মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে বিষয়টি বেশ অদ্ভুত রকমের হতাশাজনক ঠেকতে পারে। তিনি বারবার বিশ্বকে ঠিক যেমনটি তিনি, ঠিক তেমনভাবেই নিজের পরিচয় দিয়ে চলেছেন, অথচ বিশ্ব তা কিছুতেই বিশ্বাস করতে চাইছে না।
ট্রাম্প যত স্পষ্টভাবে সম্ভব ঘোষণা করছেন যে- তিনি মুক্ত বিশ্বের নেতা নন, গণতান্ত্রিক পশ্চিমের কোনো নির্ভরযোগ্য সদস্যও নন, বরং তিনি আসলে তাদের শত্রুদের একজন মিত্র- কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব হয় বার্তাটি পুরোপুরি বুঝতে পারছে না, অথবা এর থেকে স্পষ্ট সত্যটা মেনে নেওয়ার সাহস পাচ্ছে না।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প আরো একবার বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছেন। রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধে তিনি কোনো মধ্যস্থতাকারী বা শান্তিপ্রণেতা নন, বরং ভ্লাদিমির পুতিনের দোসর- তিনি তা নানাভাবেই ঘোষণা করেছেন। তার প্রতি সুবিচার করেই বলতে হয়, হোয়াইট হাউজে ফিরে আসার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওভাল অফিসে ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ক্যামেরার সামনে অপমানজনক আচরণ করার সময় তিনি উচ্চস্বরেই এই ঘোষণা দিয়েছিলেন। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যখন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার দাবি তুলছিলেন, ঠিক তখনই ট্রাম্প তাকে অপমান করে বলেছিলেন, “আপনার হাতে কোনো তাস নেই।” সেটা দিয়েই ট্রাম্পের অবস্থান যথেষ্ট স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু গত কয়েক দিনে তিনি যেন বিষয়টি একেবারে খোলাখুলিভাবে সামনে এনেছেন।
গত সপ্তাহে ইউক্রেনীয় বাহিনী দেখতে পায় যে, কিয়েভ তাদের ড্রোন চালনা পরিচালনার জন্য ইলন মাস্কের স্টারলিংক সিস্টেমের যে সংস্করণটি ব্যবহার করত, তা ঘণ্টায় ১০০ মাইলের বেশি গতিতে আর কাজ করছে না। এর অর্থ শুধু ফ্রন্টলাইনের পেছনে ইউক্রেনের আঘাত হানার ক্ষমতা হঠাৎ করে কমে যাওয়াই নয়, একই সঙ্গে রুশ জেট-চালিত ড্রোন থেকে রাজধানী রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও পঙ্গু হয়ে গেছে। এটি কোনো প্রযুক্তিগত ত্রুটি ছিল না। স্টারলিংকের সামরিক সংস্করণ ‘স্টারশিল্ড’-এর মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ মার্কিন সরকারের হাতে- আর রয়টার্স যেমনটি জানিয়েছে, ইউক্রেনে এর ব্যবহার সীমিত করার আদেশ হোয়াইট হাউজ থেকেই এসেছে। সহজ কথায়, ইউক্রেনের নিজেদের রক্ষা করার ক্ষমতাকে দুর্বল করতে ট্রাম্প এই যুদ্ধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন। ব্রিটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মরগানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, “এই সিদ্ধান্ত অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটাবে। মানুষ নিশ্চিতভাবেই মারা যাবে।”
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপটি হঠাৎ আকাশ থেকে পড়ার মতো কোনো ঘটনা ছিল না। ঠিক এই একই সপ্তাহে ইউক্রেন মস্কো কখন বা কোথায় আক্রমণ করতে চলেছে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই অন্তত দুদিন রুশ বোমাবর্ষণের শিকার হয়েছে। কিয়েভের সঙ্গে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ট্রাম্প ছিন্ন করেছেন বলে গুঞ্জন উঠলেও তিনি তা অস্বীকার করেছেন; কিন্তু ঘটনাটি ঠিক সে রকমই মনে হচ্ছিল।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট মস্কোর ওপর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ভেঙে চার বিলিয়ন ডলার মূল্যের রাশিয়ান ডিজেল তেল কিনতে সম্মত হন। মার্কিন বাজারে এই পরিমাণ ডিজেল বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না, যেখানে উচ্চ ডিজেল মূল্যের কারণে গ্রামীণ এলাকার বেশ কয়েকটি রাজ্যে রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচনকালীন অবস্থা কিছুটা ঝুঁকিতে পড়েছে, তবে এটি পুতিনের যুদ্ধযন্ত্রের জন্য এক বিরাট নগদ অর্থ সহায়তা হিসেবে কাজ করবে। রাশিয়ার সামরিক অবস্থান যখন বেশ নড়বড়ে মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই ডোনাল্ড ট্রাম্প উদ্ধারে এগিয়ে এলেন। এর সাথে ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের একটি গলফ ক্লাবে ডিসেম্বরের জি২০ সম্মেলনে পুতিনকে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি যোগ করুন- তাহলে দেখতে পাবেন এমন একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে, যিনি রাশিয়ার প্রতি তার সমর্থন এবং ইউক্রেনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা যেন আকাশে প্লেন দিয়ে ধোঁয়া তুলে লিখে দিচ্ছেন।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মস্কোর সঙ্গে তার এই বন্ধুত্বের নেপথ্যে কোন অন্ধকার রহস্য লুকিয়ে আছে, তা খুঁজতে অনেকে অনেক চেষ্টা করেছেন। আমি আমার সহকর্মী ও বিশেষজ্ঞ লুক হার্ডিংয়ের মতের সাথেই একমত। লুক হার্ডিংকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে ট্রাম্প রাশিয়ান গোয়েন্দা সংস্থার কোনো এজেন্ট কি না, তখন তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন: যদি ট্রাম্প সত্যি একজন রাশিয়ান এজেন্ট হতেন, তবে তিনি বর্তমানের চেয়ে আর কোন দিক থেকে আলাদা আচরণ করতেন?
উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন- তা সে লোভ, মতাদর্শ, একনায়কদের প্রতি অন্ধ প্রীতি বা কোনো আপত্তিকর তথ্যের চাপেরই ফল হোক না কেন- বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। পশ্চিমা জোটের সবচেয়ে শক্তিশালী সদস্যটি হয় একজন অবিশ্বস্ত অংশীদার, নতুবা এই জোটের প্রধান শত্রুর সাথেই হাত মিলিয়েছে। এটি কেন এত বিপজ্জনক, তা নতুন করে বলার কিছু নেই, বিশেষ করে এমন এক সপ্তাহে যখন এমআই৫-এর প্রধান রাশিয়াকে ‘এক নম্বর আগ্রাসী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বছরের পর বছর ধরে ক্রেমলিন ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর ওপর বিভিন্ন উপায়ে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, ‘ফেব্রুয়ারি ২০২২ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে ইউরোপে অন্তত ১৫১টি নিশ্চিত রাশিয়ান-নির্দেশিত শিল্প নাশকতা’ ঘটেছে, আর গত সপ্তাহান্তে ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর প্রধান নির্বাহীদের হত্যার একটি রাশিয়ান পরিকল্পনার কথাও সামনে এসেছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন আসতে আর মাত্র দেড় সপ্তাহ বাকি, যে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় এবং ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটরা যদি কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়, তাহলে অনেক ইউরোপীয় নেতার মনে এই ভুল ধারণা হতে পারে যে বিপদ কেটে গেছে এবং স্বাভাবিক সম্পর্ক বুঝি আবার ফিরে আসছে। সেটা হবে এক মারাত্মক ভুল।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক মিত্রদের এই নতুন পরিস্থিতিতে কী করা উচিত? প্রথম কাজ হলো ইউক্রেনকে আগের চেয়ে আরো জোরালোভাবে সমর্থন দিয়ে যাওয়া, কারণ ওয়াশিংটন এখন কার্যত পক্ষ বদল করেছে। দ্বিতীয় কাজটি হলো আসন্ন একটি বড় ভুল এড়ানো। মধ্যবর্তী নির্বাচন আসতে আর মাত্র দেড় সপ্তাহ বাকি, যে নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় এবং ট্রাম্পের জন্য বড় ধাক্কা আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটরা যদি কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়, তাহলে অনেক ইউরোপীয় নেতার মনে এই ভুল ধারণা হতে পারে যে বিপদ কেটে গেছে এবং স্বাভাবিক সম্পর্ক বুঝি আবার ফিরে আসছে। সেটা হবে এক মারাত্মক ভুল।
গত দুই বছর ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকলেও, এর কোনো গ্যারান্টি নেই যে কোণঠাসা ট্রাম্প একজন শান্ত স্বভাবের নেতা হয়ে উঠবেন। বরং ওয়াশিংটনের এক অভিজ্ঞ ব্যক্তি সতর্ক করে বলেন যে, ট্রাম্প আরো বেশি উগ্র হয়ে উঠতে পারেন, বিশেষ করে পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে যেখানে প্রেসিডেন্টের হাত অনেকটাই মুক্ত থাকে। তাছাড়া, ট্রাম্প একদিন ক্ষমতা থেকে চলে যাবেন- কিন্তু তাতেও আশ্বস্ত হওয়ার কিছু নেই। একজন সাবেক ব্রিটিশ মন্ত্রী আমাকে বলেন, “এই পরিবর্তন স্থায়ী।” অন্ততপক্ষে ট্রাম্প এই সত্যটি প্রমাণ করে দিয়েছেন যে ট্রাম্প এবং ট্রাম্পবাদ যেকোনো সময়ই ঘটতে পারে: এখন আমরা জানি যে পশ্চিমা জোট কোনোভাবেই অটল বা নিশ্চিত নয়, বরং মার্কিন রাজনৈতিক আবহাওয়ার সামান্য পরিবর্তনেই তা ভেঙে পড়তে পারে।
এই সবকিছুর অর্থ হলো আমরা এখন এক বিপদসঙ্কুল বিশ্বে বাস করছি। গর্ডন রাচম্যানের নতুন বই ‘ওয়ার ইজ ইন্টারেস্টেড ইন ইউ’-এর কথাই ধরা যাক, যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় নীতিনির্ধারকরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকিকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। এটি এমন এক সময় যখন নিজেদের সুরক্ষার জন্য আমরা আর অন্যদের ওপর ভরসা করতে পারি না। মার্কিন হার্ডওয়্যার বা সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীলদের জন্য স্টারলিংক পর্বের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো- যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো সেবার ‘সুইচ অফ’ করে দিতে পারে। সহজ কথায়, যুক্তরাজ্য ও বাকি ইউরোপকে নিজেদের সেনাবাহিনী ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নিজেদের সুরক্ষার ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে।
সরকারগুলোর জন্য এই কথাটি জোরালোভাবে বলার সেরা সময়টি ছিল গত বছর জেলেনস্কির সঙ্গে ওভাল অফিসের সেই মর্মান্তিক ঘটনার রাতেই। তবে দ্বিতীয় সেরা সময়টি হলো এখনই। পরিবর্তিত ও বিপদসঙ্কুল এই বিশ্বে নিজেদের বাঁচাতে আমাদের যেকোনো মূল্যে প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়াতে হবে।
লেখক: জোনাথন ফ্রিডল্যান্ড হলেন দ্য গার্ডিয়ানের কলামিস্ট।
দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত
