এক সময় মৌসুম নির্ভর ছিল কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবসা। বিশেষ করে ডিসেম্বরের শুরু থেকে মার্চ- এপ্রিল পর্যন্ত জমজমাট থাকতো হোটেল, রিসোর্ট, কটেজসহ নানা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এখন মৌসুম বলে কিছু নেই। প্রতিদিনেই কক্সবাজারের নান্দনিক সৌন্দর্য উপভোগে পর্যটকরা পরিবার-পরিজন নিয়ে ছুটে আসেন কক্সবাজারে।
একপাশে পাহাড়, অন্যপাশে সাগর মধ্যখানে মেরিন ড্রাইভ সড়ক। পথ যেতে যেতে যেন পর্যটকদের মন জুড়িয়ে যায়। তার অপার সৌন্দর্য, হিমছড়ির ঝর্ণা, পাথুরে বীচ ইনানী,পাটুয়ারটেক, প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন, আদিনাথ মন্দির, রামুর বৌদ্ধ বিহার, সাগরের লোনাজলে গা ভাসানো, বালিয়াড়ির আড্ডা ইত্যাদি যেন পর্যটকদের মনকে প্রফুল্ল করে তুলে। তাই কক্সবাজার এখন প্রতিদিনই পর্যটক মুখর।
অভিজ্ঞজনেরা জানান, কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজের সংখ্যাও। পর্যটকদের থাকার জন্য একের পর এক ভবন তৈরি হলেও এসব প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও বৈধতার চিত্র উদ্বেগজনক। পর্যটন নগরীতে হোটেল-রিসোর্টসহ ছয় শতাধিক আবাসিক প্রতিষ্ঠান আছে।
কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র ২৩টির। পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে সর্বোচ্চ ৫০টি হোটেলের। অন্যদিকে তিন শতাধিক স্থাপনার কোনো অনুমোদন নেই । এমনকি জেলায় মোট কতটি হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ তালিকাও নেই জেলা প্রশাসনের কাছে। এক মেরিন ড্রাইভেই ২৫০টির বেশি অনুমোদনহীন স্থাপনা রয়েছে।
বিশেষ করে কক্সবাজার শহরের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের বিপরীতে লাইট হাউজ ও স্মরণ এলাকায় গড়ে উঠেছে বিপুলসংখ্যক হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ।
অভিযোগ রয়েছে, এসব এলাকার তিন শতাধিক স্থাপনার বৈধ অনুমোদন নেই। এর মধ্যে গণপূর্ত বিভাগের জমি ও সরকারি ১ নম্বর খতিয়ানের খাসজমি দখল করে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগও রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেরই পরিবেশগত ছাড়পত্র ও ফায়ার সার্ভিসের অগ্নিনিরাপত্তাসংক্রান্ত অনুমোদন নেই বলে জানা গেছে। এতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে সরকারি জমি দখল, ভবন নির্মাণের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নজরদারি নিয়েও। শনিবার উখিয়ার ইনানী-পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর পর অনুমোদনহীন স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রিসোর্টটির কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) নির্মাণ অনুমোদন ও ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র ছিল না। অগ্নিকাণ্ডের আগেই প্রতিষ্ঠানটিকে দুই দফা নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তা মান্য করেনি। সূত্র জানায়, কক্সবাজারে হোটেল-রিসোর্টের সংখ্যা বাড়লেও ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নেওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ।
ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স পরিদর্শক শফিকুল ইসলাম জানান, চলতি বছরে ৫৩টি হোটেলের লাইসেন্স নবায়নের প্রক্রিয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২৩টি প্রতিষ্ঠান অনুমোদন পেয়েছে। তিনি বলেন, একসময় প্রায় ২০০টি হোটেলের লাইসেন্স ছিল। কিন্তু অনেক প্রতিষ্ঠান পরবর্তী সময়ে লাইসেন্স নবায়ন করেনি। ফায়ার সার্ভিস কক্সবাজারের উপপরিচালক সৈয়দ মুহাম্মদ মোরশেদ হোসেন বলেন, শহর ও পর্যটন এলাকায় অনেকটা অপরিকল্পিতভাবে হোটেল-রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করাও কঠিন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজারের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ মোরশেদ জানান, জেলায় সর্বোচ্চ ৫০টি হোটেলের পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে। গত এক বছরে ছাড়পত্র না থাকায় ৫৮টি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় দেড় কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় শতাধিক হোটেলের বিরুদ্ধে ২৮টি মামলা হয়েছে।
মেরিন ড্রাইভেই ২৫০ অবৈধ স্থাপনা :
কউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, মেরিন ড্রাইভ এলাকায় এক হাজারের বেশি স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে ২৫০টির বেশি স্থাপনা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। আদেশ অমান্য করলে চূড়ান্ত নোটিশ দিয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে উচ্ছেদ করা হবে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকায় প্রায় ৫০টি প্রতিষ্ঠান অনুমোদন পেয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিতে বলা হয়েছে।
এসব বিষয়ে কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, সমিতির তালিকাভুক্ত হোটেলগুলোর সব ধরনের অনুমোদন রয়েছে। তবে বেশির ভাগ রিসোর্ট ও কটেজের অনুমোদন নেই। জেলা প্রশাসক আ. মো. মান্নান বলেন, কক্সবাজারে ঠিক কতটি হোটেল-রিসোর্ট রয়েছে এবং কতটির অনুমোদন নেই, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রশাসনের কাছে নেই। কউকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় করে তালিকা তৈরির চেষ্টা চলছে।
The post ফায়ার ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে তিন শতাধিক হোটেল-রিসোর্ট appeared first on সুপ্রভাত বাংলাদেশ.
