১৬ মিনিট আগে
![]()
রামিন তালুকদার
৪৬ গোলের মধ্যে মারফি করেছিলেন ১৫ গোল, রুনা লায়লা ১৪, আর তানিয়া ১০। তিন মেয়ের গোলে ২০২৩ সালে আইএইচএফ চ্যালেঞ্জ ট্রফি নারী হ্যান্ডবলে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৭ দল তাক লাগিয়ে দিয়েছিল ভারতের অনূর্ধ্ব-১৭ দলকে। আজ ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জাতীয় দলের তালিকায় সেই তিনজনের কারও নাম নেই।
বয়সভিত্তিক দল আর জাতীয় দল এক নয়। তবে বয়সভিত্তিক দলই জাতীয় দলের ভিত, সব খেলাতেই ক্ষুদে খেলোয়াড়েরা একসময় হাল ধরেন। কিন্তু বাংলাদেশের নারী হ্যান্ডবলে সেটা হয়নি। কেন হয়নি, তার একটা ছবি পাওয়া যায় রাজধানীর শীর্ষস্থানীয় এক স্কুলে।
ভিকারুন্নিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজে এক ছাত্রী ছিলেন ক্লাসের সেরা, হ্যান্ডবল দলেরও উজ্জ্বল খেলোয়াড়। বয়সভিত্তিক দলের পর্ব শেষে উচ্চতর ভবিষ্যতের আশায় তিনি আর খেলছেন না। নিজের নাম প্রকাশে তিনি অনিচ্ছুক, তাই এই প্রতিবেদনে তার নাম রাখা হয়নি। জাতীয় দল তার অভাব টের পাচ্ছে প্রতি মুহূর্তে।
গল্পটা একা তার নয়। সানিডেইল, স্কলাস্টিকার মতো ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলেও অনেকে শখের বশে হ্যান্ডবল ধরেন, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত দেখে একসময় ছেড়ে দেন। যারা থেকে যান, তাদের বেশির ভাগ আসেন হতদরিদ্র পরিবার থেকে, সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় পরিবার, সমাজ, বাল্যবিবাহ ও আর্থিক অনিশ্চয়তা।
কেন হারিয়ে যাচ্ছেন মারফিরা? সহকারী কোচ ডালিয়া আক্তার সেই দলের সঙ্গে ছিলেন। বয়সের যুক্তি তিনি প্রথমেই সরিয়ে রেখে বললেন, 'তখনকার কিছু খেলোয়াড় এখনো দলে আছে। বয়সটা বড় কথা না। বড় কথা হলো, ২০২২ এ ইসলামিক সলিরিটি গেমস এর পর আমরা কতগুলো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলেছি? জিরো। একটিও নয়।'
'এইজ লেভেলে ২০২৩ সালে একটা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আমরা হোস্ট করেছিলাম, এরপর আর জুনিয়র দলটির কোথাও খেলা হয়নি। অথচ এ বছরই এশিয়ান ইয়োথ গেমস্ হয়েছে, সেখানে আমরা অংশগ্রহণ করার সুযোগই পাইনি। বাংলাদেশ অলিম্পিক থেকে অন্য ইভেন্ট ঠিকই গেছে কিন্তু হ্যান্ডবলের অংশগ্রহণের সৌভাগ্য হয়নি,' যোগ করেন তিনি।
সিনিয়র দলের হিসাবও উজ্জ্বল নয়। তার স্মৃতিতে সর্বশেষ বড় আসর ২০২১-এর শেষ বা ২০২২-এর শুরুতে তুরস্কের কোনিয়ায়, তার আগে ২০১৯, ২০১৮, ২০১৬। 'কালেভদ্রে একবার-দুবার খেলে ধারাবাহিকতা আশা করা যায় না। প্রগ্রেস করতে অনেকগুলো ধাপ পেরোতে হয়,' বলেন ডালিয়া।
এদিকে অন্যরা এগিয়েছে। ডালিয়া বললেন, 'না খেলার কারণে খেলোয়াড়েরা আগ্রহ হারাচ্ছে, পারফরম্যান্সও নামছে। মালদ্বীপ এগিয়ে গেছে, নেপালও। নেপাল এশিয়ান গেমস খেলেছে, আমরা অংশগ্রহণই করিনি। ওরা বসে নেই। আমরাই শুধু বসে আছি। আমাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বাড়াতে হবে। খেলোয়াড়দের অন্তত মাঠে রাখতে হবে।'
ভারতের খেলোয়াড় ভাওয়ানা আইএইচএফ ট্রফির ফাঁকে জানালেন, তারা থাকেন একাডেমিতে, কোচ সজন স্যার সেখানেই অনুশীলন করান। এরপর যাবেন কাজাখস্তানে, লক্ষ্য বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ। ভারতও স্বর্গ নয়। মাসিক বেতন নেই, সরকার টাকা দেয় টুর্নামেন্ট জিতলে, ইনডোর সুবিধাও অপ্রতুল। তবু স্পোর্টস কোটায় অর্জনের মাপে পুরস্কার মেলে, চাকরি মেলে। তাদের একটা সিঁড়ি আছে: একাডেমি, টুর্নামেন্ট, অর্জন, চাকরি।
বাংলাদেশের মেয়েদের কাছে সেই সিঁড়ি অস্পষ্ট। জামালপুরের মিষ্টি খাতুন ডিগ্রি পড়ছেন, খেলছেন জাতীয় দলে। বললেন, 'আমাদের কোনো স্যালারি হয় না। জাস্ট যখন খেলতে আসি, তখন পেমেন্ট করা হয়।'
ক্যাম্পে সব আছে। ক্যাম্প শেষে মেয়েরা ফেরে নিজ জেলায়, যেখানে কোনো একাডেমি নেই। তবু দায়টা তিনি নিজের কাঁধেই নেন, 'আমরা প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফরম্যান্স দিতে পারি না। আমরাই ব্যর্থ।'
তারপর বললেন সেই কথা, যা পুরো লেখার কেন্দ্র। বেতন নেই, সরকারি সহায়তা নেই, তাই পরিবারও বলে, শুধু শুধু খেলতে যাস কেন?
'একবার-দুবার খেলার পর মেয়েটির বয়স আঠারো-কুড়ি হলে বিয়ে দিয়ে দেয়। তখন প্লেয়ারগুলো গ্যাপে পড়ে যায়। এটা আর রিকভার হয় না।' তার তুলনা, 'হিমাচল প্রদেশে একাডেমি আছে, ওরা সারা বছর প্র্যাকটিস করে। ওখান থেকেই বেশির ভাগ প্লেয়ার জাতীয় দলে আসে,' বলেন মিস্টি।
ফেডারেশনের সেক্রেটারি সালাহউদ্দিন আহমেদ বললেন, 'জাতীয় দলের খেলোয়াড়েরা নিয়মিত বেতন পান না। ক্যাম্প চলাকালীন থাকা-খাওয়ার বাইরে প্রতিদিন ৫০০ টাকা ভাতা দিই। সরকারের ক্রীড়া ভাতায় এবার ১৬ জনের নাম এসেছে, তারা নিয়মিত বেতন পাবেন। বাকিদের নিয়ে চিন্তা করব, ভিন্নভাবে কোনো ব্যবস্থা করার।'
চাকরির দরজা সার্ভিসেস দলগুলো, এই দলের আট-নয়জন সেখানে কাজ করেন।
ডালিয়া কারণটা আরও খুলে বললেন। ওপেন ট্রায়ালে এসেছিল ৯৩ জন, অনেকে ঢাকার। কিন্তু আনসার, ভিডিপি, পুলিশ ও বর্ডারগার্ডের পেশাদারদের সামনে পড়লে বোঝা যায় ফারাক।
'ওরা দেখে পেরে উঠছে না। তখন মোটিভেশন কমে যায়। কারণ ওরা জানে, এটা এখন পেশা। খেলাটা একটা প্রতিষ্ঠিত পেশা হলে পরিবার ভাবতে পারে, এই লাইনে গেলে মেয়েটা অন্তত বেঁচে থাকতে পারবে,' বলেন ডালিয়া।
গোড়ার সমস্যা তার মতে স্কুলে। ইউরোপে স্কুলে একটা দলগত খেলা বাধ্যতামূলক, হ্যান্ডবল সেখানে অন্যতম জনপ্রিয়। বাংলাদেশে স্কুল পর্যায়ের হ্যান্ডবল ঢাকাকেন্দ্রিক, অথচ জাতীয় দলের ১৬ জনের মধ্যে ঢাকার একজন। 'ঢাকাকে কেন্দ্র করে করলে রিয়েল ট্যালেন্ট পাব না। প্রতিটা মহল্লার প্রাইমারি স্কুল থেকে খেলোয়াড় উঠে আসতে হবে।' তার জন্য লাগে অর্থ। 'অর্থনৈতিক দৈন্যের কারণেই আমরা টুর্নামেন্টে যেতে পারি না।'
শেষে ডালিয়ার একটা অনুরোধ, 'শুধু দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের নিয়েই স্টোরি হয়। যে মেয়েটা পড়ালেখাও চালিয়ে যাচ্ছে, আবার খেলছেও, তাকে নিয়েও স্টোরি হওয়া উচিত। শুধু গরিবরাই খেলবে, এমন হওয়া উচিত না।'
ভিকারুন্নিসার সেই ছাত্রীর সামনে এখনো এমন কোনো পথ নেই, যেখানে বই আর জার্সি একসঙ্গে রাখা যায়। জার্সি যতক্ষণ জীবিকার ভরসা না হয়, ততক্ষণ সেরারা মাঠ ছেড়ে যাবেই, কেউ বইয়ের টেবিলে, কেউ বিয়ের পিঁড়িতে।
