কেউ একা হয়ে যান বয়সের ভারে, কেউ হারিয়ে যান মানুষের ভিড়ে। কলকাতার এক বৃদ্ধ অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান শিক্ষিকার নিঃসঙ্গ জীবন একদিন গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল অপর্ণা সেনকে। একবার পড়ে গিয়ে যার হাত ভেঙে গিয়েছিল। পাশে ছিলেন না পরিবারের কেউ, ভরসা বলতে কয়েকজন সহৃদয় প্রতিবেশী। সেই নিঃসঙ্গতার স্মৃতি থেকেই জন্ম নেয় ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’— ভারতীয় সিনেমার অন্যতম সংবেদনশীল চলচ্চিত্র, যা পরিচালনার মধ্য দিয়ে নতুন এক পরিচয় গড়ে নেন অপর্ণা সেন।
আজ ২৫ অক্টোবর, ৮১ বছরে পা দিলেন এই অভিনেত্রী, চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক। সত্যজিৎ রায়ের ‘তিন কন্যা’ দিয়ে অভিনয়জীবনের শুরু ১৯৬১ সালে। কিন্তু পর্দায় পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার পরও প্রচলিত চরিত্রের গণ্ডি তাকে তৃপ্ত করতে পারেনি। সাহিত্য ও বিশ্বসিনেমার আবহে বেড়ে ওঠা অপর্ণা খুঁজছিলেন এমন গল্প, যেখানে মানুষের অন্তর্গত নিঃসঙ্গতা, দ্বন্দ্ব আর অব্যক্ত আকাঙ্ক্ষা জায়গা পাবে। অভিনয়ের পরিচিত পথ ছেড়ে তাই হাতে তুলে নেন চিত্রনাট্য, পরে ক্যামেরার পেছনে দাঁড়ান।
ইংরেজিতে নির্মিত ছবিটি প্রযোজনা করতে প্রথমে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না অনেকে। অপর্ণা চিত্রনাট্য নিয়ে যান সত্যজিৎ রায়ের কাছে। তার উৎসাহেই শশী কাপুরের সঙ্গে যোগাযোগ; শেষ পর্যন্ত প্রযোজক হিসেবে এগিয়ে আসেন শশী। ১৯৮১ সালে মুক্তি পাওয়া ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয় অপর্ণাকে। কিন্তু ছবিটির বড় অর্জন পুরস্কারের চেয়েও গভীর। তা হলো, সমাজের চোখ এড়িয়ে যাওয়া এক বৃদ্ধ নারীর নিঃসঙ্গতাকে সর্বজনীন মানবিক অভিজ্ঞতা করে তুলেছিলেন অপর্ণা।
অপর্ণা সেন ও সত্যজিৎ রায়
তার এ দৃষ্টিই আরো তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে ‘পরমা’ (১৯৮৫) চলচ্চিত্রে। বিবাহিত এক নারীর আত্ম-আবিষ্কার ও আকাঙ্ক্ষার গল্প বলতে গিয়ে অপর্ণা প্রশ্ন তোলেন— স্ত্রী ও মা পরিচয়ের বাইরে একজন নারীর নিজ সত্তার জায়গা কোথায়? সিনেমাটির অনুপ্রেরণা ছিল তার স্কুলজীবনের এক মেধাবী সহপাঠিনী, যার সম্ভাবনাময় জীবন সময়ের সঙ্গে গৃহস্থালির প্রচলিত ভূমিকায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। পুরনো বন্ধুদের কাছে যিনি ছিলেন প্রাণবন্ত ও স্বাধীন, পরিবারের পরিসরে তিনিই হয়ে উঠতেন প্রত্যাশা পূরণে ব্যস্ত এক বধূ। পরিচিত সেই নারীর দুই সত্তার ফারাকই অপর্ণাকে ভাবিয়েছিল— সামাজিক পরিচয়ের আড়ালে মানুষটি আসলে কে?
‘পরমা’ মুক্তির পর বিতর্কও কম হয়নি। অনেকেই ছবিটিকে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের নৈতিকতার প্রশ্নে আটকে রেখেছিলেন। অথচ অপর্ণার আগ্রহ ছিল আরো গভীরে। একজন নারী নিজের ইচ্ছা ও পরিচয় আবিষ্কার করতে চাইলে সমাজ কেন তার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়? পরবর্তী সময়ে কিছু নারী গোপনে সিনেমাটির দেখতে যাওয়া এবং তাকে ধন্যবাদ জানানোর স্মৃতি তুলে ধরেছিলেন অপর্ণা। তাদের প্রতিক্রিয়া বুঝিয়ে দিয়েছিল, যে অভিজ্ঞতা প্রকাশ্যে উচ্চারণ করা কঠিন, পর্দায় তার স্বীকৃতি অনেকের কাছেই কতটা জরুরি।
চলচ্চিত্রে অপর্ণা সেন
অপর্ণার সিনেমায় নারীরা কখনো নিখুঁত নন, তারা দ্বিধাগ্রস্ত, ভুল করেন, ভালোবাসেন, ভয় পান, আবার বদলেও যান। ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’ (২০০২)-এ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে আচ্ছন্ন এক হিন্দু নারী বিপদের মুখে এক মুসলিম সহযাত্রীর জীবন রক্ষা করেন। ‘পরমিতার এক দিন’ (২০০০)-এ উঠে আসে শাশুড়ি ও সাবেক পুত্রবধূর সম্পর্কের গভীরতা, আর ‘১৫ পার্ক অ্যাভিনিউ’ (২০০৫)-এ মানসিক অসুস্থতা ও পারিবারিক দায়িত্বের জটিল বাস্তবতা। মানুষকে সহজে ভালো-মন্দের খোপে আটকে না রেখে তার ভেতরের দ্বন্দ্বকে বুঝতে চাওয়াই অপর্ণার সিনেমার স্বতন্ত্র শক্তি।
অভিনেত্রী হওয়ার আগেও অবশ্য আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত হয়েছিল অপর্ণার মুখ। ১৯৬০ সালে কিশোরী অপর্ণাকে নিয়ে নিউজিল্যান্ডের আলোকচিত্রী ব্রায়ান ব্রেক ধারণ করেন বিখ্যাত ‘মনসুন গার্ল’। বৃষ্টিভেজা সেই দৃশ্যটি ছিল পরিকল্পিত— প্রাকৃতিক বৃষ্টির বদলে তার গায়ে পানি ঢালা হয়েছিল। ছবিটি ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্বের নানা প্রান্তে। পরে অন্যের ক্যামেরার সামনে থাকা সেই কিশোরীই নিজের চলচ্চিত্রে মানুষের জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণের দায়িত্ব নেন।
সিনেমার বাইরেও সাহিত্য তার সঙ্গী। করোনাকালে তিনি জীবনানন্দ দাশ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ ও জয় গোস্বামীর মতো কবিদের কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদে মন দেন। বাংলা কবিতার আধুনিক অনুভবকে বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়ার এই প্রয়াসও তার শিল্পীসত্তার আরেক পরিচয়।
তবে ৮১ বছরে এসে অপর্ণা নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন সিনেমার ভবিষ্যৎ নিয়ে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে তিনি আক্ষেপ করেছিলেন, বদলে যাওয়া দর্শক-রুচির মধ্যে তার কাঙ্ক্ষিত ধরনের গভীর ও নিরীক্ষাধর্মী ছবির জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। আরো ছবি বানাবেন কিনা, তা নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন। যদিও অবসরের কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা দেননি। যে শিল্পী একসময় নিজের প্রথম ছবির জন্য প্রযোজক খুঁজতে লড়েছিলেন, তারই আজ সংশয়— এমন গল্প শোনার মতো দর্শক কি আর আছে?
অপর্ণা সেনের জীবন তাই শুধু পুরস্কারজয়ী চলচ্চিত্রের তালিকা নয়। তা একা হয়ে যাওয়া বৃদ্ধার দিকে ফিরে তাকানোর গল্প, সামাজিক পরিচয়ের আড়ালে চাপা পড়ে যাওয়া নারীর সত্তাকে খুঁজে ফেরার গল্প, আর মানুষের পূর্বধারণার ভেতরেও মানবিকতার সম্ভাবনা আবিষ্কারের গল্প।
