দাবানলের মতো হিংসার আগুন ছড়িয়ে পড়েছে ফ্রান্সে। স্কুলের দুর্গতি নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের বিক্ষোভ থেকে যে আন্দোলনের সূত্রপাত, তা আর একটি দেশের সীমানায় আটকে নেই। বেলজিয়াম, ইতালি থেকে গ্রিস— ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একই ধরনের ক্ষোভ নিয়ে রাস্তায় নামছেন পড়ুয়ারা। কোথাও শিক্ষক ও স্কুলকর্মীর অভাব, কোথাও শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ কমানো, আবার কোথাও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ আন্দোলনের আগুনে ঘি ঢালছে। পরিস্থিতি দেখে প্রশ্ন উঠছে, ফ্রান্সের বিক্ষোভ কি ইউরোপজুড়ে বৃহত্তর গণআন্দোলনের রূপ নিতে চলেছে? তবে সব দেশের আন্দোলনের ধরন খানিকটা একই রকমের হলেও নেতৃত্বের মধ্যে তেমন মিল নেই। বরং স্থানীয় সমস্যার সঙ্গে মিলেমিশে তৈরি হচ্ছে প্রতিবাদের এক বৃহত্তর আবহ।
ফ্রান্সে শুরু, অন্য দেশেও কেন জ্বলল বিক্ষোভের আগুন?
ফ্রান্সে গত সেপ্টেম্বরে প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বে ক্রেতেইয়ের একটি স্কুলে শিক্ষক ও কর্মীর অভাব নিয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন পড়ুয়ারা। স্কুলের বেহাল পরিকাঠামো, ভাঙা আসবাব, ছাদ থেকে জল পড়া এবং পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকার অভিযোগ সামনে আসে। দ্রুত সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের অন্য শহরেও। শিক্ষার সঙ্গে একে একে জুড়তে থাকে মূল্যবৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি, কম মজুরি এবং সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে ক্ষোভও। ক্রমশই সুদীর্ঘ হতে থাকে আন্দোলনের ইস্যুর তালিকা। ছাত্রদের সঙ্গে একে একে যোগ দেন শ্রমিক সংগঠন ও সাধারণ মানুষ। ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে ফ্রান্সের একাধিক শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।
ফ্রান্সের প্রতিবাদের প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে বেলজিয়াম, ইতালি, পর্তুগাল ও স্পেনে। বেলজিয়ামের লিয়েজে পড়ুয়াদের বিক্ষোভ ঘিরে অশান্তির জেরে কয়েকটি স্কুল বন্ধ রাখতে হয়। ইতালির মিলানে জীবনযাত্রার ব্যয় ও যুদ্ধবিরোধী মিছিল শুরুতে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে একাংশের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। চলে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ। পর্তুগালের লিসবনে বাড়িভাড়া, কম মজুরি ও জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধির প্রতিবাদে পথে নামেন হাজার হাজার মানুষ। স্পেনেও আবাসন-সঙ্কট ও বাড়িভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে।
শুধু শিক্ষা নয়, ক্ষোভের কেন্দ্রে কোন সঙ্কট?
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আন্দোলনের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিল হলো, ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের অনিশ্চয়তা। স্কুল-কলেজে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না হওয়া, শিক্ষক ঘাটতি ও শিক্ষার আকাশছোঁয়া খরচের পাশাপাশি মাথাব্যথা হয়ে উঠেছে বাড়িভাড়া, জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। মজুরি সেই অনুপাতে না বাড়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার উপর চাপ বাড়ছে।
দেশ আলাদা হলেও অসন্তোষের মূল কারণগুলির মধ্যে মিল রয়েছে। কোথাও স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, কোথাও শ্রেণিকক্ষের পরিকাঠামো বেহাল। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচও বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্যবৃদ্ধি, কম মজুরি, কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সাধ্যের বাইরে চলে যাওয়া বাড়িভাড়া। তরুণদের একাংশের আশঙ্কা, পড়াশোনা শেষ করেও সেই মতো জীবিকার সংস্থান হবে না। আর্থিক নিরাপত্তা বা উন্নত ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা থাকবে না।
স্পেন ও পর্তুগালে বাড়িভাড়া ও আবাসনের খরচের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আরও জোরালো হয়েছে। ইতালিতেও মূল্যবৃদ্ধি, কম মজুরি এবং সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে। ফলে এক দেশে শিক্ষার দাবি দিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে অন্য দেশকেও। সরকার বিরোধী উষ্মা অন্য দেশে গিয়ে স্থানীয় অর্থনৈতিক সমস্যার সঙ্গে মিশে তৈরি হচ্ছে গণবিক্ষোভ।
আন্দোলনের গতি বাড়ার পিছনে কি সোশ্যাল মিডিয়ার হাতযশ?
ফ্রান্সের স্কুলগুলিতে বিক্ষোভের ভিডিয়ো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অন্য শহরের পড়ুয়ারাও প্রতিবাদে উৎসাহিত হন। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে একই ধরনের সমস্যা নিয়ে তরুণদের মধ্যে যোগাযোগ ও সংহতির বার্তা আন্দোলনকে আরও দৃশ্যমান করেছে। তবে এই বিক্ষোভকে একক, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বাধীন ইউরোপীয় আন্দোলন বলা যাবে না। বিভিন্ন দেশের দাবিদাওয়া ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও পরিস্থিতি আলাদা।
রাজনৈতিক সমীকরণে কী প্রভাব পড়তে পারে?
এই অসন্তোষ আগামী দিনে ইউরোপের রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। ইউরোপজুড়ে সরকার বিরোধী এই বিক্ষোভের বিস্তার প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। কেবল পুলিশি ক্ষমতার জোরে এই অশান্তি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। শিক্ষার পরিকাঠামো, আবাসন, মজুরি ও জীবনযাত্রার খরচের মতো সমস্যার সমাধান না হলে তা ছাইচাপা আগুন হয়েই রয়ে যাবে, যা যে কোনও মুহূর্তে দাবানলে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। ফ্রান্সের আন্দোলন অন্য দেশের তরুণদের প্রতিবাদে অনুপ্রাণিত করছে, কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত কতটা সংগঠিত ও দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে প্রতিটি দেশের সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং আন্দোলনকারীদের দাবির দৃঢ়তার উপর।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদের কারণ আলাদা হলেও একটি প্রশ্ন ক্রমশ সামনে আসছে— তরুণদের ভবিষ্যৎ, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারগুলি কতটা প্রস্তুত?
