October 24, 2026, 12:51 pm
মুসা আল-খারিজমি ও আধুনিক অ্যালগরিদম
Reporter Name
- Update Time : Saturday, October 24, 2026
- 13 Time View
প্রযুক্তি ডেস্ক: বর্তমান ডিজিটাল প্রযুক্তি পৃথিবীজুড়ে যোগাযোগের মাধ্যম থেকে শুরু করে নানা জটিল সমস্যার সমাধানে যেভাবে কাজ করছে, তার মূল ভিত্তি হলো গাণিতিক নির্দেশনার সমষ্টি। স্মার্টফোন থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম—সব জায়গাতেই পর্দার আড়ালে কাজ করে চলেছে অ্যালগরিদম নামক একটি ধারণা। তবে প্রযুক্তির এই অতি পরিচিত শব্দটির ইতিহাস কেবল আধুনিক সিলিকন ভ্যালির উদ্ভাবন নয়, বরং এর শেকড় প্রোথিত রয়েছে শত শত বছর আগের ইতিহাসে। প্রাচীন ও মধ্যযুগের জ্ঞানচর্চার হাত ধরেই আজকের এই প্রযুক্তিগত বিপ্লব সম্ভব হয়েছে।
এই পুরো ব্যবস্থার ঐতিহাসিক পটভূমিতে উজ্জ্বল এক নক্ষত্র হলেন অষ্টম ও নবম শতকে বাগদাদে কর্মরত প্রখ্যাত গণিতবিদ আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খারিজমি। আনুমানিক ৭৮০ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান উজবেকিস্তান ও তুর্কিস্তান সংলগ্ন খারিজম অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করা এই মনীষী আব্বাসি খলিফা আল মামুনের আমলে বাগদাদের বিখ্যাত বাইতুল হিকমাহ বা জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হন। সেসময়ে গ্রিক, পারস্য ও ভারতীয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহু অমূল্য গ্রন্থ আরবিতে অনুবাদের সুবাদে বাগদাদ বিশ্ব জ্ঞানভান্ডারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সেই অনুকূল বৌদ্ধিক পরিবেশে আল খারিজমি গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে গভীর গবেষণা শুরু করেন এবং পূর্বসূরিদের অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে নতুন গাণিতিক ধারা উন্মোচন করেন।
প্রযুক্তির আধুনিক পরিভাষায় তার নাম অমর হয়ে আছে অ্যালগরিদম শব্দটির মাধ্যমে, যা মূলত তার নাম থেকেই বিকশিত হয়েছে। দ্বাদশ শতকে তার রচিত গণিত গ্রন্থসমূহ যখন লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়, তখন ইউরোপীয়রা তাকে ‘আলগোরিমি’ নামে চিনতে শুরু করে এবং সেখান থেকেই বর্তমানের অ্যালগরিদম শব্দের উৎপত্তি ঘটে। গাণিতিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নিয়ম, ধারাবাহিক ধাপ এবং পদ্ধতিগত চিন্তার প্রয়োগ তার কাজের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল। আধুনিক প্রযুক্তিতে কোনো নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার জন্য যে সুস্পষ্ট নির্দেশনার ধারাবাহিকতা অনুসরণ করা হয়, তার আদি চিন্তাধারার সূচনায় এই মহান গণিতবিদের অবদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
গণিতের ইতিহাসে তার সবচেয়ে বড় কীর্তিগুলোর একটি হলো বীজগণিতের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশ সাধন। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আল-কিতাব আল-মুখতাসার ফি হিসাব আল-জাবর ওয়াল-মুকাবালা’য় তিনি রৈখিক ও দ্বিঘাত সমীকরণ সমাধানের সুনির্দিষ্ট ও নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতি সবার সামনে তুলে ধরেন। এই বইটির নামেই থাকা ‘আল-জাবর’ শব্দটি থেকেই পরবর্তীতে লাতিন এবং ইংরেজি আলজেব্রা বা বীজগণিত শব্দটির জন্ম হয়েছে। তাছাড়া, ভারতীয় সংখ্যাপদ্ধতি এবং শূন্যসহ দশমিক স্থানিক মানের ব্যবহার আরবি ভাষায় সফলভাবে রূপান্তর ও প্রচার করার পেছনেও তার অগ্রণী ভূমিকা ছিল, যা পরবর্তীতে ইউরোপসহ গোটা বিশ্বে গণনার কাজকে অভাবনীয়ভাবে সহজ করে তোলে।
আজকের দিনে ব্যাংকিং সফটওয়эр পরিচালনা, বিমান চলাচলের সুনির্দিষ্ট পথ নির্ধারণ, ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিনের কার্যকারিতা কিংবা চিকিৎসাবিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ—সব ক্ষেত্রেই অ্যালগরিদমের উপস্থিতি সর্বব্যাপী। যদিও বর্তমানের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো এবং প্রাচীন যুগের গাণিতিক পদ্ধতি হুবহু এক নয়, তবুও যেকোনো জটিল সমস্যাকে সুসংবদ্ধ নিয়মে প্রকাশ ও সমাধানের সুদীর্ঘ ইতিহাসে তার অবদান অবিস্মরণীয়। শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও আল খারিজমির এই বহুমুখী প্রতিভা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আজকের এই আধুনিক ডিজিটাল যুগের সুদৃঢ় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করতে অতীতের মনীষীদের জ্ঞানচর্চা কতটা অপরিহার্য ছিল।
More News Of This Category
© All rights reserved © dainikkhobor.com


