চট্টগ্রাম নগরের হালিশহরে অস্ত্রের মুখে দৈনিক পূর্বদেশের স্টাফ রিপোর্টার মো. আবুল হোসাইনকে জিম্মি করে নগদ টাকা ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মোট ৭০ হাজার ৩০০ টাকা লুটের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় তাঁকে মারধর করে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরে সামাজিকভাবে হেয় করা ও ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে জোর করে ভিডিও ধারণের অভিযোগও করেছেন ওই সাংবাদিক। এ ঘটনায় করা মামলায় দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে লুট হওয়া টাকা এখনো উদ্ধার হয়নি।

গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিকেলে নগরের হালিশহর থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের রমনা আবাসিক এলাকার ২ নম্বর সড়কে এ ঘটনা ঘটে। পরদিন বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) হালিশহর থানায় মামলা করেন সাংবাদিক আবুল হোসাইন। মামলার পর প্রযুক্তির সহায়তায় অভিযান চালিয়ে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানায়, মামলার এজাহারভুক্ত আট নম্বর আসামি মো. আরিফ হোসেনকে (২৬) বৌ-বাজার এলাকা থেকে এবং ১৭ বছর বয়সী কিশোর সাকিবকে বড়পুল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১২টার দিকে আরিফকে এবং রাত আনুমানিক ১টা ১৫ মিনিটে সাকিবকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
যেভাবে টাকা নেওয়া হয়
মামলার এজাহার অনুযায়ী, ১৪ অক্টোবর বিকেলে সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে রমনা আবাসিক এলাকার ২ নম্বর সড়কে গেলে ৮ থেকে ১০ জনের একটি দল সাংবাদিক আবুল হোসাইনকে ঘিরে ধরে। একপর্যায়ে তিনি সেখানে অবৈধ কাজে উপস্থিত হয়েছেন বলে মিথ্যা অভিযোগ তুলে তাঁকে মারধর করা হয়। পরে পিস্তল ও ছুরির ভয় দেখিয়ে পাশের একটি নির্জন সড়কে নিয়ে আটকে রাখা হয়।
এ সময় তাঁর পকেটে থাকা ১৫ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং বিকাশ অ্যাকাউন্টের পিন নম্বর আদায় করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়, ১৪ অক্টোবর বিকেল ৫টা ৪১ মিনিটে সাংবাদিকের বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে ০১৩৫২০২৬৭১১ নম্বরে ২৫ হাজার ৫০০ টাকা পাঠানো হয়। একই নম্বরে বিকেল ৫টা ৪৬ মিনিটে আরও ২০ হাজার টাকা পাঠানো হয়। সন্ধ্যা ৬টায় ০১৯৭৭৭২৮৪৬০ নম্বরে পাঁচ হাজার টাকা এবং সন্ধ্যা ৬টা ৩ মিনিটে ০১৮৫৯৯৭৬৮৯১ নম্বরে চার হাজার ৮০০ টাকা ক্যাশ আউট করা হয়। সব মিলিয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৫৫ হাজার ৩০০ টাকা নেওয়া হয়।
ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইলের চেষ্টা
অভিযোগ অনুযায়ী, টাকা নেওয়ার পরও সাংবাদিককে ছেড়ে দেওয়া হয়নি। সামাজিকভাবে হেয় করা ও ব্ল্যাকমেইলের উদ্দেশ্যে তাঁকে বিভিন্ন মিথ্যা ও বানোয়াট বক্তব্য দিতে বাধ্য করা হয়। পরে সেসব বক্তব্য মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করা হয়।
ঘটনাটি কাউকে জানালে কিংবা আইনের আশ্রয় নিলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পরে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন আবুল হোসাইন।
সাংবাদিক আবুল হোসাইন বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁকে পরিকল্পিতভাবে জিম্মি করা হয়েছে। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে নগদ টাকা ও বিকাশ থেকে অর্থ নেওয়ার পাশাপাশি সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে জোর করে ভিডিও ধারণ করা হয়েছে। মুক্তি পাওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় অভিযুক্তদের পরিচয় সম্পর্কে তথ্য ও সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে থানায় মামলা করেছেন তিনি। পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করলেও লুট হওয়া টাকা এখনো উদ্ধার হয়নি।
এজাহারে আটজনের নাম
মামলার এজাহারে আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন সাইফুল (৩০), বাবুল ওরফে বাইট্টা বাবুল (২৪), মিজান (২৫), অনিকুল ইসলাম ওরফে অনিক (৩৬), সৈকত (২৪), মহিত (২৫), রবিন (২৫) ও আরিফ হোসেন (২৬)। তাঁদের সবার ঠিকানা চট্টগ্রাম নগরের হালিশহর থানার বিভিন্ন এলাকায়।
এজাহারে সাইফুলের বাবার নাম শফি ড্রাইভার উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর ঠিকানা মধ্যম রামপুরের ধোপাপাড়া, মালেক মেম্বারের বাড়ি। বাবুল ওরফে বাইট্টা বাবুলের ঠিকানা রামপুরের ফকির গলি। মিজানের বাবার নাম মোকলেছুর রহমান। তাঁর ঠিকানা মধ্য রামপুরের চিনা বাড়ি, ধোপাপাড়া।
অভিযুক্ত অনিকুল ইসলাম ওরফে অনিকের বাবার নাম নুর মোহাম্মদ, মা পারভীন আক্তার। তাঁর ঠিকানা মধ্যম রামপুরের ধোপাপাড়া, নসু ফকিরের বাড়ি। সৈকতের বাবার নাম আবু সাহেদ। তাঁর ঠিকানা রামপুরের ফকির গলির মফিজের বাড়ি। মহিতের বাবার নাম সাইফুল। তাঁর ঠিকানাও রামপুরের ফকির গলির মফিজের বাড়ি।
রবিনের বাবার নাম মুজিব। তাঁর ঠিকানা রামপুরের ফকির গলি। আরিফ হোসেনের বাবার নাম জাহাঙ্গীর আলম, মা আসমা আক্তার। তাঁর ঠিকানা ঈদগাঁ বেড়পুকুর পাড়ের মুন্সিপাড়া, মুন্সি বাড়ি।
প্রযুক্তির সহায়তায় অন্যদের শনাক্তের চেষ্টা
হালিশহর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন মন্ডল জানান, মামলা দায়েরের পরপরই প্রযুক্তির সহায়তায় অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিকাশ লেনদেনের তথ্য ও প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের মাধ্যমে অন্য অভিযুক্তদের শনাক্তের কাজ চলছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তারেও পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
হালিশহর থানার প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ ঘটনায় হালিশহর থানার এফআইআর নম্বর ৮, তারিখ ১৫ অক্টোবর ২০২৬ এবং জিআর নম্বর ১৫৬-এর মামলা হয়েছে। দণ্ডবিধির ৩৪২, ৩২৩, ৩৮৫, ৩৮৬, ৫০৬ ও ৩৪ ধারায় মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। ওসি মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন মন্ডলের নেতৃত্বে এসআই মো. মঞ্জুসহ পুলিশের একটি দল অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করে।
নির্জন স্থানে সংঘবদ্ধ চক্রের অভিযোগ
এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, রমনা আবাসিক এলাকার পেছনের একটি নির্জন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধ একটি চক্র সক্রিয়। তারা পথচারীদের জিম্মি করে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায় করে এবং ভিডিও ধারণ করে ব্ল্যাকমেইল করে আসছে।
বাসিন্দাদের ভাষ্য, মানসম্মান হারানোর ভয়ে ভুক্তভোগীরা থানায় অভিযোগ করতে চান না। এ কারণে নিয়মিত অপরাধের ঘটনা অনেক সময় অজানাই থেকে যায়। ওই চক্রের কাছে এলাকার মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
