সুবিশাল ড্রয়িংরুমের এক কোণে মাথা নিচু করে বসে আছে আফজাল। ঘরের প্রতিটি জিনিস যেন তার চোখে ঝলমল করছে। দামি ঝাড়বাতি, বিদেশি সোফা, দেয়ালে সাজানো নামকরা শিল্পীর ছবি, কাচের টেবিল, নরম কার্পেটÑ সবকিছুতেই আভিজাত্যের ছাপ। কিন্তু এত বিলাসিতার মাঝেও আফজালের মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষটি যেন সে নিজেই। লাখ টাকার সোফায় বসে থেকেও তার শরীরটা কেমন কুঁকড়ে আছে। কারণ এই বাড়ির মালিক তার সৎবোন মনিকা। আজ সেই মনিকার কাছেই সাহায্যের জন্য আসতে হয়েছে তাকে।
একসময় যে মেয়েটিকে সে এই বাড়ির বাইরেও মানুষ বলে মনে করেনি, আজ তার দরজায় এসে বসে থাকতে হচ্ছে। অদ্ভুত এই জীবন! সময়ের কী নির্মম পরিহাস! আফজাল মাথা নিচু করে বসে রইল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল বহু বছর আগের সেই ছোট্ট মেয়েটির মুখ।
মনিকা। মনিকার বয়স তখন মাত্র দশ বছর। মেয়েটি ছিল শান্ত স্বভাবের। বেশি কথা বলত না। নিজের মতো করে থাকত। তার বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব অনেকটাই চলে আসে ফরিদা বেগমের হাতে। ফরিদা বেগম ছিলেন আফজালের মা। মনিকার মা মারা গিয়েছিলেন আরও আগে। ফলে বাবার মৃত্যুর পর মনিকা কার্যত এই সংসারে একা হয়ে যায়। রক্তের সম্পর্কের হিসেবে আফজাল তার সৎভাই। কিন্তু মনিকার কাছে ‘সৎভাই’ শব্দটির কোনো অর্থ ছিল না।
সে জানত, আফজাল তার ভাই। শুধু ভাই নয়, তার সবচেয়ে আপন মানুষ। ছোটবেলায় আফজালের পেছন পেছন ঘুরত সে। ভাই স্কুলে যাওয়ার সময় দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিত। ভাই বাজার থেকে ফিরলে দৌড়ে গিয়ে ব্যাগ হাতে নিত। কখনো ভাইয়ের জন্য নিজের প্রিয় মিষ্টিটাও তুলে রাখত।
একদিন আফজাল স্কুল থেকে ফিরে দেখল, তার পড়ার টেবিলের ওপর একটা ছোট্ট কাগজ। কাগজে কাঁপা কাঁপা হাতে লেখা, ‘ভাইয়া, তুমি আজ অনেক দেরি করেছ। তোমার জন্য মিষ্টি রেখেছি।-মনিকা।’
আফজাল তখন হাসতে হাসতে মিষ্টিটা খেয়েছিল। মনিকার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, ‘তুই খুব ভালো মেয়ে।’
সেদিন মনিকার আনন্দের সীমা ছিল না। কিন্তু সেই ভালোবাসা বেশিদিন টিকল না। ফরিদা বেগম ধীরে ধীরে আফজালের মনে মনিকার বিরুদ্ধে বিষ ঢালতে শুরু করলেন। ‘এই মেয়েটা একদিন সব সম্পত্তি নিয়ে নেবে।’ ‘তুই বুঝিস না আফজাল, সতীনের মেয়েকে বেশি বিশ্বাস করতে নেই।’ ‘আজ তোকে ভাই বলে ডাকছে, কাল তোর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।’
আফজাল তখন কিশোর। মায়ের কথাই তার কাছে সত্য। ধীরে ধীরে মনিকার প্রতি তার আচরণ বদলে গেল। যে ভাই একসময় তার মাথায় হাত রাখত, সেই ভাইই একদিন তাকে বলল, ‘আমার ঘরে আর আসবি না।’ মনিকা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কেন ভাইয়া?’ আফজাল বলল, ‘এমনিই। বেশি প্রশ্ন করিস না।’
মেয়েটি আর কোনো কথা বলেনি। চুপচাপ চলে গিয়েছিল। ফরিদা বেগমের কাছে মনিকার যেন কোনো ভালো গুণই ছিল না। ভোরে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হলে বকা। কাজ করতে একটু দেরি হলে বকা। খাবার একটু বেশি নিলে বকা। কম নিলেও বকা।
একদিন মনিকা অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে ছিল। ফরিদা বেগম এসে বললেন, ‘অসুস্থ হওয়ার নাটক করছিস?’ মনিকা দুর্বল গলায় বলেছিল, ‘মা, সত্যিই শরীরটা ভালো লাগছে না।’ ফরিদা বেগম কড়া সুরে বললেন, ‘তোর এসব নাটক আমি বুঝি।’ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আফজালও মায়ের কথায় সায় দিয়েছিল। ‘মনিকা, উঠে কাজ কর। সারাদিন শুয়ে থাকলে শরীর আরও খারাপ হবে।’
মনিকার চোখে পানি এসে গিয়েছিল। সে সেদিন বুঝেছিল, তার অসুস্থতাও এই বাড়িতে তার জন্য কোনো বিশেষ অধিকার তৈরি করে না। তারপরও সে ভাইকে ভালোবাসত। মানুষের ভালোবাসা বড় অদ্ভুত জিনিস। যে মানুষ কষ্ট দেয়, তাকেও কখনো কখনো মানুষ ভালোবেসে যায়।
মনিকার বাবার কিছু সম্পত্তি ছিল। মনিকা জানত, বাবার মৃত্যুর পর তারও কিছু অধিকার রয়েছে। কিন্তু ফরিদা বেগম নানা কৌশলে সেই সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলেন। মনিকা একদিন সাহস করে বলেছিল,
‘মা, বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি থেকে আমার যতটুকু অধিকার, আমি শুধু সেটুকু চাই।’ ফরিদা বেগম রেগে বলেছিলেন,
‘তুই আবার অধিকার কীসের?’
‘বাবা তো আমারও বাবা ছিলেন।’
‘চুপ!’
মনিকা ভয়ে থেমে গেল। পাশ থেকে আফজাল বলল, ‘মা যখন বলেছে তোর কিছু নেই, তখন নেই।’ মনিকা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখে অবিশ্বাস। সে যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ‘ভাইয়া, তুমিও?’ আফজাল মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।
সেদিন রাতে মনিকা বাবার ছবির সামনে বসে অনেক কেঁদেছিল।
‘বাবা, তুমি থাকলে আমাকে কেউ এভাবে কষ্ট দিতে পারত না।’
কিন্তু ছবির মানুষটি কোনো উত্তর দেয়নি। কিছুদিন পর মনিকার বিয়ে হলো ফয়েজের সঙ্গে। ফয়েজ খুব সাধারণ পরিবারের ছেলে। বড়লোক ছিল না। কিন্তু মনিকার কষ্ট বুঝত। বিয়ের পর একদিন মনিকা তার স্বামীকে বলেছিল,
‘আমি ছোটবেলায় অনেক কষ্ট পেয়েছি।’
‘তোমাকে আর কষ্ট পেতে দেব না।’
মনিকা মৃদু হেসেছিল।
‘মানুষের দেওয়া কষ্ট কি এত সহজে ভোলা যায়?’
‘ভুলতে হবে না। শুধু নতুন জীবনটা সুন্দর করে বাঁচবে।’
ফয়েজের সেই কথাই মনিকার জীবনের নতুন অধ্যায়ের শুরু হয়ে গেল।
ঢাকায় এসে প্রথম দিকে তাদের জীবন ছিল খুব সাধারণ। দুজনের ছোট্ট সংসার। সকালে ফয়েজ অফিসে যায়। মনিকা ঘর গোছায়।
বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশ দেখে। কখনো দুজনে ছাদে বসে চা খায়। অল্পতেই সুখী ছিল তারা।
তাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকতেন স্বনামধন্য চলচ্চিত্র পরিচালক রাশেদ কবির। তিনি প্রায়ই বারান্দায় মনিকাকে দেখতেন। একদিন ফয়েজকে ডেকে বললেন, ‘আপনার স্ত্রী কি কখনো অভিনয় করেছেন?’ ফয়েজ হেসে বলল, ‘না। কেন?’ রাশেদ কবির বললেন, ‘ওর মধ্যে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর একটা স্বাভাবিক ক্ষমতা আছে।’
ফয়েজ বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু পরিচালক হাল ছাড়লেন না।
কিছুদিন পর তিনি মনিকার সঙ্গে সরাসরি কথা বললেন।
‘আপনি অভিনয় করতে চান?’
মনিকা অবাক হয়ে বলল,
‘আমি?’
‘হ্যাঁ, আপনি।’
‘আমি তো কখনো ভাবিনি।’
‘ভাবুন। আমি মনে করি আপনি পারবেন।’
প্রথমে ফয়েজ রাজি হয়নি। চলচ্চিত্রের জগত সম্পর্কে তার অনেক ভয় ছিল। কিন্তু রাশেদ কবিরের কথায় আস্থা রেখে শেষ পর্যন্ত রাজি হলো।
মনিকা প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়াল। শুরুতে হাত কাঁপছিল। সংলাপ ভুল হচ্ছিল। পরিচালক বললেন, ‘ভয় পাবেন না। নিজের মতো থাকুন।’ মনিকা চোখ বন্ধ করল। তারপর অভিনয় শুরু করল। শট শেষ হওয়ার পর পুরো ইউনিট কয়েক মুহূর্ত নীরব ছিল। তারপর পরিচালক বললেন, ‘আমি জানতাম।’
সেই একটি ছবিই বদলে দিল মনিকার জীবন। ছবিটি মুক্তির পর দর্শকের ব্যাপক প্রশংসা পেল। মনিকার অভিনয় নিয়ে পত্রিকায় লেখা হলো। টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার নেওয়া হলো। পরের ছবির প্রস্তাব এলো।
তারপর আরও ছবি। একসময় মনিকা দেশের পরিচিত নায়িকাদের একজন হয়ে উঠল। অর্থ এলো। বাড়ি হলো। গাড়ি হলো। খ্যাতি এলো।
কিন্তু মনিকার ভেতরের মানুষটি বদলাল না। তার মনে ছিল সেই ছোট্ট মেয়েটি, যে একদিন বাবার ছবির সামনে বসে কেঁদেছিল।
মনিকা যখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে, তখন অনেক মানুষ তার কাছে আসতে শুরু করল। কেউ বন্ধুত্ব করতে। কেউ পরিচয় বাড়াতে। কেউ সুবিধা নিতে। কিন্তু মনিকা খুব সাবধানে মানুষ চিনত। ফয়েজ তাকে প্রায়ই বলত, ‘তুমি এত মানুষকে সাহায্য করো কেন?’ মনিকা হেসে বলত,
‘কারণ আমি জানি, অসহায় হয়ে একা থাকার কষ্টটা কী।’ ফয়েজ আর কিছু বলত না। কারণ সে জানত, মনিকার জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট কোনোদিনই অর্থের অভাব ছিল না। ছিল আপন মানুষের অভাব।
এদিকে সময়ের সঙ্গে ফরিদা বেগমের বয়স বাড়ছিল। আফজালও নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত ছিল। কিন্তু তার মায়ের শেখানো অহংকার কখনো কমেনি। সে মনিকার সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনি। মনিকাও আর কখনো তাদের পুরোনো বাড়িতে ফিরে যায়নি।
একদিন খবর এল- ফরিদা বেগম মারা গেছেন। মনিকা খবরটি শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিল। ফয়েজ বলেছিল, ‘তুমি যাবে?’ মনিকা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলেছিল, ‘যিনি আমাকে কখনো নিজের মেয়ে ভাবেননি, তার মৃত্যুর পরও কি আমার মনে তার জন্য কোনো জায়গা থাকা উচিত?’ ফয়েজ বলেছিল, ‘তোমার ইচ্ছা।’
মনিকা শেষ পর্যন্ত গিয়েছিল। দূর থেকে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়েছিল। তার মনে কোনো আনন্দ ছিল না। ছিল না প্রতিশোধের তৃপ্তিও। শুধু একটা অদ্ভুত শূন্যতা। মনে হচ্ছিল, তার শৈশবের সেই অধ্যায়টি আজ সত্যিই শেষ হয়ে গেল।
ফরিদা বেগমের মৃত্যুর পর আফজালের জীবন দ্রুত ভেঙে পড়তে শুরু করল। যে ব্যবসাকে সে বড় করার স্বপ্ন দেখেছিল, সেখানে লোকসান হলো। ঋণ বাড়ল। একসময় পাওনাদাররা বাড়িতে আসতে শুরু করল।
বন্ধুরা ফোন ধরা বন্ধ করল। আত্মীয়রা নানা অজুহাতে দূরে সরে গেল।
যাদের একসময় সে নিজের আপন মানুষ ভাবত, তারা কেউ তার পাশে দাঁড়াল না।
এক রাতে আফজাল ঘরের অন্ধকারে একা বসে ছিল। হঠাৎ তার মনে হলো ‘আমার পাশে আসলে কে আছে?’ কেউ নেই। মা নেই। বন্ধুরা নেই। আত্মীয়রা নেই। তারপর তার মনে পড়ল মনিকার কথা। সেই ছোট্ট বোনটি এখন বড় নায়িকা। সে চাইলে আফজালকে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু আফজালের ভেতরে লজ্জা ছিল। একদিন সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই বলল, ‘তুই কোন মুখে যাবি?’ আয়না কোনো উত্তর দিল না। পরদিন আবার গেল আয়নার সামনে। তারপর একদিন ঘরে বাজার করার মতো টাকাও রইল না। সে বুঝল, অহংকার দিয়ে পেট চলে না। অবশেষে মনিকার ঠিকানা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল।
আজ সেই আফজালই মনিকার ড্রয়িংরুমে বসে আছে। অনেকক্ষণ হয়ে গেছে। অবশেষে দরজা খুলে মনিকা বেরিয়ে এল। দুজনের চোখাচোখি হলো। মনিকা থমকে দাঁড়াল। আফজাল উঠে দাঁড়াতে গিয়ে আবার বসে পড়ল।
‘কেমন আছিস?’
মনিকা কিছু বলল না।
‘অনেকদিন পর...’
‘কেন এসেছ?’
প্রশ্নটা সরাসরি। আফজাল মাথা নিচু করল।
‘আমি একটু বিপদে পড়েছি।’
মনিকা তিক্তভাবে হাসল।
‘বিপদে?’
‘হ্যাঁ।’
‘তখন আমি বিপদে ছিলাম, ভাইয়া। মনে আছে?’
আফজাল চুপ। মনিকা ধীরে ধীরে বলল, ‘মনে আছে, আমি একদিন তোর কাছে কেঁদে বলেছিলাম, ‘ভাইয়া, আমাকে একটু সাহায্য করো।’
‘মনে আছে।’
‘তুই কী বলেছিলি?’
আফজাল চোখ নামিয়ে বলল,
‘মনে নেই।’
‘বলেছিলি, ‘তুই আমার কেউ না।’
আফজালের বুকটা কেঁপে উঠল। মনিকার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
‘সেই কথাটা আমি আজও ভুলিনি।’
‘আমি ভুল করেছি।’
‘শুধু ভুল?
মনিকা এবার কেঁদে ফেলল। ‘তুই জানিস, কত রাত আমি একা কেঁদেছি? কতবার মনে হয়েছে, আমার যদি একটা ভাই থাকত, যে আমাকে একটু ভালোবাসত!’
আফজাল কোনো কথা বলতে পারল না।
‘আজ তুই এসেছিস আমার কাছে সাহায্য চাইতে। তুই চলে যা।’
আফজাল মাথা তুলল।
‘মনিকা...’
‘চলে যা। আমার নামও ধরিস না।’
‘আমার একটা চাকরি দরকার। আমি কাজ করতে চাই। তুই যদি...’
মনিকা হাত তুলে থামিয়ে দিল। আফজাল ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার চোখে পানি। সে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। পেছনে মনিকা দাঁড়িয়ে রইল। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে নামতে আফজাল নিজের চোখের পানি মুছছিল।
আজ সে বুঝতে পারছে, মানুষ যখন ক্ষমতা পায়, তখন নিজের চারপাশে অনেক মানুষ দেখতে পায়। কিন্তু ক্ষমতা চলে গেলে বোঝা যায়, তাদের মধ্যে কতজন সত্যিই আপন। তার মনে হলো, মনিকাকে সে যদি সেদিন ভালোবাসত, আজ হয়তো তার জীবন অন্যরকম হতো।
একটি মানুষের প্রতি ভালোবাসা কখনো নষ্ট হয় না। কিন্তু অবহেলাও নষ্ট হয় না। দুটোই কোনো না কোনোভাবে ফিরে আসে।
গেটের কাছে এসে আফজাল থামল। দারোয়ান এগিয়ে এল।
‘স্যার, ম্যাডাম ফোন করেছিলেন উপর থেকে।’
আফজাল অবাক।
‘কী বলেছেন?’
‘আপনাকে আবার উপরে যেতে বলেছেন।’
আফজালের বুকের ভেতর কেমন যেন হলো। সে ধীরে ধীরে আবার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠল। মনিকা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। আফজাল কাছে যেতেই মনিকা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
দৌড়ে এসে ভাইকে জড়িয়ে ধরল। আফজাল স্তব্ধ হয়ে গেল। মনিকা কাঁদতে কাঁদতে বলল,
‘আমি তোকে অপমান করতে চাইনি।’
‘মনিকা...’
‘আমি পারিনি নিজেকে সামলাতে। তুই যখন চলে যাচ্ছিলি, তখন আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভেঙে যাচ্ছিল।’
আফজালের চোখে পানি। মনিকা বলল, ‘আমি এত বছরেও সেই কষ্ট ভুলিনি। এখনো পারিনি। তুই আর মা আমাকে যে কষ্ট দিয়েছিস, সেটা আমার ভেতরে আছে।’ আফজাল মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল আর মনিকাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
‘আমাকে ক্ষমা করে দে।’
‘আজই সব ভুলে যেতে পারব না।’
‘আমি জানি।’
‘কিন্তু তোর বিপদে তোকে একা ফেলে রাখতেও পারব না।’
‘আমি তোকে অনেক কষ্ট দিয়েছি।’
‘হ্যাঁ, দিয়েছিস। মানসিক শান্তিও নষ্ট করেছিস।’
‘তবু তুই আমাকে সাহায্য করবি?’
মনিকা মৃদু হেসে বলল, ‘তুই কি সত্যিই ভেবেছিস, তুই আমার ভাই হওয়া থেকে বের হয়ে গেছিস?’ আফজাল কিছু বলতে পারল না।
মনিকা তার হাত ধরে বলল,
‘তুই এখানেই থাকবি।’
‘না, সেটা কী করে সম্ভব?’
‘সম্ভব।’
‘আমি তোকে অনেক কষ্ট দিয়েছি।’
‘তাই বলে তুই আমার ভাই থাকবি না?’
‘আমি তোকে কোনোদিন ভাইয়ের মতো ভালোবাসিনি।’
‘সেটা তোর ভুল ছিল। আমি তোকে বোনের মতো ভালোবাসা বন্ধ করিনি।’
আফজাল মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগল। মনিকা তার চোখের পানি মুছে দিল। ‘তোর জন্য একটা কাজের ব্যবস্থা করব। তোর ঋণগুলো কীভাবে সামলানো যায়, সেটা দেখব। তুই নতুন করে জীবন শুরু করবি।’ আফজাল বলল, ‘তুই এত ভালো কী করে হলি?’ মনিকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘হয়তো কারণ আমি জানি, ভালোবাসার অভাব কতটা কষ্টের।’
দুজনেই চুপ করে রইল। তারপর আফজাল ধীরে ধীরে বলল,
‘মনিকা, আমি একটা কথা বলব?’
‘বল।’
‘তুই আমাকে যতটা ভালোবাসা দিলি, তার অর্ধেকও যদি আমি তোকে দিতাম, তাহলে আজ আমার জীবনটা এমন হতো না।’
মনিকা চোখের পানি মুছে বলল,
‘হয়তো হতো না।’
‘আমি দেরিতে বুঝেছি।’
‘দেরিতে বোঝাও এক ধরনের বোঝা।’
‘আমি আর কখনো তোকে কষ্ট দেব না।’
‘আমিও আর অতীত আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই না।’
তারপর সে ভাইকে আবার জড়িয়ে ধরল। সেদিন রাতে আফজাল সেই বাড়িতেই রয়ে গেল। বহু বছর পর সে প্রথমবার নিজের বোনের ঘরে বসে খাবার খেল। টেবিলে খাবার সাজানো ছিল। আফজাল খাবারের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ কেঁদে ফেলল। মনিকা অবাক হয়ে বলল, ‘কাঁদছিস কেন?’ আফজাল চোখ মুছে বলল, ‘ছোটবেলায় তুই আমার জন্য মিষ্টি রেখে দিতিস।’ মনিকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হেসে বলল,
‘তোর মনে আছে?’
‘সব মনে আছে।’
‘তাহলে এতদিন কেন ভুলে ছিলি?’
আফজাল কোনো উত্তর দিল না। কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর মানুষের কাছে থাকে না। শুধু অনুশোচনা থাকে। সেদিন রাত গভীর হলে মনিকা নিজের ঘরে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়াল। বাইরে শহরের আলো। দূরে গাড়ির শব্দ। কিন্তু তার মনে আজ অদ্ভুত এক শান্তি। শৈশবের সব কষ্ট মুছে যায়নি। মায়ের দেওয়া অপমান মুছে যায়নি। ভাইয়ের অবহেলাও মুছে যায়নি। তবু আজ তার মনে হচ্ছিল, বহু বছর ধরে বন্ধ থাকা একটি দরজা যেন একটু খুলেছে। অন্যদিকে আফজাল নিজের ঘরে শুয়ে চোখ বন্ধ করল। তার মনে হলো, জীবনে সে অনেক কিছু হারিয়েছে। কিন্তু আজ সে একটি জিনিস ফিরে পেয়েছে- বোনকে।
পরদিন সকালে মনিকা যখন নাশতার টেবিলে বসেছিল, আফজাল এসে দাঁড়াল।
‘মনিকা। আমি একটা কথা বলতে চাই।’
‘বল।’
‘তুই আমাকে শুধু সাহায্য করিস না। আমাকে মানুষ হওয়ার আরেকটা সুযোগ দিস।’
‘সুযোগ তোকে আজই দিয়েছি।’
‘আমি যেন সেটা নষ্ট না করি।’
‘তুই নষ্ট করবি না।’
‘কীভাবে এতটা বিশ্বাস করিস?’
‘কারণ আমি চাই না, আমার শৈশবের কষ্ট তোর ভবিষ্যৎটাকেও নষ্ট করুক।’
আফজাল আর কিছু বলল না। শুধু বোনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তার চোখে তখন একসঙ্গে ছিল লজ্জা, অনুশোচনা, কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা। জীবনে কিছু মানুষকে আমরা হারিয়ে ফেলি নিজেদের ভুলে। কিছু মানুষকে হারিয়ে ফেলি অহংকারে। আবার কখনো কখনো ভাগ্য আমাদের হাতে দ্বিতীয়বার সুযোগ তুলে দেয়। আফজালের হাতেও সেই সুযোগ এসেছিল। সে বুঝেছিল অর্থের অভাব মানুষকে কষ্ট দেয়, কিন্তু আপন মানুষের অভাব মানুষকে ভেতর থেকে শূন্য করে দেয়। যে মানুষ অন্যের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ায় না, তার নিজের দুঃসময়ে চারপাশ একদিন সত্যিই শূন্য হয়ে যেতে পারে। আর তখন চারদিকে তাকিয়ে মনে হয়- কেউ নেই পাশে। তবে ভালোবাসার একটি দরজা যদি শেষ মুহূর্তেও খোলা থাকে, তাহলে মানুষ আবার ফিরে পেতে পারে তার হারানো পৃথিবী। আফজাল সেই পৃথিবী ফিরে পেয়েছিল। তার নাম ছিল- মনিকা।
আর মনিকা? সে হয়তো শৈশবের সব কষ্ট কোনোদিন ভুলতে পারবে না। কিন্তু সে একটা কথা বুঝেছিল, ক্ষমা মানে অতীতকে সত্যি বলে মেনে নেওয়া নয়। ক্ষমা মানে সেই অতীতকে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করতে না দেওয়া।
সেদিন বিকেলে মনিকার গাড়ি যখন শুটিংয়ের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হলো, বারান্দায় দাঁড়িয়ে আফজাল বোনের গাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল।
গাড়ি ধীরে ধীরে দূরে চলে গেল। আফজাল হাত নাড়ল। তার চোখে পানি। কিন্তু সেই পানির মধ্যে এবার আর অসহায়ত্ব ছিল না। ছিল কৃতজ্ঞতা। সে মনে মনে বলল, ‘মনিকা, তুই আমার জীবনে শুধু বোন হয়ে আসিসনি। তুই আমাকে শিখিয়েছিসÑ মানুষ বড় হয় টাকা দিয়ে নয়, ক্ষমা করার ক্ষমতা দিয়ে।’
দূরে গাড়িটি অদৃশ্য হয়ে গেল। আফজাল তখনও দাঁড়িয়ে। তার মনে হচ্ছিল, জীবনে সত্যিই কেউ নেই পাশেÑ এমন কথা হয়তো পুরোপুরি সত্য নয়।
কখনো কখনো আমরা নিজেরাই আপন মানুষকে দূরে সরিয়ে দিই। আর যখন পৃথিবীটা ফাঁকা মনে হয়, তখন বুঝতে পারি- পাশে থাকার মানুষটি হয়তো অনেক আগেই ছিল। শুধু তাকে চিনতে আমাদের অনেক দেরি হয়ে গেছে। তখন কিছুই করার থাকে না। তবুও এরই নাম জীবন।