুরি মেনে চলে। তবে বেসামরিক ও সামরিক ব্যবহারের মধ্যকার সীমারেখাটি বেশ সূক্ষ্ম, কারণ হুথিদের আমদানি করা কিছু পণ্য উভয় কাজেই ব্যবহার করা যেতে পারে, আবার কিছু পণ্য সরাসরি কেবল অস্ত্র সিস্টেমে ব্যবহারের জন্যই তৈরি।
মিসাইল যন্ত্রাংশ আমদানির পুরোনো প্রমাণ
হুথিরা যে বিদেশ থেকে বিশেষায়িত মিসাইল যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে আসছে, সাম্প্রতিক এই আটক কেবল তারই প্রথম ইঙ্গিত নয়।
২০২৪ সালের শেষের দিকে সিএআর-এর বিশেষজ্ঞরা তুলনামূলক কম পাল্লার ‘সদর’ মিসাইলের সঙ্গে সম্পর্কিত একই ধরনের কাস্টম-মেশিনযুক্ত যন্ত্রাংশের আমদানি নথিপত্রও নথিভুক্ত করেছিলেন। যদিও সেই যন্ত্রাংশগুলোর সরবরাহকারী কে ছিল, তা আজও অজানা রয়ে গেছে।
তবে নতুন এই আবিষ্কারগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই গোষ্ঠীর অস্ত্র সংগ্রহের প্রচেষ্টা এখন আরও উন্নত মিসাইল সিস্টেমের সরঞ্জাম সংগ্রহের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।