স্টাফ করেসপন্ডেন্ট
দেশের দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ভোগাচ্ছে সাধারণ মধ্যবিত্তদের। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসেব মেলাতে গিয়ে পকেট ফাঁকা হচ্ছে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির। দেশের গবেষণা সংস্থাগুলোর মধ্যে অন্যতম পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)। এ সংস্থাটির পরিচালিত একটি জাতীয় জরিপ ও গবেষণায় দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষার এক আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে । দেশে দারিদ্র্য বিমোচনের গতি থমকে যাওয়ার পাশাপাশি সৃষ্টি হয়েছে এক নতুন সামাজিক সংকট, যাকে গবেষকরা নাম দিয়েছেন ‘ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত’।
শনিবার সংস্থাটির প্রকাশিত গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১৭.৯৭ শতাংশ পরিবার বা ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে বসবাস করলেও যেকোনো একটি ছোটখাটো অর্থনৈতিক ধাক্কায় দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, চিকিৎসা খরচের বোঝা এবং আয়ের অনিশ্চয়তায় এ জনগোষ্ঠীর মধ্যে দিন দিন সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে: অনিশ্চিত জনগোষ্ঠীর বাস্তবতা
PPRC-এর 'State of the Real Economy: Dynamics of Reversals and Resilience in Bangladesh' শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে দেশের ৮টি বিভাগের গ্রামীণ ও নগর অঞ্চলের মোট ৮,০৬৭টি পরিবারের ওপর পরিচালিত জরিপের ভিত্তিতে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মে মাসের হিসাব অনুযায়ী উচ্চ দারিদ্র্যরেখা অনুযায়ী দেশে দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে ২৭.৯৩ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৯.৩৫ শতাংশ। তবে দারিদ্র্যসীমার ঠিক ওপরে অবস্থিত ১৭.৯৭ শতাংশ পরিবারকে নিয়ে গবেষকরা সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এ পরিবারগুলো আপাতদৃষ্টিতে দরিদ্র না হলেও তাদের মাথাপিছু ব্যয় জাতীয় মধ্যক ব্যয়ের । গড়ে ৪.০৭ জন সদস্যের পরিবার হিসেবে জাতীয়ভাবে হিসাব করলে দেখা যায়, প্রায় ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ বর্তমানে এ ভঙ্গুর অবস্থায় অবস্থান করছে ।
প্রতিবেদনে কিছুটা মিল রয়েছে বিশ্বব্যাংকের সামপ্রতিক করা প্রাক্কলনও। বিশ্বব্যাংকের মতে , যেকোনো বাহ্যিক বা পারিবারিক ধাক্কায় দেশের প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ পুনরায় দারিদ্র্যে পতিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
আয়-ব্যয়ের টানাটানি ও মূল্যস্ফীতির কষাঘাত
প্রতিবেদনে দেখা যায়, সাধারণ পরিবারগুলোর আয় ও ব্যয়ের মধ্যে কোনো উদ্বৃত্ত অবশিষ্ট নেই বললেই চলে। দেশে একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় যেখানে ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা, সেখানে তাদের গড় মাসিক ব্যয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা; অর্থাৎ মাসশেষে একটি পরিবারের হাতে উদ্বৃত্ত থাকে মাত্র ৭০ টাকা। এ ছাড়া সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ পরিবারের ক্ষেত্রে গড় আয় ৮,৪৭৭ টাকা হলেও তাদের মাসিক খরচ দাঁড়ায় ১২,২৯৪ টাকা, যা তাদের ক্রমাগত ঋণে নিমজ্জিত করছে। এর পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি এ ভঙ্গুর মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার ৮.৭ শতাংশে অবস্থান করছে। পরিবারগুলোর মোট আয়ের সিংহভাগই চলে যায় খাদ্যের পেছনে; জাতীয়ভাবে মোট পারিবারিক খরচের ৫৪.৯ শতাংশ এবং গ্রামাঞ্চলে ৫৭.৩৫ শতাংশ ব্যয় হয় শুধুমাত্র খাদ্য কিনতে। ফলে শিক্ষা বা ভবিষ্যতের জন্য কোনো সঞ্চয় করা এদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না ।
চিকিৎসা ব্যয় ও ঋণের জালে বন্দি জীবন
ভঙ্গুর মধ্যবিত্তকে দারিদ্র্যের গভীরে ঠেলে দেওয়ার অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে চিকিৎসা ব্যয়। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫২.৫ শতাংশ পরিবারে অন্তত একজন সদস্য দীর্ঘমেয়াদী বা ক্রনিক রোগে ভুগছেন । দেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯.৩১ শতাংশ অর্থ নাগরিকদের নিজস্ব পকেট (Out-of-pocket) থেকে বহন করতে হয়।
চিকিৎসা সেবার বিপুল ব্যয় পরিবারগুলোর জন্য বড় ধরনের আর্থিক সংকট তৈরি করছে; জরিপে দেখা গেছে, পরিবারগুলোর সম্মুখীন হওয়া মোট আর্থিক সংকটের ৬৭.৪ শতাংশেরই মূল কারণ চিকিৎসা খরচ। এ স্বাস্থ্যগত ধাক্কা পরবর্তীতে ঋণের ধাক্কায় পরিণত হয়। গড়ে একটি পরিবারের ঋণের পরিমাণ তাদের মোট সঞ্চয়ের চেয়ে ৪৪.৬ শতাংশ বেশি, যা দরিদ্রতম দশকে গিয়ে ২১৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে কোনো বিপদে পড়লেই সঞ্চয় শূন্য হয়ে পরিবারগুলো ঋণের ফাঁদে আটকা পড়ছে ।
কর্মসংস্থানের নিম্নমান ও সামাজিক সুরক্ষার গলদ
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, দেশে প্রধান সংকট কেবল কাজের অভাব নয়, বরং মানসম্মত ও পর্যাপ্ত আয়ের কাজের অভাব। দেশের ৩৭.৭ শতাংশ কর্মরত প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টার কম কাজ পান, যা তাদের ছদ্ম-বেকারত্ব বা পর্যাপ্ত কাজের অভাবকে ফুটিয়ে তোলে। তাছাড়া মোট কর্মসংস্থানের ৪৪.৯ শতাংশই আত্ম-কর্মসংস্থান এবং ১৮.১ শতাংশ দিনমজুর; যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগকর্তা মাত্র ৩.১ শতাংশ।
অন্যদিকে, সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সঠিক বণ্টনের অভাবে ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত কোনো সুফল পাচ্ছে না। জরিপে দেখা গেছে, দেশের মাত্র ২৩.৫ শতাংশ পরিবার সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। আবার সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধাভোগীদের প্রায় ৪৪ শতাংশই দারিদ্র্যসীমার ওপরে অবস্থান করছে, যার মধ্যে ২৭.৫ শতাংশ ভঙ্গুর মধ্যবিত্ত এবং ১৫.৫ শতাংশ অ-দরিদ্র। এমনকি ন্যায্য মূল্যের কার্ড পাওয়ার যোগ্য দরিদ্র পরিবারগুলোর মাত্র ৫.৩ শতাংশ এ সুবিধা পাচ্ছে।
উত্তরণের পথ: প্রয়োজন নীতিগত সামাজিক সুরক্ষা
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিলুর রহমান এবং গবেষক নামিরা শামীম এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য পাঁচ স্তম্ভবিশিষ্ট ‘ট্রানজিশন কম্প্যাক্ট’ বা সমন্বিত পরিবর্তনের রূপরেখা প্রস্তাব করেছেন। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান সুপারিশ হলো পরিবারগুলোর অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমানোর জন্য একটি মৌলিক সামাজিক সুরক্ষা স্তর গড়ে তোলা এবং বাস্তব সময়ের তথ্য পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা।
প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে, শুধুমাত্র কাগজ-কলমে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ না করে সাধারণ মানুষের জীবনের ঝুঁকি কমানো, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা এবং মর্যাদা রক্ষা করাই হওয়া উচিত বর্তমান অর্থনৈতিক নীতির মূল ভিত্তি।
