শান্তির নোবেল পুরস্কার ঘিরে বিতর্ক, রাজনৈতিক আত্মপ্রচার ও আন্তর্জাতিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বের আবহে নাভি পিল্লাইয়ের স্বীকৃতি মানবাধিকারের লড়াইকে নতুন করে সামনে এনেছে। তাঁর আজীবন অঙ্গীকার, যুদ্ধাপরাধ-সহ ও মানবতাবিরোধী অপরাধকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। পেলেন এ বছরের নোবেল শান্তি পুরস্কার। লিখছেন অশোক অধিকারী।
১৯৯৩। নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যবাদ বিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা। ১৯৯৪ সালের ১০ মে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট রূপে শপথ নেওয়ার সময় নেলসন তঁার ওজস্বী ভাষণে বলেন, ‘চলুন সবার জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করি।… এই সুন্দর ভূমি আর কখনওই একে-অন্যের দ্বারা নিপীড়নের মুখোমুখি হবে না। বিশ্বের বুকে আর অপমানিত হতে হবে না। মানুষের গৌরবময় অর্জনের সূর্য আর কখনও অস্ত যাবে না।’ দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদ মহাত্মা গান্ধীকেও পীড়িত করেছিল। ম্যান্ডেলার বক্তব্যের মাধ্যমে সামাজিক পরিসরে বহুত্ববাদ হয়ে উঠল অলংকারস্বরূপ।
নাভি পিল্লাই যখন এই পুরস্কার পেলেন, তখনও ট্রাম্পের তরফে একই আবদার জনসমক্ষে এসেছে।
সেই দক্ষিণ আফ্রিকা আবারও সালংকৃত হল শান্তির নোবেলে। ২০২৬ সালে শান্তির জন্য নোবেল পেলেন দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতীয়-তামিল বংশোদ্ভূত আন্তর্জাতিক আইনের আইকন বিচারপতি নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। ২০২৫ সালে এই পুরস্কার পেয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার মারিয়া মাচাদো। পরের ঘটনা আমাদের জানা। কীভাবে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপ্রধান মাদুরোকে ট্রাম্প প্রশাসন অপহরণ করে অন্তরিন করেছিল। যা এখনও অব্যাহত। অথচ সে-দেশের নাগরিক হয়ে যিনি ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পান, তিনিই পদকটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তুলে দেন, উপহার। ফলে ট্রাম্পও গদগদ হয়ে বলার সুযোগটুকু পেয়ে যান যে, ‘গতবারের পুরস্কার বিজয়ীর কাছ থেকে পরোক্ষভাবে এটি পেয়ে আমি বেশ সম্মানিত বোধ করেছিলাম।’ ‘ইতিহাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চেয়ে বেশি কেউ এই পুরস্কারের যোগ্য নন’– এই আত্মস্তুতির অন্তরালে নিজেকে নোবেল কমিটির কাছে প্রচার পাওয়ানোর যে অছিলা– তা প্রকাশ্যে আসায় সারা পৃথিবী খুব আনন্দ প্রকাশ করছিল, এমনটা নয়।
নাভি পিল্লাই যখন এই পুরস্কার পেলেন, তখনও ট্রাম্পের তরফে একই আবদার জনসমক্ষে এসেছে। কিন্তু নোবেল কমিটির প্রধান য়ুর্গেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস যখন বলেন, ‘নোবেল কমিটির সদস্যরা যখন এই ঘরে বসেন, তখন কেবল পুরস্কারজয়ীদের ছবিই আশপাশে থাকে না, থাকে সাহস এবং সততাও। তাই আমরা আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছাপত্র এবং কাজ অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি’– তখন এই পুরস্কার নিয়ে আমাদের বিতর্ক তোলার কোনও অবকাশ থাকে না।
আন্তর্জাতিক মানবতাবাদী বিচারক নাভি পিল্লাই অবশ্য প্রশ্ন তুলেছেন– ‘সত্যিকথা বলতে সাহসের প্রয়োজন হবে কেন?’ ‘ন্যুরেমবার্গ ট্রায়াল’-এর পূর্বাপর বিশ্লেষণমুখী ধারা পর্যবেক্ষণ করে নাভি তঁার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ সমৃদ্ধ করেছিলেন। যুদ্ধ ও সংঘাতপূর্ণ বিশ্বে বলপ্রয়োগ ছাড়া আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে দ্বন্দ্ব নিরসনের উপরও গুরুত্বারোপ করেছেন।
১৯৪১ সালের সেপ্টেম্বরে ডারবানে জন্ম নাভি পিল্লাইয়ের। তামিলনাড়ুর বাসিন্দা হয়েও দারিদ্র তঁার পরিবারকে দাস শ্রমিক করে টেনে নিয়ে যায় আখ খেতের শ্রমিক করে দক্ষিণ আফ্রিকার নাটাল প্রদেশে।
নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কথা প্রথমে তিনি বিশ্বাস করতে না পারায় সকৌতুকে বন্ধু সমাজে বলেন, ‘পুরস্কারটি আমি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই!’ খবরটি জানার পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড তঁার এক্স হ্যান্ডেলে লেখেন– ‘আমরা নু্যরেমবার্গ আদালতে আছি। তঁার নোবেল পুরস্কারের জন্য এর চেয়ে শক্তিশালী প্রতীকী বিষয় আর কী হতে পারে! আমরা সবাই ভীষণ রোমাঞ্চিত!’ আরও একধাপ ওপরে উঠে জাতি সংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক বলেন, ‘আমি আমার বড় বোন নাভি পিল্লাইকে এই দুর্দান্ত ও অসাধারণ পুরস্কারের জন্য উষ্ণ অভিনন্দন জানাই। এই জয় মানবাধিকারের জন্য একটি সমষ্টিগত বিজয়।’
দক্ষিণ আফ্রিকার এই ৮৫ বছরের কৃষ্ণাঙ্গ মানবীর আজীবন সংগ্রামের যে-প্রাতিষ্ঠানিকতা, তাকে মাপা যায় শুধু তঁার কর্মজীবনের মূল্যবোধ ও পেশার প্রতি দায়বদ্ধতার নিরিখ দিয়ে। নাভি পিল্লাইয়ের কাজের যে-পরিসর তাতে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ সর্বোপরি গণহত্যা ও রাষ্ট্রের একনায়কতন্ত্রী ভূমিকার কুফলগুলিকে পর্যালোচনা ও বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে তঁার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নোবেল কমিটির নজরে এসেছে। তিনিই প্রথম শিখিয়েছেন ক্ষমতাধারীদেরও বিচারের আওতায় আনা সম্ভব। এখন যখন বিশ্বজুড়ে সামাজিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোগুলি আক্রমণের মুখে– তখন নাভি পিল্লাইয়ের এই নোবেলপ্রাপ্তি বার্তাবহ– সন্দেহ নেই।
১৯৪১ সালের সেপ্টেম্বরে ডারবানে জন্ম নাভি পিল্লাইয়ের। তামিলনাড়ুর বাসিন্দা হয়েও দারিদ্র তঁার পরিবারকে দাস শ্রমিক করে টেনে নিয়ে যায় আখ খেতের শ্রমিক করে দক্ষিণ আফ্রিকার নাটাল প্রদেশে। নাভির বাবা ছিলেন বাসচালক। মা গৃহকর্মী। নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়া শেষ করে বর্ণবৈষম্য বিরোধী সংগঠনের সঙ্গে কাজ শুরু করেন এবং আইনি পরামর্শদাতা হিসাবে নাম করেন। ১৯৬৭ সালে নিজেই গড়ে তোলেন আইনের প্রতিষ্ঠান এবং প্রথম অশ্বেতাঙ্গ মহিলা আইনজীবী হিসাবে পরিগণিত হন। পরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন নিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন এবং সেখান থেকেই ১৯৮৮ সালে আইনের উপর ডক্টরেট করেন।
অপরাধের অন্যতম উপাত্ত হিসাবে যৌনহিংসা, ধর্ষণ, মানবতার বিরুদ্ধে হিংসা ছড়ানো, গণহত্যা কীভাবে বিচারের আওতায় আসতে পারে ক্ষমতাধর নির্বিশেষে– নাভি তার অন্যতম উদ্গাতা।
১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার হাই কোর্টের প্রথম মহিলা বিচারক হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ৪ বছরের বিচারক জীবন শেষে তিনি রুয়ান্ডায় ‘আইসিটিআর’ বা ইন্টারন্যাশনাল অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিযুক্ত হন। পরে ওই সংস্থার সভাপতি হয়েছিলেন নাভি। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারকের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। ২০০৮-’১৪ এই ৭ বছর তিনি জাতি সংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের সদস্য হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। ‘ইকুয়ালিটি নাউ’ (মহিলা অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন) সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন নাভি পিল্লাই। তঁার গুরুত্বপূর্ণ কাজের মধ্যে পড়ে ইজরায়েল-অধিকৃত প্যালিস্তিনীয় ভূখণ্ড ঘিরে রাষ্ট্র সংঘের আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন। গাজায় ইজরায়েলের যে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড তার জন্য নিযুক্ত কমিশনের লিখিত প্রতিবেদনের সদস্য হিসাবেও কাজ করেছেন।
অপরাধের অন্যতম উপাত্ত হিসাবে যৌনহিংসা, ধর্ষণ, মানবতার বিরুদ্ধে হিংসা ছড়ানো, গণহত্যা কীভাবে বিচারের আওতায় আসতে পারে ক্ষমতাধর নির্বিশেষে– নাভি তার অন্যতম উদ্গাতা। শান্তি পুরস্কার ঘোষণা করে নোবেল কমিটি যথার্থ অর্থেই তঁার সম্পর্কে বলেছে– যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ, এবং গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন নাভি পিল্লাই। সাহস ও সততার সঙ্গে সুসংহত আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা গড়ে তোলার রাস্তা দেখিয়েছেন। বাস্তবেই বিরল কৃতিত্ব।
(মতামত নিজস্ব)
লেখক প্রাবন্ধিক
[email protected]
