Published on
:
6 min read
যশোধরা রায়চৌধুরী
হারিয়ে যাওয়া জিনিসের দোকান এখন আমরা। ফেসবুকে গ্রুপে গ্রুপে, প্রায় উঠে যেতে বসা নানা হতশ্রী প্রাচীন দোকানে ‘মহালয়া শোনা’র দিনের সুবিখ্যাত রেডিয়ো সেটটির ছবি... কোথাও ঘুরছে ভিনাইলের ডিস্ক, ডিস্কের গানটি সেই কবেকার পুজোর রিলিজ়। এ-পিঠে ও-পিঠে একটি করে গান, ইপি রেকর্ড। এ সবই পোস্ট করছি আমরা। নিবু নিবু বাঙালির দীপ... পুজোয় তার স্মৃতির শিখা উজ্জ্বল হয়ে উঠছে মাঝে মাঝে চিড়িক দিয়ে। ফিনিক দিয়ে কষ্ট আর ভুলে যাওয়া জিনিসের নাম ফিরে আসছে বুকের পাঁজর থেকে। এনার্জি ট্যাব থেকে প্লাস্টিকের গোল বলের ভিতর ভরা আইসক্রিম... তবু, হারাল যা কিছু, তা নিয়ে বসে থাকার সময় কোথায় এখন? লাল পাড় সাদা শাড়ির একবনাত দেখা দিয়ে বাঙালিকে মেপে দিলো বিজ্ঞাপন যত। ‘সর্বভারতীয়’ গেজ় বা দৃষ্টি দিয়ে বাঙালির পুজোর কেনাকাটার দিকে কৃপাদৃষ্টি দিলেন ব্যবসায়ীকুল। ফলে, যা হয়, অনৈতিহাসিক, আনতাবড়ি কাণ্ড ঘটে৷ রোমান অক্ষরের মধ্য অ-আ-ক-খ গুঁজে ঘেঁটে দিয়ে অবুঝ জামাকাপড়ের ব্র্যান্ড জেন জ়ি-কে তো বটেই, বাংলার সংস্কৃতিকেও এক ‘কাট পেস্ট’ সংস্কৃতি বানিয়ে দিলো৷ ‘ফিউশন’ আর ‘কম্বো’র ভিতরে বাউল গানের টুকরো, ঢাক আর লাল ঝালরের হাতপাখার সঙ্গে এক বিটকেল মিশ্র সংস্কৃতি এসেছে পুজোর দেওয়াল জুড়ে। তার চেয়ে তো মুক্তদল ছিল ভালো। সেখানে অতি-প্রাচীন, এআই দিয়ে তৈরি নন, রীতিমতো পাঁচ-পাঁচ দশ হাত সিমেট্রি মেনে করা মাটির মা দুর্গা ‘সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’র যুগকে তুড়ি মেরে চ্যালেঞ্জ দিতেন। মা এক দিকে দাঁড়ানো, অন্য দিকে অসুর। মধ্যিখানে সরু লম্বা লাইটের একটা সিরিজ় ফিট করা। সে কালে যা ‘নতুন’, সেই টিউবলাইট। বাঁ থেকে ডাইনে একটা অদ্ভুত শৃঙ্খল পর পর সাজিয়ে তিরচিহ্ন বানানো হয়েছে। দুর্গার হাত থেকে তিরের প্রথম আলোটি জ্বলে উঠছে, তার পর আর একটা। একটা করে টিউবলাইট জ্বলে উঠছে, শেষটা বিদ্ধ করছে অসুরকে। আলো দিয়ে কেরামতির শেষ কথা, আধুনিকতার হদ্দমুদ্দ। সেই আমাদের ছোটবেলার পাড়ার বাসুদা যেমন বলত— বুঝলি তো, তার পর হিরো এসে ইলেকটিরির তারটা কেটে দিয়েছে। আর তার থেকে বিজলি পড়ছে টপ টপ টপ। বাহ্যজ্ঞানশূন্য আমরা শুনছি, মানে আমি শুনছি জানালার ফাঁক দিয়ে, আর রকে বসা ছেলেরা শুনছে সামনে থেকে। ইলেকট্রিক শক শরীরে এ ভাবেই যায় তার মানে, কলের জলের মতো। এই ব্যাখ্যা অসামান্য। টুপ টুপ করে ঝরে পড়া বিজলির মতোই মা দুর্গার হাত থেকে টুইঁ টুইঁ করে ছুটে যাওয়া মহাস্ত্র... আলো দিয়ে বর্ণিত। টেকনোলজির যুগ এসে গেছে, তখনই একেবারে যথাযথ ভাবে বুঝতে পেরেছিলাম।
আজ আর সে সব নেই। যেমন নেই পুজোর আদি অকৃত্রিম মেলাগুলো, হাজরা পার্ক থেকে হরিশ পার্ক, ঘাস উঠে যাওয়া কলকাতার পার্কগুলো, যেখানে নাগরদোলা বসত, চট আর কাপড় পেতে খুব কম দামি পুতুল আর হাতে গড়া কটকটি বাজানো মাটির থালায় বাঁশ বেতের চাকা লাগানো টানা দেওয়া বাজনাবাজা খেলনা পাওয়া যেত। বড় দোকানের— জীবনে একবারই পায় তারে তার পরে পায় নাকো আর— চোখ বন্ধ করা দামি পুতুলের পাশে এই সব মেলায় কেনা তিড়িং-নাচা সেপাই, বা কাপড়ের বা প্লাস্টিকের সস্তা পুতুলেও কম আনন্দ ছিল না। এখন কাঠের নাগরদোলার চেয়ে বেশি বসে উদ্দাম স্টিলের লাল নীল মঞ্চ, অথবা লম্ফঝম্প করার রবারের বেলুন-মঞ্চ। গড়িয়ে পড়ার সুখ অনিত্য বটে, কিন্তু অনিত্যেরও মজা অন্য ছিল। সেই বুদবুদ বার করা ফাঁদালো নল, সাবান জলে দিয়ে তুলে ফুঁ দিলেই হু-হু করে রঙিন বুদবুদ বার হতো। বাড়িতে এসে আর সে ভাবে অত বড় বড় বুদবুদ হতো না। তেমনই বিক্রি হতো অদ্ভুত সব কলকব্জা, যার ভিতরে বেসনের পুর দিয়ে চিপলেও চিত্তির বিচিত্তির বড়ি বা নানা আকারের সেউই তৈরি হয়। বাড়িতে এনে করতে গেলে তেমনটা হতো না। সব ওদের হাতযশ, বলে এক পাশে রেখে দিতেন মা। আর ছিল কেরোসিনের শিখায় চলা মোটরবোট, ভটভটি। লাল প্লাস্টিকের গামলায় গোল গোল ঘুরে বেড়াত।
এই সব হারানো জিনিসের পুজো, পুজোর এই সব জিনিস, আজকে হারানো আর তা নিয়ে চর্চা, এ এক ধরনের বয়স্ক-বিলাস বটে। তবে আসলে যেটা হারাল এই পঁচিশ-তিরিশ বছরে, তা হলো সবার সঙ্গে সবার দেখা হওয়ার সেই অসম্ভব বড় পরিসরটা। পুজো তো ছিল বিরল ভাবে বন্ধুদের সঙ্গে মিলনের, আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা হওয়ার নানা রকম ছল। অথবা শ্রেণিবিন্যাস ভেঙে ফেলেও-বা নানা স্তরের মানুষের মিলন। এই যেমন পুজোর বখশিস, এই প্রথাটিকে আমরা আজ যেমন যান্ত্রিক ভাবে বোনাস বা এক মাসের মাইনে ভাবি, তখন তা ছিল না৷ যাঁরা বাড়িতে কাজ করতেন, তাঁদের শাড়ি-জামা কেনা হতো। ভালোমন্দে যাচ্ছি না, তবু পুজোর আনন্দ বলতে এই সব ‘অন্য’ জিনিস বুঝতাম। তা বলে মস্ত পুজোর চক-মেলানো দালানওয়ালা বাড়ি, বাংলা সিনেমার বনেদি বাড়ির দৃশ্যই শুধু নস্টালজিয়া নয়। সব বাড়িতে অমন পুজো হতো না৷ আমাদের মধ্যবিত্ত জীবনের পুজোর শুরু ছিল একতলা-দোতলা বাড়ি, বাসাবাড়ি, কলতলার বারোয়ারি ভিড় অথবা বাড়িওয়ালা ভাড়াটের ভিতরের খটাখটি-সহ জীবনেও হঠাৎ একদিন সবাই নিজের নিজের রেডিয়ো চালিয়ে মধ্য রাতে উঠে ‘মহালয়া শুনতে শুনতে’ ঘুমিয়ে পড়া। আর শেষ ছিল বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিজয়ার প্রণাম করে নাড়ু আর ঘুগনি খাওয়া। অতটাও ভালো-না-বাসা আত্মীয়রাও খুব ভালো খাবার খাইয়ে দিলে কম আকর্ষণের হালকা নেতিয়ে যাওয়া নিমকি-সহ প্রিয় মাসি-পিসিদের দর কমত না। তবু তুল্যমূল্য বিচারে বাধা কী?
সর্বত্র নানা ধরনের ছোট-বড় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থাকত, নানা পুজোর সঙ্গে জড়িত। গ্রামীণ ঢঙে শীতলা পুজোর প্যান্ডেলে বস্তিবাসীদের উদ্যোগে গান ও কথকতা রাত জেগে জানালায় বসে দেখেছি যেমন, কালীপুজোর পরে রমেশ মিত্র রোডে সুবিশাল প্যান্ডেলে অমৃক সিং অরোরার গান শুনেছি। দুর্গাপুজোতেও পাড়ায় পাড়ায় নিজেরাই নাটক করা আর নৃত্যানুষ্ঠান, বেসুরো গান, ছোটদের আবৃত্তি করতে করতে ভুলে যাওয়া— এ সবই পুজোর অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এখনও হয়, সোসাইটির বাসিন্দারা হয়তো করছেন। আমরা নিজেরাই কবিতা পড়ে, গান গেয়ে (সে আবার বামপন্থীমতো, গণসঙ্গীত!) পুজোর ক্লাবের স্টেজে ওঠার মওকা পেয়েছিলাম। আবার নাটকে প্রায় কাটা সৈনিকের মতো শুধু একটু মাথা নাড়ার রোল পেয়েছি একেবারে কুচো বয়সে, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ভাড়াটে চাই’ নাটকে। মনে আছে, ওই নাটকের ছলেই দিনের পর দিন রিহার্সাল, পাড়ার কোন মাসি-কাকির বাড়িতে। সেখানেই খুদে আমার চোখের সামনে তৎকালীন টিন-এজার দাদা-দিদিদের কত প্রেম গড়ে উঠতে আর ভেঙে যেতে দেখলাম।
এ সব তো ঘটনাবহুল দিনের কথা। আবার ঘটনাহীন, একা একা পুজোর দিনগুলোও মনে আছে। বড় হয়ে গিয়েছি। মা দিদি আমি, তিনজন তিন ঘরে নিজেদের বই পড়া, রেডিয়ো শোনা, এই সবে থাকি। বিচ্ছিন্ন তিন দ্বীপ। পুজোর সারা সন্ধে বাড়িতে বসে থেকে খুব মনমরা হয়ে আছি। সেই সময়ে হঠাৎ বিষাদ কাটিয়ে ফেলে, রাত ন’টার সময়ে একটা প্রায় নতুন জামা গায়ে গলিয়ে পাড়ায় বেরিয়ে পড়লাম।
তার পর আমাকে গ্রহণ করে নিল পুজোর কলকাতা। ওই ভাবে ভিড়ের ভিতর একা হওয়ার অসামান্য অনুভূতি একমাত্র সপ্তমী থেকে নবমীর রাতেই সম্ভব। জনজোয়ারে গা মেলানোর সেই রোমাঞ্চ। কখনও এমন বার হওয়ার ছুতো থাকত চুরমুর খাওয়ার, বা বাড়ির সবার জন্য আইসক্রিম কিনে আনার। মা বলত, যা না এগ রোল নিয়ে আয়!
রাস্তায় বেরিয়ে ধাক্কা লেগে যেতে দেখি, অন্য কোনও প্রান্তে থাকা কোনও মামাতো দাদা, এসেছে সপরিবারে। আবার অষ্টমীর মধ্যরাতে বাড়ির দরজায় ঝনঝন করে বাজা কড়া! জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখা গেল, বাগবাজারের পিসিরা মধ্য রাতে ভবানীপুরে ঠাকুর দেখে ক্লান্ত হয়ে আমাদের বাড়িতে চলে এসেছেন। হয়তো চটি ছিঁড়ে গেছে কারও। বাড়িতে এসে, বসে, সেই রাতেই বানানো গাঢ় দুধ চা (তখন ঘরে ঘরে চা বানানোর জন্য দুধের জোগান থাকত, কারণ লাল চা বা লিকার চা-ই পৃথিবীর একমাত্র সুস্থ চা, এমন বদ্ধমূল ধারণাটা তখনও ঢুকে পড়েনি মননে) আর রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের পাশের ভুজিয়ার দোকানের কিনে রাখা, বয়ামে ভরা ঝুরিভাজা, চানাচুর দিয়ে জলযোগ সেরে, আমাদের কারও চটি পরেই তাঁরা ভোররাতে ফিরে যান। সপ্তমীর রাত বদলে গেল অষ্টমীর ভোরে, আর ঢাকের বাদ্যি বেজে উঠল পাড়ার প্যান্ডেলে৷ তুমুল আড্ডা দিতে দিতে মধ্যিখানের সময়টা কোথাও হারিয়ে যায়। মনেও থাকে না। পুজো-গন্ডার দিন, সবটাই আলাদা হবে, এটাই তো চাওয়া, ভাবা। এই সব অন্য রকম দিনগুলোই চিরদিন মনে থেকে যায়৷
গুনে গুনে পুজোর জামা এ-বেলা ও-বেলা পরার সেই দিনই বা কোথায় গেল? বুদ্ধদেব বসুর গল্পে ছিল, ছোট মেয়েটির মাথার কাছে নতুন জুতো নিয়ে শুয়ে স্বপ্ন দেখার কথা। সব কিছু নতুন থাকলে ব্যাপারটা ঠিক সুবিধের হবে না, এ বিষয়ে সেই গল্পটি ভোলার না। আমাদেরও তো ঘরে ঘরে এমনই রাখার অভ্যেস ছিল। পুজোর এক মাস আগে থেকে, পুজোয় নতুন জুতোর পাতাজোড়া বিজ্ঞাপন থেকে নিজের কোনটি চাই, সেইটি বাছাই থেকে কেনাকাটা এবং তার পর মাসখানেক ধরে সে জুতোজোড়াকে গন্ধ শুঁকে, পেলেপুষে, শেষমেশ পুজোর দিনে প্রাণে ধরে পায়ে দেওয়া আর এইয়া ফোসকা নিয়ে লেংচে ফেরা। জামাও তা-ই। বারবার ব্রাউন পেপারের খাম থেকে বা সাদা কাগজের দোকানের নাম লেখা বাক্স থেকে বার করে নেড়েচেড়ে দেখা। গায়ে ফেলে দেখা।
তা বাদে ছিল মা-মামি-মাসির বানানো জামা। তখন বুঝতাম না৷ ছিটের কাপড়ের দোকানে ঘুরে ঘুরে মা যে ছিট কিনতেন, তা দিয়ে আমার, আমার দিদি ও মামাতো দিদির এক রকমের জামা হতো। মা সেলাইকল থেকে দাঁত দিয়ে সুতো কেটে প্রথম একবার পরিয়ে দেখার পর ঢলঢলে অংশে আবার মেরামতি সেলাই দিতেন৷ তার পর আমাদের সবার জামার জন্য আলাদা একটা দিন থাকত, টিপ বোতাম লাগানোর পর্বটার জন্য। বাড়ির সব কাজ সেরে মায়েদের সে সবে কী তাড়া লেগে যেত! টিপ বোতামের পাতা কিনতে, লেসের প্রজাপতি কিনতে বেরোতে হতো পঞ্চমীর দিনই বেছে বেছে।
কালী কাটরা, লক্ষ্মী কাটরার পাড়ায় আর এক দৃশ্য থাকত অপেক্ষা করে। যে মানুষ হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে সারা বছর সন্তানের জন্য জামা কিনতে পারেননি, সেই মানুষের মুখ হাসিতে ভরে থাকত, সদ্য বোনাস পাওয়া বা পুজোর বখশিস পাওয়ার পর। সাধারণ মানুষের সেই পুজোর বাজার, যা তোলা থাকত একেবারে পুজো শুরুর আগের শেষ মুহূর্তটির জন্য, এবং সচরাচর যে বাজারটা হতো ফুটপাতের দোকান থেকে... সেই সব মানুষের কেনাকাটা, হাসি, তাদের পাখিজামা কেনার অহঙ্কার, সে সবও কি হারিয়ে যাবে? গেল?
