কালবেলা · রাজনীতি
কিডনি রোগীদের জীবন বাঁচাতে বিশেষ পরীক্ষার দাবি, প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি
২৫/১০/২০২৬

নিজস্ব চিকিৎসার প্রয়োজনে ডোনারের পরীক্ষা করাতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাংবাদিক নূরে আলম সিদ্দিকী জুয়েলসহ অনেক স্বজনই। প্রয়োজনীয় কিটের সংকটে দেশে কোথাও করানো যাচ্ছে না DTPA Renogram with Split Function & GFR পরীক্ষা।
কিডনি রোগীদের চিকিৎসা ও প্রতিস্থাপনপ্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করতে পরীক্ষাটি দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে খোলা চিঠি দিয়েছেন তিনি।
রোববার (২৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুক প্রোফাইলে দেওয়া পোস্টে প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উদ্দেশে খোলা চিঠি প্রকাশ করেন নূরে আলম সিদ্দিকী জুয়েল। এর আগে শনিবার (২৪ অক্টোবর) এ-সংক্রান্ত একটি সংবাদ কালবেলা অনলাইন, নিউজ২৪, আরটিভিসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
কালবেলার পাঠকদের জন্য সাংবাদিক নূরে আলম সিদ্দিকী জুয়েলের খোলা চিঠিটি হুবহু তুলে ধরা হলো-
কিডনি রোগীদের জীবন বাঁচাতে DTPA Renogram পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ নিন
প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী,
বিনীত সালাম ও শ্রদ্ধা জানবেন। আমি নুরে আলম সিদ্দিকী জুয়েল। পেশায় সাংবাদিক। আমার বড় ভাইয়ের কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করাতে হবে। তার জন্য ডোনারের একটি প্রয়োজনীয় টেস্ট এই মুহূর্তে দেশের কোনো হাসপাতালে করাতে পারছি না কিটের সংকটে। এ-সংক্রান্ত একটি নিউজ শনিবার (২৪ অক্টোবর) কালবেলা অনলাইন, নিউজ২৪, আরটিভিসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি গণমাধ্যমেও এসেছে।
বাংলাদেশে কিডনি রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এসব রোগীর চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে রোগী ও তাদের পরিবারকে। এর মধ্যে নতুন করে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে DTPA Renogram with Split Function & GFR পরীক্ষাটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা এবং কবে নাগাদ আবার চালু হবে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা।
এই পরীক্ষাটি কিডনির কার্যক্ষমতা, দুই কিডনির পৃথকভাবে কাজ করার সক্ষমতা এবং গ্লোমেরুলার ফিল্ট্রেশন রেট (GFR) মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে কিডনি রোগের জটিলতা নির্ণয়, চিকিৎসার সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কিডনি দাতা মূল্যায়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে চিকিৎসকরা এ পরীক্ষার প্রয়োজন অনুভব করতে পারেন।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, প্রয়োজনীয় এই পরীক্ষাটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে করানো যাচ্ছে না বলে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রয়োজনীয় কিট বা সংশ্লিষ্ট উপকরণের সংকট যদি এর কারণ হয়ে থাকে, তবে সেই সংকটের স্থায়ী সমাধান কোথায়? আর যদি অন্য কোনো কারণে পরীক্ষা বন্ধ থাকে, তাহলে সেটি সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
একজন কিডনি রোগীর কাছে প্রতিটি দিন অত্যন্ত মূল্যবান। অনেক পরিবার কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেউ নিজের প্রিয়জনকে বাঁচাতে কিডনি দাতা খুঁজছেন, কেউ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বন্ধ থাকায় তাদের চিকিৎসাপ্রক্রিয়া বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
একটি পরীক্ষার জন্য রোগীকে যদি অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে শুধু সময়ই নষ্ট হয় না- বাড়ে মানসিক চাপ, চিকিৎসার অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক দুর্ভোগও। দেশের সব রোগীর পক্ষে বিদেশে গিয়ে পরীক্ষা করানো কিংবা ব্যয়বহুল বেসরকারি ব্যবস্থার বিকল্প খুঁজে নেওয়া সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রের স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা খুব বেশি কিছু নয়। তারা চান, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা যেন দেশের মধ্যেই, যথাসময়ে এবং সাধ্যের মধ্যে করাতে পারেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী,
আপনার কাছে আমাদের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি রয়েছে-
১. DTPA Renogram with Split Function & GFR পরীক্ষা কেন বন্ধ রয়েছে, তার সঠিক কারণ জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
২. প্রয়োজনীয় রেডিওফার্মাসিউটিক্যাল কিট, আইসোটোপ বা সংশ্লিষ্ট উপকরণের সংকট থাকলে তা জরুরি ভিত্তিতে সংগ্রহ ও সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. পরীক্ষাটি পুনরায় চালু করার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করতে হবে, যাতে রোগীরা অন্তত জানতে পারেন তাদের আর কত দিন অপেক্ষা করতে হবে।
৪. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (BMU), জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট (NIKDU) এবং অন্যান্য সরকারি হাসপাতালে পরীক্ষাটি চালুর সম্ভাবনা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. শুধু একটি বা দুটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরীক্ষাটি চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, যন্ত্রপাতি ও সরবরাহ-ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৬. পরীক্ষা চালু না হওয়া পর্যন্ত রোগীরা কোথায় পরীক্ষাটি করাতে পারবেন, বিকল্প ব্যবস্থা কোথায় রয়েছে এবং সম্ভাব্য খরচ কত- এসব তথ্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিয়মিত জানাতে হবে।
৭. ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট এড়াতে প্রয়োজনীয় কিট ও উপকরণের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী, আমরা বুঝি যে স্বাস্থ্য খাতে নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কিন্তু রোগীর চিকিৎসার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা এবং তা কবে চালু হবে, সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
আমরা কাউকে দোষারোপ করতে চাই না। আমরা চাই সমস্যার সমাধান। আমরা চাই, কিডনি রোগীরা যেন একটি পরীক্ষার জন্য চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ ধাপে আটকে না থাকেন। আমরা চাই, অসহায় পরিবারগুলো যেন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাতে বাধ্য না হয়।
কিডনি রোগীরাও এই দেশের নাগরিক। তাদের চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মানবিক ও জনস্বাস্থ্যগত দায়িত্ব।
তাই আপনাদের কাছে আমাদের আকুল আবেদন- বিষয়টিকে জরুরি জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে DTPA Renogram with Split Function & GFR পরীক্ষাটি দ্রুত পুনরায় চালুর কার্যকর উদ্যোগ নিন। একই সঙ্গে পরীক্ষা বন্ধ থাকার কারণ, বর্তমান পরিস্থিতি এবং পুনরায় চালুর সম্ভাব্য সময়সীমা জনগণকে স্পষ্টভাবে জানান।
আপনাদের আন্তরিক উদ্যোগে বহু কিডনি রোগী ও তাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা দূর হবে- এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
আমরা আশ্বাস নয়, কার্যকর উদ্যোগ দেখতে চাই। আমরা অনিশ্চয়তা নয়, সমাধান চাই। আমরা চাই, কিডনি রোগীদের চিকিৎসার পথ সহজ হোক।
বিনীত,
নূরে আলম সিদ্দিকী
বাংলাদেশের কিডনি রোগী, তাদের স্বজন ও সচেতন নাগরিকদের পক্ষ থেকে।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗