চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল জয় শৈবালের কৌতূহল থেকে মস্তিষ্কের রহস্যভেদ
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
-->আলো দেখলে যে এককোষী শৈবাল চোখের পলকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে পারে, সেই সাধারণ কৌতূহল থেকে উন্মোচিত হয়েছে আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের এক বিপ্লব। এককোষী ক্ল্যামাইডোমোনাসের ভেতর বৈদ্যুতিক সিগন্যাল তৈরির রহস্য ভেদ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এমন এক প্রযুক্তির দুয়ার খুলে দিয়েছেন, যা দিয়ে এখন সুনির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যুগান্তকারী এই ‘অপ্টোজেনেটিক্স’ প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও প্রসারের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কার্ল ডাইসেরথ এবং জার্মানির পিটার হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল।
যে প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে ছিল শৈবালে
মস্তিষ্ক কীভাবে আমাদের সচেতন অভিজ্ঞতা, স্মৃতি বা ভয় তৈরি করে, গত শতাব্দীর শেষভাগে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ক্রিক। তার দীর্ঘদিনের ধারণা ছিল, আলো ব্যবহার করে হয়তো নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে নিখুঁত মুহূর্তে সক্রিয় করা সম্ভব। কিন্তু সে সময়ের প্রযুক্তি দিয়ে মিলিসেকেন্ডের ব্যবধানে কাজ করা মস্তিষ্কের কোষগুলোকে আলাদা করে শনাক্ত বা সক্রিয় করা ছিল অসম্ভব।
এই জটিল সমস্যার সমাধান মেলে শৈবালে। ক্ল্যামাইডোমোনাসের কোষঝিল্লিতে থাকা বিশেষ আলোক-সংবেদনশীল প্রোটিন আলো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চ্যানেল খুলে দেয়, যার ফলে ভেতরে আয়ন চলাচল করে বৈদ্যুতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে জার্মান গবেষক পিটার হেগেমান ও তার সহকর্মীরা এই রহস্যের গভীরে প্রবেশ করেন। পরবর্তী সময়ে ২০০০ সালে তারা এমন দুটি জিন খুঁজে পান, যেখান থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ channelrhodopsin-2 বা ChR2 প্রোটিন শনাক্ত করা হয়। এই প্রোটিন আলোর সংস্পর্শে আসার মাত্র শূন্য দশমিক ২ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে কাজ শুরু করতে পারে।
আরও পড়ুন
গবেষণাটিকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যান কার্ল ডাইসেরথ। তার মূল ভাবনা ছিল, শৈবালের এই আলোক-সংবেদনশীল প্রোটিনের জিন যদি পরীক্ষাগারে অন্য কোনো প্রাণীর স্নায়ুকোষে প্রবেশ করানো যায়, তবে কি আলো ফেলার মাধ্যমে সেখানে সিগন্যাল তৈরি করা সম্ভব?
এই ধারণার বাস্তব রূপ দিতে ইঁদুরের স্নায়ুকোষে channelrhodopsin-2-এর জিন প্রবেশ করানো হয়। বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, জিন নেওয়ার পর কোষগুলো নিজে প্রোটিনটি তৈরি করছে এবং সেখানে নীল আলো ফেললে নিখুঁতভাবে বৈদ্যুতিক নার্ভ সিগন্যাল তৈরি হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সেই সিগন্যাল কোষের সীমানা পেরিয়ে সংযুক্ত অন্যান্য স্নায়ুকোষেও স্বাভাবিকভাবে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হয়। ২০০৫ সালে এই অভাবনীয় সাফল্যের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর বছরখানেক বাদে এই নতুন পদ্ধতির আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয় ‘অপ্টোজেনেটিক্স’।
আচরণ ও স্মৃতির নিয়ন্ত্রণ
নতুন এই পদ্ধতি হাতে পাওয়ার পর চিকিৎসাবিজ্ঞানে শুরু হয় একের পর এক রোমাঞ্চকর পরীক্ষা। ২০০৭ সালে জীবন্ত ইঁদুরের মস্তিষ্কে অপটিক্যাল ফাইবার বসিয়ে নীল আলোর সাহায্যে মোটর কর্টেক্সের কোষ সক্রিয় করে তাদের নড়াচড়া করানোর সাফল্য পাওয়া যায়। একই প্রযুক্তির মাধ্যমে ঘুম ও জাগরণের সঙ্গে জড়িত কোষগুলো নিয়ন্ত্রণ করার পরীক্ষাও সফল হয়।
পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালে ডাইসেরথ ও সুসুমু তোনেগাওয়াসহ অন্য গবেষকরা স্মৃতির গভীরে আলো ফেলতে সক্ষম হন। ইঁদুরের ভয় পাওয়ার অভিজ্ঞতার সময় সক্রিয় থাকা স্নায়ুকোষগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী সময়ে নিরাপদ পরিবেশে আলোর মাধ্যমে কেবল ওই কোষগুলোকে পুনরায় সক্রিয় করা হয়। ফলাফল হিসেবে দেখা যায়, কোনো বাহ্যিক কারণ ছাড়াই কেবল কোষগুলো উদ্দীপিত হওয়ার কারণে ইঁদুরটি আগের মতো ভয়ার্ত আচরণ করছে। নির্দিষ্ট স্মৃতির সঙ্গে জড়িত নিউরাল সার্কিটগুলো যে এভাবে আলাদা করে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, অপ্টোজেনেটিক্স সেটাই প্রমাণ করেছে।
সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
মস্তিষ্কের জটিল নেটওয়ার্ক বা নিউরাল সার্কিট কীভাবে কাজ করে, তা অনুধাবনে বিজ্ঞানীরা এখন ঘুম, ভয়, তৃষ্ণা কিংবা খাদ্যানুসন্ধানের মতো আচরণগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন। চিকিৎসার ক্ষেত্রে এর ব্যবহার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসার মতো রোগে দৃষ্টিশক্তি হারানো রোগীদের ক্ষেত্রে এবং শ্রবণক্ষমতা পুনরুদ্ধারে কক্লিয়ার ইমপ্লান্টের কার্যকারিতা বাড়াতে এই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হয়েছে।
একটিমাত্র সাধারণ কৌতূহল থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ পথচলা আজ বিজ্ঞানীদের হাতে এমন এক জাদুকরী চাবি তুলে দিয়েছে, যার সাহায্যে মানব মস্তিষ্কের জটিল ও অন্ধকার জগতের গভীরে আলোর রোশনাই জ্বালানো সম্ভব হচ্ছে।
সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট থেকে বাংলাদেশ সময় ৫ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৩টায় তাদের নাম ঘোষণা করা হয়। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীরা পাবেন একটি মেডেল, একটি সনদপত্র এবং ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। যেসব বিভাগে একাধিক নোবেলজয়ী থাকবেন, তাদের মধ্যে এই অর্থ ভাগ হয়ে যাবে।
বিজ্ঞান, শান্তি ও সাহিত্যে অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯০১ সাল থেকে সুইডিশ বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ী আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছানুসারে এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।
আরও পড়ুন
শিকারিকে বোকা বানায় প্রজাপতির ডানার নকশা
প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
-->উড়ন্ত প্রজাপতির ওপর যখন কোনো পাখি হামলা করে, তখন পাখিটি বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়। প্রজাপতির ডানার নড়াচড়া ও এর আসল অবস্থান এক থাকে না। শিকারি পাখি এই দৃষ্টিভ্রম পুরোপুরি বোঝার আগে প্রজাপতিটি পালিয়ে যায়।
এই আত্মরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সম্প্রতি একদল গবেষক বিস্তারিত কাজ করেছেন। তারা দেখেছেন, প্রজাপতির ডানার বৈপরীত্যমূলক নকশা এবং ওড়ার ধরন একসঙ্গে কাজ করে। এটি শিকারির চোখে গতির এক মিথ্যা সংকেত তৈরি করে। ফলে ওড়ার সময় প্রজাপতির গতি ও দিক বুঝতে শিকারি পাখির বেশ কষ্ট হয়।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের অধ্যাপক জলিওন ট্রোসিয়ানকো এই গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। গবেষণাটি বিজ্ঞানবিষয়ক ‘নেচার’ জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেন, প্রজাপতির ডানার নকশা ও নড়াচড়া এক ধরনের দৃষ্টিভ্রম তৈরি করে। এতে মনে হয় প্রজাপতিটি তার আসল গতিপথের চেয়ে ভিন্ন কোনো দিকে যাচ্ছে। পাখি যখন ধরার চেষ্টা করে, তখন এই মুহূর্তটুকু প্রজাপতির জীবন বাঁচাতে সাহায্য করে।
প্রাণীদের গায়ের ডোরাকাটা বা গাঢ় দাগ গতির বিভ্রান্তি তৈরি করে বলে বিজ্ঞানীরা আগে থেকে ধারণা করতেন। জেব্রা, সাপ ও টিকটিকির ওপর পরীক্ষায় এর মিশ্র প্রমাণ মিলেছিল। তবে সেসব গবেষণায় প্রাণীদের ডানার বা অঙ্গের নড়াচড়া সেভাবে হিসাব করা হয়নি।
আরও পড়ুন
অধ্যাপক ট্রোসিয়ানকো জানান, প্রজাপতির ডানা বেশ নমনীয়। ওড়ার সময় এগুলো ইংরেজি আট আকৃতিতে সামনে পেছনে ঘোরে। এই নড়াচড়ার কারণে ডানার ডোরাকাটা দাগগুলো নিচের দিকে নামার সময় খুব ভালোভাবে চোখে পড়ে। কিন্তু ডানা যখন ওপরের দিকে ওঠে, তখন দাগগুলো দ্রুত ভাঁজ হয়ে যায়। ফলে প্রজাপতি ওপরের দিকে উড়লেও মনে হয় এটি নিচের দিকে যাচ্ছে। একে ‘বার্বার পোল ইলিউশন’-এর সঙ্গে তুলনা করা যায়, যেখানে দাগগুলো পাশে সরলেও মনে হয় ওপর বা নিচে নামছে।
বিষয়টি নিশ্চিত হতে গবেষকরা আসল প্রজাপতির উচ্চ গতির ভিডিও ধারণ করেছেন। পাশাপাশি কম্পিউটার মডেল, সিমুলেটেড বিবর্তন ও টাচস্ক্রিন পরীক্ষা চালিয়েছেন। ১০০ জন মানুষের ওপর ৩ হাজার ভার্চুয়াল প্রজাপতি ধরার পরীক্ষা চালানো হয়। জীবন্ত পাখি দিয়ে এই পরীক্ষা করা অসম্ভব হওয়ায় মানুষের ওপর তা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, বেশি বিভ্রান্তি ছড়ানো প্রজাপতিগুলোকে ধরতে গিয়ে মানুষ অনেক পেছনে ট্যাপ করেছে। মেরুদণ্ডী প্রাণীদের গতির দৃষ্টির স্নায়ুচক্র প্রায় একই হওয়ায় ফলাফলটি পাখির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে বলে গবেষকরা আশা করছেন।
সব প্রজাপতি অবশ্য এই কৌশল ব্যবহার করে না। সাধারণত বাদামি বা লাল রঙের প্রজাপতিগুলো এই কৌশল কম ব্যবহার করে। এরা মূলত পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সঙ্গে মিশে থাকা অথবা শিকারিকে বিষাক্ত হওয়ার সংকেত দেওয়ার ওপর নির্ভর করে। ফড়িংয়ের মতো শিকারি পোকামাকড়ের দৃষ্টি পাখির চেয়ে অনেক বেশি প্রখর হওয়ায় তারা সহজেই প্রজাপতি শিকার করতে পারে।
জীববিজ্ঞানের বাইরেও নতুন এই গবেষণার বাস্তব প্রয়োগ রয়েছে। মোশন ভিশন মডেলটি সড়ক নিরাপত্তা উন্নত করতে কাজে লাগতে পারে। এছাড়া ফ্লাইট সিমুলেটর বা চলমান সামরিক যান, ড্রোন ও রোবটকে দৃষ্টির হাত থেকে রক্ষায় এর ফলাফল ব্যবহার করা যেতে পারে বলে জানান গবেষকরা।
আরও পড়ুন
‘কৃত্রিম তারা’ তৈরিতে লেজার ব্যবহার
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৫ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
-->চিলির আতাকামা মরুভূমিতে রাতের আঁধারে আকাশে তাকালে এক অভাবনীয় দৃশ্য চোখে পড়বে। সেখানে পাহাড়ের চূড়া থেকে বিশাল আকৃতির বেশ কয়েকটি উজ্জ্বল লেজার রশ্মি আকাশের দিকে ছুটে যাচ্ছে। দূর থেকে দেখলে এটিকে কোনো কল্পবিজ্ঞান চলচ্চিত্রের দৃশ্য বলে মনে হতে পারে। তবে এর উৎস একটি বিশাল দূরবীক্ষণ যন্ত্র। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের শেষ প্রান্তে ‘কৃত্রিম তারা’ তৈরির জন্য জ্যোতির্বিদরা এই লেজারগুলো ব্যবহার করছেন। আজ সন্ধ্যায় সেখানে গেলে হয়তো দেখা যাবে, পাহাড়ের চূড়ার চারটি ভিন্ন স্থাপনা থেকে একই সঙ্গে চারটি লেজার ছোড়া হচ্ছে। মহাকাশ পর্যবেক্ষণের ইতিহাসে এমন ঘটনা এবারই প্রথম।
ইউরোপিয়ান সাউদার্ন অবজারভেটরির (ইএসও) পরিচালনায় চিলির এই বিশাল স্থাপনার নাম ‘ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ’ (ভিএলটি)। সম্প্রতি এই টেলিস্কোপের এক নতুন মাইলফলক অর্জিত হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষের দিকে প্রকৌশলীরা এখানে নতুন কয়েকটি শক্তিশালী লেজার স্থাপনের কাজ শেষ করেন। ফলে এখানে এখন মোট সাতটি লেজার ব্যবহৃত হচ্ছে। এই লেজারগুলো জ্যোতির্বিদদের মহাকাশের গভীরে আরও নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে সাহায্য করছে। কিন্তু একটি টেলিস্কোপের জন্য কেন এত শক্তিশালী লেজার প্রয়োজন?
জ্যোতির্বিজ্ঞানে লেজার ব্যবহারের ধারণা মূলত স্নায়ুযুদ্ধের সময় থেকে এসেছে। সে সময় মার্কিন সামরিক বাহিনী সোভিয়েত উপগ্রহের ওপর নজরদারির জন্য এই প্রযুক্তি তৈরি করেছিল। পরে জ্যোতির্বিদরা বুঝতে পারেন, পৃথিবী থেকে মহাকাশ পর্যবেক্ষণের মান বাড়াতে এই প্রযুক্তি দারুণ কাজে আসতে পারে।
আরও পড়ুন
মহাকাশভিত্তিক টেলিস্কোপের তুলনায় পৃথিবীর বুকে থাকা টেলিস্কোপগুলোকে একটি বড় সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। আর তা হলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল। নক্ষত্রের আলো যখন টেলিস্কোপের আয়নায় এসে পৌঁছায়, তার আগেই বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন গ্যাসের কারণে আলোর স্বাভাবিক গতিপথ কিছুটা বেঁকে যায়। এছাড়া বায়ুমণ্ডলের অবস্থাও প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হতে থাকে।
ইএসও প্রকল্পের বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ অ্যামেলিয়া বায়ো বলেন, বায়ুমণ্ডল পৃথিবীকে রক্ষা করলেও জ্যোতির্বিদদের জন্য এটি অনেক সময় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ এটি নক্ষত্র থেকে আসা আলোর স্পষ্টতা নষ্ট করে দেয়। এর প্রভাব দূর করতে না পারলে টেলিস্কোপের সেন্সরে নক্ষত্রের অবস্থান বারবার পরিবর্তিত হতে থাকে। ফলে নক্ষত্রের অস্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য জ্যোতির্বিদরা ‘অ্যাডাপটিভ অপটিকস’ নামের একটি বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। বিকৃত আলো প্রথমে টেলিস্কোপের মূল আয়নায় আঘাত করে। এরপর তা প্রতিফলিত হয়ে ছোট একটি আয়নায় যায়। এই ছোট আয়নাটি বায়ুমণ্ডলের বিকৃতি অনুযায়ী নিজের আকার পরিবর্তন করে আলোর সঠিক রূপটি ফিরিয়ে আনে। ভিএলটিতে থাকা এই আয়নাগুলো ‘পিয়েজোইলেকট্রিক’ উপাদান দিয়ে তৈরি এবং এগুলো একটি চৌম্বকীয় ক্ষেত্রের মধ্যে ভাসমান থাকে। এর ফলে এগুলো অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে নিজেদের আকার পরিবর্তন করতে পারে।
তবে এই প্রযুক্তি সঠিকভাবে কাজ করার জন্য জ্যোতির্বিদদের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রকে মানদণ্ড হিসেবে ধরতে হয়। নক্ষত্রটি উজ্জ্বল হলে সেটি বায়ুমণ্ডলের বিকৃতি সংশোধন করতে বেশি তথ্য সরবরাহ করে। বিষয়টি অনেকটা কোনো গান শোনার মতো। শব্দের মাত্রা খুব কম থাকলে গানের সুর ও কথা বোঝা কঠিন হয়ে যায়। একইভাবে নক্ষত্রের আলো উজ্জ্বল না হলে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। কিন্তু আকাশের যে অংশে কোনো উজ্জ্বল নক্ষত্র থাকে না, সেখানে জ্যোতির্বিদরা লেজারের সাহায্য নেন।
টেলিস্কোপ থেকে আকাশের দিকে নির্দিষ্ট লেজার নিক্ষেপ করা হয়। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার ওপরে বায়ুমণ্ডলের সোডিয়ামসমৃদ্ধ স্তরকে এই লেজার উদ্দীপ্ত করে। তখন সোডিয়ামের পরমাণুগুলো ফোটন কণা নির্গত করে, যা টেলিস্কোপের আয়নায় ধরা পড়ে। এটিই মূলত কৃত্রিম তারা হিসেবে কাজ করে।
ভিএলটিতে বর্তমানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির লেজার ব্যবহৃত হচ্ছে। পুরোনো লেজারগুলো পরিচালনা করা বেশ কঠিন ছিল। তখন ক্ষতিকর তরল রং ব্যবহার করা হতো এবং সেগুলো স্থিতিশীল করতে অনেক দিন সময় লাগত। তবে এখনকার লেজারগুলো অনেক বেশি স্থিতিশীল। এখন বাটন চাপলে একটি লেজার সারা রাত একইভাবে কাজ করতে পারে।
২০২৬ সাল থেকে ভিএলটির প্রধান চারটি টেলিস্কোপ একসঙ্গে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। এগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে একটি বিশাল ‘ভার্চুয়াল’ টেলিস্কোপ তৈরি করতে পারে। প্রতিটি লেজারের ৩০ সেন্টিমিটার প্রশস্ত রশ্মি থেকে ২২ ওয়াট ক্ষমতার শক্তি বের হয়। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সৌরজগতের বাইরের কোনো গ্রহের প্রথম ছবি তোলা এবং মিল্কিওয়ে ছায়াপথের কেন্দ্রের ব্ল্যাকহোলের চারপাশের নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ সম্ভব হয়েছে।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, লেজার নিক্ষেপের সময় ওপর দিয়ে কোনো বিমান উড়ে গেলে কী হবে। ইএসওর চিলি প্রতিনিধি ইৎজিয়ার দে গ্রেগোরিও মনসালভো জানান, এজন্য একটি স্বয়ংক্রিয় নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে। পর্যবেক্ষণের কাছাকাছি দিয়ে কোনো বিমান গেলে লেজারগুলো নিজ থেকে বন্ধ হয়ে যায়।
আরও পড়ুন
৫০ বছরের কম বয়সিদের মধ্যে ক্যানসারের হার বেশি
প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
-->৫০ বছরের কম বয়সি বয়স্কদের মধ্যে প্রস্টেট, কিডনি, জরায়ু, লিভার, অগ্ন্যাশয় এবং স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
'ওয়ার্ল্ড ক্যানসার রিসার্চ ফান্ড' জানিয়েছে, যদিও বেশিরভাগ ক্যানসার এখনো বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যেই বেশি ধরা পড়ে, তবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আক্রান্তের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা উদ্বেগজনক এবং এটি সবাইকে একবার থেমে ভেবে দেখার তাগিদ দিচ্ছে।
সংস্থাটি ইংল্যান্ডের এনএইচএস-এর ২০০১ থেকে ২০২৩ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই তুলনা তুলে ধরেছে।
আরও পড়ুন
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে ৫০ বছরের কম বয়সি প্রতি ১ লাখ পুরুষের মধ্যে প্রস্টেট ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ১ জন, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৬ জনে।
৫০ বছরের কম বয়সি নারীদের ক্ষেত্রে জরায়ু ক্যানসারে আক্রান্তের হার ২০০১ সালের প্রতি ১ লাখে ১ দশমিক ৮ জন থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৩ দশমিক ৯ জন হয়েছে।
একই বয়সি নারীদের মধ্যে স্তন ক্যানসারে আক্রান্তের হার ২০০১ সালের প্রতি ১ লাখে ৪২ জন থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৪৭ দশমিক ৫ জন হয়েছে।
তরুণদের মধ্যে কোলন বা কোলরেক্টাল ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যা ২০০১ সালের প্রতি ১ লাখে ৩ দশমিক ৯ জন থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৮ দশমিক ৪ জন হয়েছে।
৫০ বছরের কম বয়সিদের মধ্যে কিডনি ক্যানসারের হার ২০০১ সালের প্রতি ১ লাখে ১ দশমিক ৫ জন থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৩ জন হয়েছে।
একই সময়ে লিভার ক্যানসারের হার ২০০১ সালের প্রতি ১ লাখে ০ দশমিক ৫ জন থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ০ দশমিক ৮ জন হয়েছে।
আর কম বয়সে অগ্ন্যাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্তের হার ২০০১ সালের প্রতি ১ লাখে ০ দশমিক ৮ জন থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ১ জন হয়েছে।
'ক্যানসার রিসার্চ ইউকে'-এর তথ্য বলছে, ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যে ২৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সিদের মধ্যে সার্বিক ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার হার ২৪ শতাংশ বেড়েছে।
ওয়ার্ল্ড ক্যানসার রিসার্চ ফান্ডের গবেষণা ও নীতি নির্ধারণী বিভাগের নির্বাহী পরিচালক ড. গিওটা মিত্রো বলেন, ‘এই পরিসংখ্যানগুলোর দিকে আমাদের গুরুত্ব সহকারে নজর দেওয়া উচিত, কারণ এই বর্তমান গতিপথ সত্যিই উদ্বেগজনক।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে আছেন একজন মানুষ, যিনি তার পরিবার ও চিকিৎসকের ধারণার চেয়েও অনেক কম বয়সে ক্যানসারের মুখোমুখি হচ্ছেন। এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে ইংল্যান্ডে কম বয়সে ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার চিত্রটি কেবল কোলন ক্যানসারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আরও অনেক বেশি বিস্তৃত ও জটিল।’
ক্যানসার এখনো বয়স্কদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়, তবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই পরিবর্তনের ধারাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে গবেষণা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
ওয়ার্ল্ড ক্যানসার রিসার্চ ফান্ড জানিয়েছে, কম বয়সে ক্যানসার হওয়ার পেছনে মূল জৈবিক কারণগুলো এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ঠিক কী কারণে এই বৃদ্ধি ঘটছে তা অনুসন্ধানে তারা আরও গবেষণার আহ্বান জানিয়েছে।
সম্প্রতি তরুণদের মধ্যে কোলন ক্যানসার কেন বাড়ছে তা তদন্ত করতে একটি নতুন গবেষণা শুরু হওয়ার পর এই প্রতিবেদনটি সামনে এলো।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ১৯৯০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে কম বয়সে কোলন ক্যানসারে আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং এর মধ্যে যুক্তরাজ্যের বৃদ্ধির হার অন্যতম দ্রুততম। 'প্রস্পেক্ট-ইউকে' নামের এই ট্রায়ালে আড়াই লাখ মানুষের খাদ্যভ্যাস ও জীবনযাত্রার ওপর নজর রেখে গবেষণা চালানো হবে।
তামান্না রুপা/
আরও পড়ুন
আর্কটিক অভিযান শেষে শাংহাইয়ে ফিরল চীনের দুই গবেষণা জাহাজ
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম
আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম
চীনের গবেষণা জাহাজ
-->প্রায় তিন মাসের সফল আর্কটিক মহাসাগর অভিযান শেষে চীনের গবেষণা জাহাজ ‘সুয়েলং’ ও ‘সুয়েলং-২’ বুধবার পূর্বাঞ্চলীয় শহর শাংহাইয়ে ফিরেছে। ‘স্নো ড্রাগন’ ও ‘স্নো ড্রাগন-২’ নামে পরিচিত এই দুই জাহাজ চীনের ১৬তম আর্কটিক মহাসাগর অভিযানে অংশ নেয়।
অভিযানে জলবায়ু ও পরিবেশের ব্যাপক পর্যবেক্ষণ, গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। অভিযান পরিচালনাকারী দলের তথ্য অনুযায়ী, এবারের অভিযানের পরিসর এবং সম্পন্ন করা গবেষণা কার্যক্রমের সংখ্যা—উভয় ক্ষেত্রেই নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
অভিযানে নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, তাত্ত্বিক গবেষণায় অগ্রগতি, প্রযুক্তিগত পরীক্ষা এবং বিভিন্ন অত্যাধুনিক সরঞ্জামের ব্যবহারসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল অর্জিত হয়েছে।
আরও পড়ুন
গবেষকদের মতে, এসব ফলাফল বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও গভীরভাবে বোঝা এবং এর প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নেও এসব গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চীনের প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে পরিচালিত এবারের অভিযানে ‘সুয়েলং’, ‘সুয়েলং-২’, ‘চিতি’ এবং ‘থানসো-৩’—এই চারটি গবেষণা জাহাজ অংশ নেয়।
এর মধ্যে ‘চিতি’ ও ‘থানসো-৩’ এখনও গবেষণা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। জাহাজ দুটি অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে চীনে ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আর্কটিক অঞ্চলে ধারাবাহিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন, সামুদ্রিক পরিবেশ ও মেরু অঞ্চলের পরিবর্তন সম্পর্কে জ্ঞান আরও সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতাও এগিয়ে নিচ্ছে চীন।
সূত্র: সিএমজি
