পাঁচ মাস পর আবার নন্দীগ্রামে বিজয়ী বিজেপি। উপনির্বাচনে রেকর্ড ভোটে জয়ী হয়েছেন প্রার্থী হাসিরানি রথ। কিন্তু সেই বিজয়ের পথ ধরে যেন আত্মতুষ্টি, অহংকার না ঢুকে পড়ে নেতাদের মনে। মানুষকে নিয়েই কাজ। মানুষের জন্যই তাঁরা নেতা। সে কথা যেন ভুলে না যান। নন্দীগ্রাম পুনর্বিজয়ের একদিন পর দলের নেতা-নেত্রীদের পরামর্শ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ওই প্রসঙ্গে তিনি টানলেন নন্দীগ্রামের আলোচিত ‘জাহাজবাড়ি’র উদাহরণ।
পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম সদর থেকে গোকুলনগরের দিকে খানিক এগোলেই দেখা যাবে মাথায় প্রকাণ্ড জলের ট্যাঙ্ক-সহ জাহাজের মতো দেখতে একটি বাড়ি। ওই বাড়ি এবং বাড়িমালিক শেখ সুফিয়ান বিরোধীদের নিশানায় দীর্ঘদিন ধরেই। কী ভাবে বিপুল টাকা ব্যয় করে এই বাড়ি তৈরি হল, তা নিয়ে প্রায়শই সুফিয়ানকে খোঁচা দেন শুভেন্দু। একদা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনী এজেন্ট সুফিয়ানের নাম না করে রবিবার তাঁর ‘জাহাজবাড়ি’র কথা বলেন শুভেন্দু। তৃণমূলকে খোঁচা দেওয়ার পাশাপাশি বিজেপি নেতাদের সতর্ক করলেন তিনি।
রবিবার সন্ধ্যায় নন্দীগ্রামে ‘শহিদ এবং আহত’ পরিবারের প্রতি সম্মাননাজ্ঞাপন কর্মসূচিতে রেয়াপাড়ায় ছিলেন শুভেন্দু। সঙ্গে ছিলেন নন্দীগ্রামের নবনির্বাচিত বিধায়ক হাসিরানি, শুভেন্দুর সহোদর তথা সাংসদ সৌমেন্দু অধিকারী প্রমুখ। তাঁর ছেড়ে দেওয়া নন্দীগ্রাম আসনে উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থীকে বিজয়ী করার জন্য ভোটারদের ধন্যবাদ জানান মুখ্যমন্ত্রী। তার পর জানান, তিনি বিধায়ক ভবানীপুরের। কিন্তু আজীবন নন্দীগ্রামের ভোটার থাকবেন। প্রতিশ্রুতিমাফিক নন্দীগ্রামে দ্রুত রেলপথ নির্মাণ, সেতু তৈরি-সহ নানা উন্নয়মূলক কাজ হবে বলে ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তার পরে চলে যান নেতাদের নিয়মানুবর্তিতা-শৃঙ্খলা প্রসঙ্গে। শুভেন্দুর কথায়, ‘‘আমি অঙ্গীকার করেছি যে, ভবানীপুরের বিধায়ক থাকব। কিন্তু নন্দীগ্রামের ভোটার থাকব। সেই প্রতিশ্রুতিতে অনড়। আপনারাও সকলে ঐক্যবদ্ধ থাকবেন। পঞ্চায়েত পরিচালনার ক্ষেত্রেও।’’ মুখ্যমন্ত্রীর সংযোজন, ‘‘ঔদ্ধত্য চলবে না, আচরণ-চালচলন সংযত রাখবেন। পরে কেউ যাতে না বলেন যে আপনারাও ‘জাহাজবাড়ি’ তৈরি করেছেন।’’
শুভেন্দুর একদা রাজনৈতিক সহকর্মী সুফিয়ানের নেতা হিসাবে উত্তরণ জমি আন্দোলনের সময়। ২০০৭ সালে নন্দীগ্রাম আন্দোলনে প্রথম সারিতে ছিলেন সুফিয়ানও। স্থানীয়দের অনেকে এবং বিরোধীরা বলে থাকেন, তখন ছোট্ট একটি পাকা বাড়ি ছিল তাঁর। নন্দীগ্রাম এলে সেই বাড়িতেই খানিক জিরিয়ে নিতেন মমতাও। পরিস্থিতি বদলায় ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের পর। সুফিয়ান বিশালাকায় ‘জাহাজবাড়ি’ তৈরি করেন। একবার নন্দীগ্রাম গিয়ে প্রকাণ্ড সেই বাড়ি দেখে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। তার পর থেকে ওই বাড়িতে আর তিনি যাননি বলেও খবর।
বেশ কিছু দিন আগে ব্যাঙ্ক থেকে বিপুল টাকা ঋণ নিয়ে তা না মেটানোয় ‘জাহাজবাড়ি’র মালিক, নন্দীগ্রামের তৃণমূল নেতা সুফিয়ানের নামে আইনি নোটিস দেন ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ। নানা সময়ে শুভেন্দু তাঁকে নিশানা করেছেন ওই বাড়ি নিয়ে। রবিবার ফের ওই প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রীর বার্তা, ‘‘দল-সংগঠন এবং সর্বোপরি মানুষকে নিয়ে চলবেন। ঔদ্ধত্য, অহংকার, চালচলন এবং নির্বাচিত পঞ্চায়েত নেতারা আচার-ব্যবহার ঠিক রাখবেন।’’ পরামর্শ দেওয়ার সুরে তিনি আরও বলেন, ‘‘একটা কথা মাথায় রেখে সকলে চলবেন— প্রথমে জনগণকে দেখতে হবে। এবং তার পর কর্মীদের স্বার্থ দেখবেন। আপনারা প্রত্যেকটি পরিষেবা পাবেন। উৎসবে-অনুষ্ঠানে, আয়োজনে-প্রয়োজনে নিশ্চিত ভাবে আমাকে পাবেন।’’
শুক্রবার, ষষ্ঠীর দিন সকাল থেকে নন্দীগ্রামে থাকবেন বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। দুপুর পর্যন্ত সেখানকার একাধিক পুজোর উদ্বোধন করবেন তিনি। রবিবার নন্দীগ্রাম ছাড়ার সময় জানিয়ে দেন, এ বার থেকে তাঁর ছেড়ে দেওয়া বিধানসভার সেবিকা হাসিরানি। তাঁর কার্যালয় থেকে আগে যে পরিষেবা প্রদান করা হত, তা অক্ষুণ্ণ থাকবে। দ্রুত রেলপথ এবং সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হবে। নন্দীগ্রাম সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে সমস্ত রকম চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা হবে।
