আবরারের বাবা বরকত উল্লাহর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার বিভাগকে এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে গড়াই নদের ওপর ‘শহীদ আবরার ফাহাদ সেতু’ নির্মাণে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। আবরারের বাবা বরকত উল্লাহর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার বিভাগকে এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। কয়া ইউনিয়নের ঘোড়াঘাট-বড়বাজার সংযোগ সড়কে গড়াই নদীর ওপর ‘শহীদ আবরার ফাহাদ সেতু’ নির্মাণের দাবিতে করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। একই সঙ্গে এ বিষয়ে গৃহীত কার্যক্রমের অগ্রগতি প্রতিবেদন কার্যালয়ে পাঠাতে স্থানীয় সরকার বিভাগকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যেই গতকাল বুধবার দুপুরে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম গড়াই নদের ওপর প্রস্তাবিত শহীদ আবরার ফাহাদ সেতু নির্মাণের স্থান পরিদর্শনে যান। সেতুটির প্রাথমিক কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার পাশাপাশি চলতি শুষ্ক মৌসুমের শেষ দিকে মূল নির্মাণকাজ শুরুর আশাবাদ জানিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রটোকল অফিসার-১ ও সংসদ সদস্যগণের প্রতিশ্রুত ও প্রত্যাশিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন সমন্বয় সেলের সদস্য সচিব মো. উজ্জল হোসেন স্বাক্ষরিত ১০ অক্টোবরের এক চিঠিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। চিঠিটি স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, শহীদ আবরার ফাহাদের পিতা মো. বরকত উল্লাহ কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ১ নম্বর কয়া ইউনিয়নের ঘোড়াঘাট-বড়বাজার সংযোগ সড়কে গড়াই নদীর ওপর ‘শহীদ আবরার ফাহাদ সেতু’ নির্মাণের জন্য প্রধানমন্ত্রী বরাবর আবেদন করেছেন।
ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে এ বিষয়ে কার্যক্রমের অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানোর জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়েছে।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, কয়া, শিলাইদহ, চর সাদীপুর, নন্দলালপুর ও হরিপুর ইউনিয়নের একাংশের প্রায় দুই লাখ মানুষ এ এলাকার সঙ্গে যুক্ত। প্রতিদিন প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার মানুষ জীবিকা, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অগ্নিনির্বাপণসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে নৌকায় গড়াই নদী পার হয়ে কুষ্টিয়া শহরে যাতায়াত করেন। এতে শিশু, নারী, বয়স্ক ব্যক্তি, রোগী ও প্রসূতি মায়েদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
এর আগে, ২০২৫ সালের ৬ মার্চ এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে সেতু নির্মাণের আবেদন করা হয়। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার বিভাগের উন্নয়ন-২ শাখা ৩০ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে অনুরোধ জানায়।
ওই বছরের ৩০ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগ এ বিষয়ে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলীকে চিঠি দেয়। কুষ্টিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলীর পাঠানো চিঠিতে গড়াই নদের ওপর প্রস্তাবিত সেতুর দৈর্ঘ্য ৮০০ মিটার উল্লেখ করা হয়েছে।
আবেদনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নির্দেশনার পর ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর প্রকল্প পরিচালক (সেতু) প্রস্তাবিত সেতু এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। একই বছরের ৬ থেকে ৯ অক্টোবর পরিবেশবিষয়ক জরিপ করা হয়।
পরে ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রকৌশলীদের একটি উচ্চ পর্যায়ের দলও প্রস্তাবিত সেতুর স্থান পরিদর্শন করে।
বরকত উল্লাহ তাঁর আবেদনে জানান, সেতু নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবরে পরিবেশ বিষয়ক জরিপের জন্য একটি দল এবং পরে বুয়েটের প্রকৌশলীসহ আরেকটি দল এলাকাটি পরিদর্শন করে। এসব কার্যক্রমে স্থানীয় মানুষের মধ্যে সেতু নির্মাণের আশা তৈরি হয়েছে।
আবেদনে আরও বলা হয়, সেতুটি নির্মিত হলে কুষ্টিয়া শহরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হবে। পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিষ্ঠান সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহের কুঠিবাড়ী ও ফকির লালন সাঁইয়ের আখড়ার মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ হবে বলে আশা করছেন আবেদনকারীরা।
শহীদ আবরার ফাহাদের পিতা মো. বরকত উল্লাহ এলাকাবাসীর পক্ষে সেতুটি নির্মাণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানান।
তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠিতে সেতু নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন বা নির্মাণকাজ শুরুর কোনো সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়নি। এতে মূলত আবেদন অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ ও অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সরকার প্রধান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তারা এ দাবি তুলে ধরেন।
সাক্ষাতে আবরারের বাবা কুষ্টিয়ায় গড়াই নদীর ওপর একটি সেতু নির্মাণ এবং সেটি আবরারের নামে নামকরণের দাবি তোলেন। তিনি বলেন, ওই এলাকার প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ সাঁকো দিয়ে নদী পারাপার করেন। প্রধানমন্ত্রী সেতু নির্মাণের বিষয়ে আশ্বাস দেন এবং সেটি আবরার ফাহাদের নামে করার প্রতিশ্রুতি দেন।
গতকাল বুধবার কুষ্টিয়া সফরে আসেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম। তিনি গড়াই নদের ওপর প্রস্তাবিত শহীদ আবরার ফাহাদ সেতু নির্মাণের স্থান পরিদর্শন করেন। সেতুর স্থানটি পরিদর্শন করে মন্ত্রী সেখানে সেতু নির্মাণের উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।
এ উদ্যোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে শহীদ আবরার ফাহাদের পিতা বরকত উল্লাহ বলেন, সেতুর নাম ‘শহীদ আবরার ফাহাদ সেতু’ করা এলাকার জনগণের প্রধান দাবি। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সময় তিনি সেতুটির নাম শহীদ আবরার ফাহাদ সেতু করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। এ বিষয়ে লিখিত আবেদনও জানিয়েছিলেন। এখন ছেলের নামে সেতুর নামকরণ করায় তিনি খুশি।
আবরার ফাহাদ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তড়িৎ ও ইলেকট্রনিকস কৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর দিবাগত রাতে বুয়েটের শেরেবাংলা হলে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) একদল নেতা-কর্মী। আবরার কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নের রায়ডাঙ্গা গ্রামের বরকত উল্লাহর ছেলে।
এলাকাবাসী জানান, গড়াই নদীর উপর আবরার ফাহাদ সেতু বাস্তবায়ন হলে পদ্মা-গড়াই অধ্যুষিত ৪ ইউনিয়নসহ পাবনা জেলার হাজার হাজার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবী পূরন হবে। কুষ্টিয়ার বড় বাজার ঘোড়াইঘাটে কুষ্টিয়া হরিপুর সংযোগ সেতু স্থাপনের দাবীটিও ছিলো দীর্ঘদিনের। এই স্থানে সেতু নির্মাণ হলে ২ লক্ষাধিক মানুষের দুঃখ কষ্ট লাঘব হবে। হরিপুর, কয়া ও শিলাইদহ, চরসাদীপুর ও নন্দলালপুর ইউনিয়নবাসীসহ পাবনা জেলার ২ লক্ষাধিক মানুষের নিরাপদে যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত হবে। সেই সাথে সরকারের রাজস্বও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
ইতিপূবে সেতুটি নির্মাণের জন্য কয়া ইউনিয়নসহ ৪টি ইউনিয়নের জনসাধারণ সভা, সমাবেশ, মানব বন্ধন র্যালীসহ বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করে ।
সেখানে দাবি করা হয় প্রতিদিন বড়বাজার ঘাট দিয়ে কয়া, শিলাইদহ, চরসাদীপুর ও নন্দলালপুর ইউনিয়ন ও পাবনা জেলার ৫০ হাজার পারাপার হয়। এই এলাকার নদীর সন্নিকটে সরাসরি রাস্তাও রয়েছে। আছে স্কুল-কলেজ, বাজার, মসজিদ-মাদ্রাসা, ব্যাংক। এছাড়াও শিলাইদহ কুঠিবাড়ি রয়েছে এই এলাকায়।
বিভিন্ন সূত্রমতে, বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে এই সেতু নির্মানের পরিকল্পনার শুরুতেই নদীর গতি-প্রকৃতি, স্রোতের তীব্রতা, বর্ষাকালে নদীর প্রস্থ (সর্বোচ্চ বন্যার সময়), মাটির বহন ক্ষমতা, সর্বাধিক সুবিধা লাভ ইত্যাদি বিবেচনা করে সেতুর অবস্থান এবং দৈর্ঘ্য নির্ধারিত হয় । আইডবি¬উএম কর্তৃক প্রনীত প্রতিবেদনের পর সেটি ফাইলবন্দীই থেকে যায় ।
বর্তমান সরকারের হস্তক্ষেপে অবশেষে গড়াই সেতুটি বাস্তবায়ন হতে চলেছে।
কুষ্টিয়া বড় বাজার গট্টিয়া সংযোগ সেতু নির্মাণ হলে এলাকার হাজার হাজার মানুষের দুঃখ কষ্ট লাঘব হবে। পাশাপাশি অত্র অঞ্চলে গড়ে উঠবে ছোট-বড় শিল্প-কারখানা । জনসাধারণের যাতায়াতের দূর্ভোগ দূর করতে সেতুটি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবী এলাকাবাসীর।
