দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায় একটি শয়নকক্ষ থেকে এক মা ও তাঁর দুই শিশুসন্তানের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। রোববার (১৮ অক্টোবর) সন্ধ্যা সাতটার দিকে উপজেলার অমরপুর ইউনিয়নের মোস্তফাপুর বালুপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ঘরের দেয়ালে লেখা কয়েকটি বাক্য ঘটনাটিকে আরো মর্মান্তিক করে তুলেছে। সেখানে লেখা ছিল, ‘আজ থেকে এই গল্প শেষ, আমি অভাগী মা।’
নিহত নারীর নাম স্বর্ণা আক্তার। তাঁর বয়স নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে অমিল রয়েছে। কোথাও ২৩, কোথাও ২৪ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর স্বামী শাকিল হোসেন পেশায় ইজিবাইকচালক। তাঁদের চার বছর বয়সী ছেলে সাফায়েত হোসেন এবং এক বছর বয়সী মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। মেয়েটির নাম কোনো প্রতিবেদনে রাইফা মনি, আবার কোনো প্রতিবেদনে রাইসা আক্তার বলা হয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, দুই শিশুকে শ্বাসরোধে হত্যার পর স্বর্ণা গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনার পেছনের পরিস্থিতি নিশ্চিত করতে তদন্ত চলছে।
ঘরের দরজা ভেঙে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার
স্থানীয় সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, শাকিল হোসেনের মাদকাসক্তি নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হতো বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। রোববার সকালেও তাঁদের মধ্যে ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে শাকিল বাড়ি থেকে বের হয়ে বাজারে চলে যান।
সন্ধ্যার দিকে স্বর্ণা দুই সন্তানকে নিয়ে শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে দেন। দীর্ঘ সময় তাঁদের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে শাকিলের মা দরজার সামনে গিয়ে ডাকাডাকি করেন। ভেতর থেকে সাড়া না পেয়ে তিনি প্রতিবেশীদের খবর দেন। পরে প্রতিবেশীদের কয়েকজন দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে স্বর্ণা ও তাঁর দুই সন্তানকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান।
পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বর্ণার মরদেহ গলায় ওড়না প্যাঁচানো অবস্থায় ঝুলছিল।
দেয়ালে লেখা ছিল শেষ বার্তা
স্থানীয় অমরপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নূর আমিন শাহ জানিয়েছেন, ঘরের দেয়ালে কিছু কথা লেখা ছিল। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে লেখা ছিল, ‘আজ থেকে এই গল্প শেষ। আমার সন্তানদের পুলিশের কাছে দিয়েন না। আমি অভাগী মা। আমার সন্তানদের নিজে মারছি। মা-বাবা সরি। আমি তোমাদের ভালোবাসি।’
লেখাটি স্বর্ণার নিজের লেখা বলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে লেখাটির প্রামাণিকতা, ঘটনার সঙ্গে এর সম্পর্ক এবং মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
পারিবারিক কলহের কথা বলছেন স্থানীয়রা
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শাকিলের মাদক গ্রহণের বিষয়টি নিয়ে দাম্পত্য জীবনে বিরোধ চলছিল। রোববার সকালে তাঁদের মধ্যে ঝগড়ার ঘটনাও ঘটে। তবে পারিবারিক কলহই এ মৃত্যুর একমাত্র কারণ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। কারও বক্তব্য বা স্থানীয়দের ধারণাকে তদন্তে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
এ ঘটনায় স্বর্ণার স্বামী শাকিল হোসেনকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে বলে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে তাঁকে হেফাজতে নেওয়ার কারণ, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগের আনুষ্ঠানিক ভিত্তি এবং ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
তদন্ত করছে পুলিশ
চিরিরবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহমুদুন নবী সংবাদমাধ্যমকে বলেন, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, পারিবারিক অশান্তির জেরে ওই নারী দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যার পর নিজে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত করা হচ্ছে।
মা ও দুই শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
সানা/আপ্র/১৯/১০/২০২৬
