বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বলেছেন, নিজেদের দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সাংগঠনিক দুর্বলতা ও ব্যর্থতা আড়াল করতে বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলনের নামে নাটক করছে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের কল্যাণে গঠনমূলক ভূমিকা রাখার পরিবর্তে বিরোধীরা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন রিজভী। দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের পরিকল্পিত নৈরাজ্য ও চক্রান্তের প্রতিবাদে এ সমাবেশের আয়োজন করে জাতীয়তাবাদী টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (জেটেব)।
সমাবেশে রিজভী বলেন, দেশের মানুষ যখন নানা সংকট ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের পাশে দাঁড়ানো এবং দেশের স্বার্থে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা। কিন্তু বিরোধী দলগুলো সেই ভূমিকা পালন না করে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বিএনপির এই নেতা বলেন, বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে দেশের উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে না। বরং তারা নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে রাজপথে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের প্রকৃত সমস্যার সমাধান হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
বিরোধীদের ‘নাই নাই’ জিকির নিয়ে সমালোচনা
বিরোধী দলগুলোর সমালোচনা করে রুহুল কবীর রিজভী বলেন, পত্রিকা খুললেই বিরোধী দলগুলোর কেবল ‘নাই নাই’ জিকির দেখা যায়। দেশের উন্নয়ন কিংবা জনগণের কল্যাণে তাদের কোনো নজর নেই। নিজেদের দলীয় দ্বন্দ্ব ও ব্যর্থতা আড়াল করতেই তারা রাজপথে নামার নানা অজুহাত খুঁজছে এবং বিভিন্ন কর্মসূচির নামে নাটক সাজাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা, জনদুর্ভোগ কমানো এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখা। কিন্তু বিরোধী দলগুলো যদি কেবল রাজনৈতিক বিরোধিতা ও কর্মসূচির মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখে, তাহলে সাধারণ মানুষ প্রত্যাশিত সুফল থেকে বঞ্চিত হবে।
রিজভীর মতে, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে দায়িত্বশীল আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে দেশের সংকট মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া দরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য ও কর্মসূচিতে জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।
অন্যায় ও অপশাসনের পরিণতি নিয়ে বক্তব্য
স্বৈরাচারী শাসনের পরিণতি প্রসঙ্গে বক্তব্য দিতে গিয়ে রিজভী বলেন, অন্যায় ও অপশাসন চালিয়ে কোনো শাসকের পক্ষেই শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, জনগণের অধিকার উপেক্ষা করে এবং অন্যায়ের মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
তিনি বলেন, জনগণ যখন নিজেদের অধিকার আদায়ে রাজপথে জেগে ওঠে, তখন অন্যায়কারী শাসকদের পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও এর উদাহরণ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রিজভী আরও বলেন, এ দেশেও জোর করে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করা স্বৈরাচারী শক্তিকে শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যেতে হয়েছে। জনগণের শক্তিকে অবমূল্যায়ন করার সুযোগ নেই। দেশের মানুষের অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যেকোনো সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলেও বক্তব্য দেন তিনি।
দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেতাকর্মীদের নির্দেশ
শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও বক্তব্য দেন বিএনপির এই নেতা। তিনি বলেন, দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে। এ উৎসব যেন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবং ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য বজায় রেখে উদযাপিত হতে পারে, সে জন্য বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সজাগ ও সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রিজভী বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যেন নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপন করতে পারেন, সে জন্য সারা দেশে দলের নেতাকর্মীরা সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। উৎসবকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হলে তা মোকাবিলায় সতর্ক থাকার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, ধর্মীয় উৎসব সবার জন্য আনন্দ ও সম্প্রীতির উপলক্ষ। তাই উৎসবের সময় পারস্পরিক সহনশীলতা, সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখা জরুরি। সব ধর্মের মানুষের ধর্মীয় অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ
দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করে রুহুল কবীর রিজভী বলেন, কোনো অন্যায়কারী পার পাবে না। এ দেশে আর বেঈমানি ও হত্যার রাজত্ব চলতে দেওয়া হবে না। সব অপরাধের বিচার আইন ও আদালতের মাধ্যমে নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
রিজভী বলেন, অপরাধের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবেশ থাকতে হবে। বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, একটি দেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে আইনের শাসনের বিকল্প নেই। অন্যায়ের প্রতিকার এবং অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা গেলে মানুষের মধ্যে ন্যায়বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা আরও শক্তিশালী হবে।
সমাবেশে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা
জাতীয়তাবাদী টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (জেটেব) সভাপতি প্রকৌশলী মো. ফখরুল আলমের সভাপতিত্বে বিক্ষোভ সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রিয়াজ উদ্দিন মিশু, বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব জাহানারা সিদ্দীকা, জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক জোটের নেতা রকিবুল ইসলাম এবং ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব কাজী সাখাওয়াত।
এ ছাড়া স্বেচ্ছাসেবক দলের সহসভাপতি ডা. জাহিদুর রহমান, ছাত্রদলের সহসভাপতি ডা. তাওহিদুর রহমান আউয়ালসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশে বক্তারা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, জনগণের অধিকার, আইনের শাসন এবং ধর্মীয় উৎসবের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। রুহুল কবীর রিজভীর বক্তব্যে বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনার পাশাপাশি দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধের বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পায়।
The post ব্যর্থতা আড়াল করতে রাজপথে নাটক করছে বিরোধী দল: রিজভী appeared first on SATV.
