‘হয় আমাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে, না হয় তাদের চেয়ে বড় সন্ত্রাসী হতে হবে।’ ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর নেত্রকোনার তৎকালীন পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলামের সামনে দাঁড়িয়ে এভাবেই নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। অভিযোগ করেছিলেন, সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা তাকে হত্যার জন্য ওত পেতে রয়েছে। সেই আশঙ্কা জানানোর প্রায় ১১ মাস পর গত ১৫ অক্টোবর দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হয়েছেন তিনি। মৃত্যুর আগে নিরাপত্তা চেয়ে দেওয়া তার বক্তব্যের ভিডিও নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় প্রশ্ন উঠেছে, প্রাণনাশের আশঙ্কার কথা জানানোর পরও তার নিরাপত্তায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং তার অভিযোগের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নিয়েছিল পুলিশ।
২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর জেলা পুলিশ সুপারের যোগদান উপলক্ষে সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচিতি ও মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। ওই সভায় উপস্থিত হয়ে নিজের নিরাপত্তাহীনতার কথা তুলে ধরেন আলিফ। তিনি জানান, সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় সশস্ত্র অপরাধী গোষ্ঠীর হুমকির মুখে রয়েছেন তিনি।
সভা চলাকালে তার কাছে বার্তা আসছিল, সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা রাস্তায় অপেক্ষা করছে। তাদের কাছে অস্ত্র ও গুলি রয়েছে এবং সভা শেষে বের হলে তাকে গুলি করা হতে পারে। এ কারণে সেদিন সভা শেষে বাড়িতে ফিরবেন না বলেও জানান তিনি। তার আশঙ্কা ছিল, বাড়ির আশপাশে অস্ত্রধারীরা তাকে হত্যার জন্য ওত পেতে রয়েছে।
সভায় আলিফ বলেছিলেন, ‘আমি অর্গানাইজড ক্রাইম নিয়ে কাজ করি। এই জেলায় দুর্ধর্ষ ও সশস্ত্র যেসব গ্রুপ আছে, তাদের নিউজ আমি করে থাকি। মাদক থেকে শুরু করে সব। এই জেলায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হলো দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা। এখানে চোরাচালানের সঙ্গে সংঘবদ্ধ আটটি গ্রুপ আছে। তারা অস্ত্র বহন করে। ককটেল, বিস্ফোরক, মাদকসহ সবকিছুই করে তারা।’
এসব অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে তৎকালীন পুলিশ সুপারের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এই আসামিদের যদি ধরা না হয়, তবে সবাইকে সাক্ষী রেখে বলছি, হয় আমাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে, না হয় তাদের চেয়ে বড় সন্ত্রাসী হতে হবে। এই সিদ্ধান্তটা এখন আপনাদের নিতে হবে।’
নিজের পাশাপাশি পরিবারের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন আলিফ। সন্তানের জন্মের কারণে শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করার কথা জানিয়ে সেখানে হামলা ও অগ্নিসংযোগের আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। আগের দিনও সেখানে আগুন দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে দাবি করেছিলেন এই সাংবাদিক।
গত ১৫ অক্টোবর নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার উতরাইল বাজার এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক আলিফ ফকির। শুক্রবার বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে কলমাকান্দায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
আলিফ বেসরকারি আইপিটিভি চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন তিনি। ওই পেজে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে লেখালেখি করতেন আলিফ।
তার চার বছর বয়সী একটি মেয়ে ও দেড় বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে।
এ ঘটনায় শুক্রবার রাতে আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় অজ্ঞাতনামা আটজনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন। তবে শনিবার এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। গ্রেপ্তার করা যায়নি কাউকে।
এ বিষয়ে জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) হাফিজুল ইসলাম বলেন, আলিফের করা ডিজি এবং বর্তমানে তার হত্যাকাণ্ডসহ সব বিষয় গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশ, এসআরবিসহ একাধিক সংস্থা কাজ করছে।
