একই আঙিনায় পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দির। একদিকে মসজিদে আজান ও নামাজ, অন্যদিকে মন্দিরে দুর্গাপূজার নানা আয়োজন। আজানের ধ্বনি শোনা গেলে থেমে যায় মন্দিরের ঢাক-ঢোল ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রের শব্দ। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। এভাবেই পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সৌহার্দ্যের বন্ধনে দীর্ঘ ৫৬ বছর ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার চৌধুরী বাড়ি।
নাগরপুর উপজেলা সদরের চৌধুরী বাড়ির একই আঙিনায় অবস্থিত চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ও মন্দির। দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি এই দুই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে আসছেন মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান আলাদা হলেও পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতায় গড়ে উঠেছে তাদের সম্প্রীতির বন্ধন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নাগরপুর সদরের চৌধুরী বাড়িতে শ্রী পরেশ চন্দ্র ও শৈলেশ চন্দ্র প্রথমে দেবী দুর্গার মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এর কয়েক বছর পর ১৯৬২ সালে একই আঙিনায় প্রতিষ্ঠিত হয় চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। সেই থেকে পাশাপাশি দুই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে চলছে ধর্মীয় কার্যক্রম।
সরেজমিনে দেখা যায়, সীমানাপ্রাচীরঘেরা চৌধুরী বাড়ির আঙিনার পশ্চিম পাশে মন্দির এবং পূর্ব পাশে মসজিদ। মসজিদের দক্ষিণ পাশে রয়েছে অজুর ব্যবস্থা। দুর্গাপূজার সময় মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তদের উপস্থিতি, আলোকসজ্জা ও নানা আয়োজনে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তবে মসজিদে আজান ও নামাজের সময় হলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্ধ রাখা হয় ঢাক-ঢোলসহ সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র। নামাজ শেষ হলে আবারও শুরু হয় পূজার আয়োজন।
শ্রী শ্রী গণেশ চন্দ্র রায় বলেন, মসজিদে আজান হলে মুসল্লিরা নামাজ আদায় করতে আসেন। এ সময় দেবী দুর্গার পূজার সব আয়োজন ও বাদ্যযন্ত্রের শব্দ বন্ধ রাখা হয়। নামাজ শেষ হলে আবারও শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। দীর্ঘদিন ধরে এভাবেই দুই সম্প্রদায়ের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রেখে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। একে অপরের ধর্মীয় কাজে কেউ বাধা সৃষ্টি করেন না।
স্থানীয় বাসিন্দারাও জানান, মসজিদে আজানের সময় হলে মন্দিরের বাদ্যযন্ত্র বন্ধ রাখার বিষয়টি এখানে দীর্ঘদিনের চর্চা। এ জন্য কাউকে আলাদা করে নির্দেশ দিতে হয় না। দুই সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক বোঝাপড়া ও শ্রদ্ধাবোধ থেকেই এমন পরিবেশ তৈরি হয়েছে। দুর্গাপূজার আনন্দকে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও স্বাগত জানান।
চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা হুমায়ুন কবির বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দির অবস্থিত। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মন্দিরকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করেন। একইভাবে মসজিদকে কেন্দ্র করে মুসলমানরাও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এ নিয়ে কখনো কাউকে কিছু বলতে হয়নি। দুই সম্প্রদায়ের মানুষ মিলেমিশে নিজ নিজ ধর্মীয় উৎসব পালন করে আসছেন।
পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক ঝুনট কুমার সাহা বলেন, হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসবগুলো নির্বিঘ্নে পালনে স্থানীয় মুসলমানেরা সহযোগিতা করেন। পারস্পরিক এই সহযোগিতা ও সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ুক। ধর্মকে কেন্দ্র করে কোথাও যেন সাম্প্রদায়িক হানাহানি সৃষ্টি না হয়, সেটিই তাদের প্রত্যাশা।
নাগরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিখন বণিক বলেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। চৌধুরী বাড়ির একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দির এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এখানে নামাজের সময় মুসল্লিরা নামাজ আদায় করেন, আর পূজার সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পূজা উদযাপন করেন। বিগত বছরগুলোর মতো এ বছরও সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে।
টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার জানান, জেলায় এবার ১ হাজার ৩৫৭টি মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। এসব মণ্ডপে সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে পূজা উদযাপনে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে গোয়েন্দা তৎপরতা।
জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় এবার ১ হাজার ৩৫৭টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে মির্জাপুর উপজেলায় সর্বোচ্চ ২৭০টি মণ্ডপ রয়েছে। অন্যদিকে দেলদুয়ার উপজেলায় রয়েছে সর্বনিম্ন ৩৪টি মণ্ডপ।
টাঙ্গাইল-৬ (নাগরপুর-দেলদুয়ার) আসনের সংসদ সদস্য মো. রবিউল লাভলু বলেন, এ দেশে সংখ্যালঘু বলে কিছু নেই, আমরা সবাই এ দেশের মানুষ। প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম পালন করবেন। একই আঙিনায় পূজা উদযাপন ও নামাজ আদায় হলেও কোনো সমস্যা হয় না। সবাই মিলেমিশে সম্প্রীতি ও ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাস করছেন। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য প্রশাসনও তৎপর রয়েছে।
