ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিস্তার নগর পরিবহনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা যেমন এই যানগুলোর ওপর নির্ভরশীল, তেমনি স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতেও এগুলোর ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু এসব যান চার্জ দেওয়ার জন্য গড়ে ওঠা অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা এখন বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, সরকারি রাজস্ব ও জননিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অনুমোদনহীন চার্জিং পয়েন্ট, আবাসিক সংযোগে বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং অনুমোদিত লোডের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির দুর্বলতাকেই সামনে আনে।
শুধু ঢাকাতেই অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা ৪৮ হাজার ১৩৬টি এবং শনাক্ত করা গ্যারেজের সংখ্যা ৯৯২টি। বিপরীতে, সারা দেশে বৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। এই ব্যবধান চার্জিং ব্যবস্থাকে নিয়মের আওতায় আনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। সরকারি হিসাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা অন্তত ৮০ লাখ এবং এসব যান চার্জ দিতে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে। অবৈধভাবে চার্জ দেওয়ার কারণে বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতির যে হিসাব উঠে এসেছে, তা যথাযথ যাচাইয়ের পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণও জরুরি করে তুলেছে।
এ জন্য প্রথমেই প্রয়োজন দেশব্যাপী চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি। বিদ্যুৎ বিভাগ, ডিপিডিসি, ডেসকো, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, সিটি করপোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে একটি সমন্বিত তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হবে। কোথায় কতটি রিকশা চার্জ হচ্ছে, কোন শ্রেণির সংযোগ ব্যবহার করা হচ্ছে, অনুমোদিত লোড কত এবং প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহার কতÑ এসব তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। পাশাপাশি বৈধ চার্জিং স্টেশন স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ এবং নিবন্ধনপ্রক্রিয়া সহজ করতে হবে, যাতে গ্যারেজ মালিকেরা নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনায় উৎসাহিত হন।
পাশাপাশি, বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোকে নিয়মিত পরিদর্শন ও মিটার যাচাইয়ের ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। শুধু অভিযান চালিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বিচ্ছিন্ন সংযোগ পুনরায় স্থাপন করা হচ্ছে কি না, জরিমানার পর অনিয়ম অব্যাহত থাকছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তদারকিতে কোনো গাফিলতি রয়েছে কি না, তা-ও পরীক্ষা করতে হবে।
একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চালক ও মালিকদের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। হঠাৎ করে ব্যাপক উচ্ছেদ বা নির্বিচার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পরিবর্তে বৈধ সংযোগ গ্রহণের সময়সীমা, সহজ নিবন্ধন এবং সাশ্রয়ী চার্জিং সুবিধা নিশ্চিত করা উচিত। এতে একদিকে বিদ্যুতের অপচয় ও রাজস্ব ক্ষতি কমবে, অন্যদিকে পরিবহন খাতের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকাও অযথা বিঘিœত হবে না।
সরকারকে বুঝতে হবে, অবৈধ চার্জিং নিয়ন্ত্রণ কেবল বিদ্যুৎ চুরি বন্ধের বিষয় নয়, এটি নগর ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব সুরক্ষা, অগ্নিনিরাপত্তা ও আইনের শাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ, নিয়মিত তদারকি এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি অপরিহার্য। অভিযান হবে অনিয়ম শনাক্ত ও বন্ধ করার উপায়, স্থায়ী সমাধান নয়।
আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, অবৈধ চার্জিং বন্ধে নিবন্ধন, মিটারভিত্তিক হিসাব, নিরাপদ অবকাঠামো ও নিয়মিত নজরদারির সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলবে সরকার। সরকারি রাজস্বের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জননিরাপত্তা ও মানুষের জীবিকার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করাই হোক সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের লক্ষ্য।