কখনো তিনি নূপুরের নিক্বণে ধ্রুপদি ছন্দে মাতাল করেন তনুমনে, আবার কখনো অভিনয়ের সাবলীল তুলিতে এঁকে দেন জীবনমুখী সব চরিত্র। ‘রঙের মানুষ’ থেকে শুরু করে রুপালি পর্দার সেই পরিচিত মুখটি যেন এক শান্ত নদীর মতোÑ যার গভীরতা অনুভব করা যায়, কিন্তু সহজে ছোঁয়া যায় না। আয়েশা সালমা মুক্তিÑ এক স্নিগ্ধ নাম, যার হাসিতে ঝরে পড়ে নীলপদ্মের নীরব শুভ্রতা।
তার শুরুটা হয়েছিল মডেলিংয়ের মাধ্যমে। এরপর নাম লেখান ছোট পর্দায়। দুই দশক আগে মুক্তি ‘রঙের মানুষ’ ধারাবাহিকে ‘দিলখুশ’ চরিত্রে অভিনয় করে তুমুল সাড়া ফেলেছিলেন। অভিনয় করেছেন বিজ্ঞাপনচিত্র আর চলচ্চিত্রেও। কিন্তু খুব নিয়মিত অভিনয়ে দেখা যায়নি তাকে। সর্বশেষ এই অভিনেত্রীকে ২০২১ সালে মাবরুর রশিদ বান্নাহ পরিচালিত ‘বদমায়েশ পোলাপাইন’ নাটকে দেখা যায়। এই ধারাবাহিক নাটকে শিক্ষিকার চরিত্রে অভিনয় করে আলোচিত হন তিনি। তারপর দীর্ঘ বিরতি। তার আগে একই পরিচালকের ‘আমি বিয়ে করব না’ নামের একটি একক নাটক থেকেও বেশ সাড়া পেয়েছিলেন বলে জানান মুক্তি। এতে তার সহশিল্পী ছিল শামীম হাসান সরকার। তবে এখন নতুন করে ফেরার অপেক্ষায় মুক্তি। বর্তমানে নিজেকে প্রস্তুত করছেন বলে আলাপকালে রূপালী বাংলাদেশকে জানান।
মুক্তি বলেন, ‘আমি কাজ করতে ভালোবাসি। ভালো কাজের ক্ষুধা শুরুর দিন থেকেই আছে। আমিও চাই আমাকে নিয়ে নির্মাতারা ভাবুক। কিন্তু সেই ভাবনার লোক এখন কতজনই আছেন? বর্তমান কাজের পরিবেশই বা কতটা অনুকূলে? জ্যেষ্ঠ শিল্পীরা সেভাবে কী মূল্যায়িত হচ্ছে? উত্তরটা খুবই সহজÑ হচ্ছে না। করার জন্য, পর্দায় থাকার জন্য কাজ করার পক্ষে আমি নই। সে রকম হলে মাসে ২৫ দিনই কাজ করতে পারি। আমি চাই যে গল্পে আগে কখনো আমাকে দেখা যায়নি, সে রকম কাজ দিয়ে ফিরতে চাই। নিজেকে মেলার ধরার সুযোগ আছে, দর্শক কাজটি থেকে বার্তা পাবে এবং অনেক দিন আমাকে নিয়ে ভাবতে বাধ্য করবেÑ এমন কাজের অপেক্ষায় আছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন যেসব কাজের প্রস্তাব আসে সেগুলো আমাকে টানে না। তার মানে যে এখন ভালো কাজ হচ্ছে না তা কিন্তু নয়। তবে ভালোর সংখ্যা হাতেগোনা। আর অভিনয়ে হুট করেই চলে আসিনি। অনেক সাধনা করে আজকের অবস্থানে আসতে হয়েছে। থিয়েটার করিনি ঠিক কিন্তু আদ্যোপান্ত শিখতে হয়েছে। যে কারণে যা তা কাজে নিজেকে যুক্ত করতে পারছি না। এখনকার শিল্পীদের মধ্যে সেই শেখার আগ্রহ বিন্দু পরিমাণ দেখি না। সবাই ভিউয়ের পেছনে ছুটছেন। ভিউ দরকার আছে কিন্তু ভিউ দিয়ে শিল্প ও শিল্পীর মূল্যায়ন করা যায় না। ভিউ সাময়িক আনন্দ দেয় ঠিক কিন্তু বেশিদিন টিকিয়ে রাখতে পারে না। ওটিটি, নাটক কিংবা চলচ্চিত্রÑ মাধ্যম যেটাই হোক ভালো পরিচালক, গল্প ও চরিত্র পেলে কাজ করব। এ ছাড়া আমি আগ্রহী নই। মানসিক শান্তি পাই, এমন কাজের অপেক্ষায় আছি।’
‘রঙের মানুষ’ ধারাবাহিকের দিলখুশ চরিত্রে অভিনয়ের পর তুমুল জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর মুক্তির কাজের পরিধি বাড়ার কথা থাকলেও বাস্তবে কমেছে। চরিত্রটি দর্শকপ্রিয়তার পর একই ঘরানার আরও গল্পের প্রস্তাব পেলেও ফিরিয়ে দেন এই অভিনেত্রী। কারণ, চেনা ছন্দে হাঁটতে পছন্দ করেন না মুক্তি। যে কারণে ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই খুব বুঝেশুনে পা ফেলছেন তিনি।
মডেলিংয়ের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করলেও নাটক-সিনেমাতে তিনি বেশ প্রশংসিত ছিলেন। ‘তুমি আছো হৃদয়ে’ সিনেমার মাধ্যমে তার বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে। এর কয়েক বছর পর ‘জোর করে ভালোবাসা হয় না’ সিনেমাতে শাকিব খানের সঙ্গেও অভিনয় করেন তিনি। তারপরও অভিনয়ে অনিয়মিত। কারণ হিসেবে জানান, কখনোই কাজের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ ছিল না। মানে বিশ্বাসী ‘ছায়াবিবি’ নাটকের সাড়া জাগানো এই অভিনেত্রী।
মুক্তির চোখের চাউনিতে যেমন এক নীরব গল্প আছে, তেমনি তার পায়ের নূপুরে বেজে ওঠে ধ্রুপদি ছন্দের মূর্ছনা। যেন কোনো এক শান্ত নদীর তীরে ফুটে থাকা একগুচ্ছ কাশফুল, যার শুভ্রতায় মিশে আছে এক অদ্ভুত মায়া। অভিনয়ের আঙিনায় তিনি যেমন প্রাণবন্ত ‘দিলখুশ’, তেমনি পর্দার আড়ালে তিনি এক চিরচেনা আভিজাত্যের প্রতিচ্ছবি।
ক্যামেরার লেন্সের সামনে তিনি যখন মডেল হিসেবে দাঁড়ান, তখন স্থিরচিত্রগুলো যেন প্রাণ পায় এক অলৌকিক লাবণ্যে। প্রতিটি ভঙ্গিমায় ফুটে ওঠে শিল্পের ব্যাকরণ, আর দৃষ্টিতে থাকে এক গভীর প্রশান্তি। আবার অভিনয়ের মঞ্চে তিনি যখন অন্য কোনো মানবী হয়ে ওঠেন, তখন মেকি আবরণের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সত্যটুকুই তিনি ফুটিয়ে তোলেন অনায়াসে। পর্দার প্রতিটি ফ্রেমে তিনি যখন ধরা দেন, তখন অভিনয়ের চেয়ে বেশি মায়া ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।
