সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় তেলসমৃদ্ধ শহর দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় দুজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। গত বুধবার রাতে চালানো এ হামলায় নিহত ব্যক্তিদের একজন সৌদি নাগরিক এবং অন্যজন ভারতীয়। গতকাল বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। বিমানবন্দরের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে। তবে বিমানবন্দরের কার্যক্রম আবার স্বাভাবিক হয়েছে।
ইয়েমেনের ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিরা জানিয়েছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, ইয়ানবুতে সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকোর স্থাপনা এবং দাম্মাম ও আভা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে তারা। সৌদি কর্তৃপক্ষ
দাম্মাম বিমানবন্দরে প্রাণহানির কথা নিশ্চিত করলেও রিয়াদ ও ইয়ানবুতে হামলার বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো নিশ্চিত তথ্য দেয়নি।
এদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, রিয়াদ ও পবিত্র নগরী মদিনা অঞ্চলে চারটি ড্রোন শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর সৌদি আরবের তেল অবকাঠামো ও বেসামরিক স্থাপনায় হুথিদের হামলা বেড়েছে। চলতি মাসে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে হামলায় মোট ২২ জন নিহত হয়েছেন বলে সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে বার্তা সংস্থা এএফপির হিসাবে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনী পারস্য উপসাগরে তেল স্থানান্তরের কাজে যুক্ত চারটি জাহাজে হামলা চালিয়ে সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার দাবি করেছে। বাহিনীটির ভাষ্য, বুধবার জাহাজগুলোকে শনাক্ত করার পর একযোগে হামলা চালানো হয়। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির পশ্চিমে আরও তিনটি জাহাজ মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আগুন ধরে যায়। এসব ঘটনার বিষয়ে জাহাজগুলোর পরিচয়, ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের বিস্তারিত স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ইরান হুশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে সহায়তা অব্যাহত রাখলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোও সংঘাতের আওতায় আসবে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১২ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দামও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছায়।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বলেছে, মাইন পাতা জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচলে যুক্তরাষ্ট্রের উৎসাহ ও সহায়তা সামুদ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। এ ধরনের তৎপরতা অব্যাহত থাকলে সংঘাতের পরিধি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলো পর্যন্ত বিস্তৃত হবে বলে সতর্ক করেছে বাহিনীটি।
আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুতর সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে। এর আগে বাহিনীটি পারস্য উপসাগরে তেল স্থানান্তরের কাজে জড়িত চারটি জাহাজে হামলা এবং হরমুজ প্রণালির পশ্চিমে তিনটি জাহাজ মাইনের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানায়।
বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের উল্লেখযোগ্য অংশ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এ পথে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব পড়ে। সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও জাহাজে হুথিদের হামলা এবং হরমুজে জাহাজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে তেলের দাম বেড়েছে।
ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজাই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, দীর্ঘস্থায়ী অবরোধে ইরানের পরিবারগুলোকে মূল্য দিতে হবে, বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং অর্থনীতির কিছু খাত সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। তবে তার ভাষায়, ‘অর্থনৈতিক দুর্ভোগ আর কৌশলগতভাবে ভেঙে পড়া এক বিষয় নয়।’
রেজাই বলেন, ইরানের জনগণের জীবনযাত্রা কঠিন করে তুললেই দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত দাবি মেনে নেবে— ওয়াশিংটন বারবার এমন ভুল হিসাব করেছে। ইরানের লক্ষ্য সংঘাত দীর্ঘায়িত করা নয়; বরং এমন শর্তে যুদ্ধের অবসান ঘটানো, যাতে ভবিষ্যতে আবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা কমে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর প্রধান আহমদ ওয়াহিদিও বলেছেন, শত্রুপক্ষ শক্তি ছাড়া অন্য কোনো ভাষা বোঝে না। তার দাবি, ড্রোন ও চালকবিহীন আকাশযান তৈরিতে ইরান উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে এবং সমুদ্রেও দেশটির শক্তিশালী উপস্থিতি রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি দেশটির পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বুধবার ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিমের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চালানো সামরিক, অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদার, অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকার ও পার্লামেন্টের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সংঘাতের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় পার্লামেন্টের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা করেন দুই নেতা। দেশের বিভিন্ন স্থানে জনসমাবেশ ও জনসম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখা এবং সামাজিক সংহতি বজায় রাখার বিষয়ও আলোচনায় আসে। গালিবাফ সংঘাত শুরুর পর পার্লামেন্টের কার্যক্রম, নেওয়া পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পরিকল্পনা সম্পর্কে খামেনিকে অবহিত করেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করলে তেহরান ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়। এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি হলেও পরে আবার সংঘাত শুরু হয়। জুনের মাঝামাঝি দুপক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও আলোচনা দ্রুত ভেঙে পড়ে। এরপর ৮ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আবার হামলা চালায়। এর চার দিন পর ১২ জুলাই কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় বন্ধের ঘোষণা দেয় তেহরান।
ইরানের সঙ্গে আলোচনার খবর অস্বীকার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তিনি বলেছেন, পরিস্থিতির সমাধান ‘খুব শিগগিরই’ হবে, যদিও কীভাবে তা ঘটবে সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।
জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, সামরিক ও অর্থনৈতিক— উভয় দিক থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে ভালো অবস্থানে রয়েছে। তিনি চলমান যুদ্ধকে ইরানের সঙ্গে ‘একটি ছোট সংঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, নির্বাচনের পর পরিস্থিতি পরিষ্কার হবে। তবে তার দাবি, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনে দিয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের একটি প্রতিবেদন অস্বীকার করেছেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, চলতি মাসের শুরুর দিকে ইরানে হামলার ইসরায়েলি পরিকল্পনা থামিয়ে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। নেতানিয়াহু ইসরায়েলের চ্যানেল সেভেনকে বলেন, প্রতিবেদনটি সত্য নয়।
ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা টিকে থাকলে দেশটি আবার শক্তি সঞ্চয় করবে— এমন দাবি করে নেতানিয়াহু বলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানোই সংঘাতের অবসান নিশ্চিত করার একমাত্র উপায়।
লোহিত সাগরে জুকার দ্বীপের কাছে ১৪ জন ভারতীয় নাগরিককে বহনকারী একটি নৌযান সৌদি আরবের হামলার শিকার হয়েছে বলে দাবি করেছে হুথিরা। গোষ্ঠীটির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, নৌযানটিতে থাকা ভারতীয়দের উদ্ধারে তারা কাজ করছে। তবে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হুথিদের দাবি, নৌযানটিতে হামলা আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য হুমকি তৈরি করেছে। বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছাকাছি এ ঘটনা লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে গত জুলাইয়ে দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার পর হুথিরা সৌদি আরবের জাহাজ, ভূখণ্ড ও তেল স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা বাড়িয়েছে। গোষ্ঠীটি সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণার পর সেপ্টেম্বরে লোহিত সাগর উপকূলে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলো দখলে নিতে বড় ধরনের অভিযান চালায়।
এর জবাবে সৌদি বিমানবাহিনী ইয়েমেনের হুথিনিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে। ইরান-সমর্থিত হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারও নতুন করে সতর্কতা দিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় হুথিদের আয়োজিত জনসমাবেশে অংশ না নিতে বেসামরিক নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এসব সমাবেশে শিশু ও তরুণদের সামরিক কর্মকাণ্ডে নিয়োগের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে মন্ত্রণালয়। একই সঙ্গে হুথিদের আয়োজিত কিছু সমাবেশকে ‘বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে বলে সতর্ক করেছে তারা।
