চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশের উন্নয়ন কাজে যে ধাক্কা লেগেছিল, তা এখনো অব্যাহত আছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপি ৪ শতাংশেরও কম বাস্তবায়ন হয়েছে।
১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের তিন মাসে ১২ হাজার ১৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা খরচ করেছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। যা মোট এডিপির মাত্র ৩ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই শতাংশের হিসাবে তিন মাসে এডিপি বাস্তবায়নে এত কম ব্যয় হয়নি।
রোববার প্রকাশিত পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ ‘করুণ দশা’ উঠে এসেছে।
গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বাস্তবায়নের হার ছিল ৫ দশমিক শূন্য নয় শতাংশ; খরচ হয়েছিল ১২ হাজার ১৫৮ কোটি ২৭ লাখ টাকা।
২০২৪ সালের জুলাই থেকে শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের শুরু থেকে আন্দোলন এবং ক্ষমতার পালাবদলে সৃষ্টি হওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি প্রশাসনে রদবদলের ধাক্কায় সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে যে ধীরগতি দেখা দিয়েছিল, তা এখনও চলছে।
অতীতে দেখা গেছে, রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় থাকলে ভোটের আগে দেশে উন্নয়ন কাজের ধুম পড়ে যায়। ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ক্ষমতাসীন সরকার সারাদেশে তড়িঘড়ি করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে।
সবশেষ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে তেমনটি দেখা গেছে; একটার পর একটা উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করা হয়।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে তেমনটি দেখা যায়নি। সে কারণেই সরকারের উন্নয়ন কাজে বেশ মন্থরগতি দেখা যায়।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এসেছে আট মাস হয়ে গেছে। কিন্তু এডিপি বাস্তবায়নে গতি আসেনি।
সবশেষ চলতি অর্থবছরের তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বর বিভিন্ন প্রকল্পের অনুকুলে ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার ৩০৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা; যা মোট এডিপির ২ দশমিক শূন্য চার শতাংশ।
দ্বিতীয় মাস অগাস্টে খরচ হয়েছিল ৩ হাজার ৫৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা; যা মোট এডিপির ১ দশমিক ১৬ শতাংশ।
প্রথম মাস জুলাইয়ে ব্যয় হয়েছিল ২ হাজার ১২১ কোটি ১৮ লাখ টাকা, যা ছিল এডিপির শূন্য দশমিক ৬৯ শতাংশ।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের উন্নয়ন বাজেটে ১ হাজার ১৭২টি উন্নয়ন প্রকল্পে ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ প্রকল্প ৯৮৬টি, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ২৩টি, কারিগরি সহায়তা ১০৯টি, উন্নয়ন সহায়তা থোক ৯টি এবং নিজস্ব অর্থায়নে ৪৫টি প্রকল্প রয়েছে।
গণঅভ্যুত্থান ও পরববর্তী বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, টাকার অঙ্কে ব্যয় হয়েছিল ১৩ হাজার ২১৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা।
এর আগের অর্থবছরে (২০২৩-২৪) এই তিন মাসে বাস্তবায়নের হার ছিল ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, খরচ হয়েছিল ২০ হাজার ৬০৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে ব্যয় হয়েছিল ২১ হাজার ৮৯৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা; শতাংশ হিসাবে বাস্তবায়নের হার ছিল ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
সব আর্থিক বছরেই প্রথম দিকে এডিপি বাস্তবায়নের হার কম হয়ে থাকে। অর্থবছরের শুরুর দিকে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো সাধারণত প্রস্তুতিমূলক কাজ ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে। এ কারণে অর্থবছরের শুরুতে অর্থব্যয় কম হয়ে থাকে। পরের মাসগুলোতে ধীরে ধীরে তা বাড়ে।
তবে আইএমইডির প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে শতাংশ ও টাকার হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে।
১৫ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নের হার ৬.৬২%
আইএমইডির প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রাপ্ত ১৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের গড় বাস্তবায়নের হার ৬ দশমিক ৬২ শতাংশ। তার মধ্যে সবচেয়ে কম ব্যয় করেছে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ।
এই আর্থিক বছরের জন্য ৩ লাখ ৮ হাজার ৯২৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকার এডিপির ৫২ দশমিক ৯০ শতাংশই বরাদ্দ আছে এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য।
প্রাপ্ত বরাদ্দের শতাংশ হিসাবে জুলাই-সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে বেশি ১৭ দশমিক ৩৮ শতাংশ খরচ করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৩ দশমিক শূন্য সাত শতাংশ অর্থ খরচ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। তৃতীয় সর্বোচ্চ ১২ দশমিক ৪২ শতাংশ ব্যয় করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় খরচ করেছে তাদের এডিপি বরাদ্দের ২ দশমিক ২৭ শতাংশ অর্থ। ৫ দশমিক ৪৬ শতাংশ ব্যয় করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। ৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ খরচ করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
এছাড়া ৬ দশমিক শূন্য চার শতাংশ অর্থ খরচ করেছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। বিদ্যুৎ বিভাগ খরচ করেছে ৬ দশমিক ৯৬ শতাংশ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ব্যয় করেছে ৬ দশমিক ১২ শতাংশ।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ৪ দশমিক শূন্য নয় শতাংশ, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ, রেলপথ বিভাগ ২ দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ২ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ অর্থ ব্যয় করেছে।
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ খরচ করেছে তাদের জন্য মোট বরাদ্দের ৪ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ।
৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ হাজার ১৯৮টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এই বরাদ্দের বিপরীতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা ১ লাখ ৪১ হাজার ৭১ কোটি টাকা খরচ করেছিল। বাস্তবায়নের হার ছিল ৬৭ দশমিক ৫২ শতাংশ। যা ছিল এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন।
