সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীম হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ও র্যাব।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১০টার দিকে কালিগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগরে এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর আমিনী সাংবাদিকদের বলেন বলেন, আইনের চোখে আমি অপরাধী, আল্লাহর দৃষ্টিতে আমি কী, সেটা আল্লাহই ভালো জানেন। এ ঘটনায় ব্যক্তিগতভাবে অনুতপ্ত নন তিনি।'
স্বজনদের ভাষ্য, স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে শামীমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা হয়। এরপর তার ওপর তিন দফায় হামলা চালানো হয়। প্রথমে বাড়িতে, দ্বিতীয়বার কুলিয়ার এক গ্রাম্য চিকিৎসকের চেম্বারে এবং তৃতীয়বার দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামলার শিকার হন তিনি। পরে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে তার মৃত্যু হয়।
আরও পড়ুন
পরিবারের অভিযোগ, ১২ অক্টোবর সোমবার শামীমের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। ওই ঘটনার পর বিষপানে অসুস্থ শামীমকে কুলিয়ার গ্রাম্য চিকিৎসক ডা. এস. এ. সবুরের চেম্বারে নেওয়া হয়। পরদিন ১৩ অক্টোবর মঙ্গলবার বিকেলে সেখানে আবারও তার ওপর হামলা হয়। চিকিৎসকের চেম্বারে হামলার সময় শামীমকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন ডা. সবুর। কিন্তু উত্তেজিত জনতার হাত থেকে তাকে বাঁচাতে পারেননি। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করার পর পুলিশ শামীমকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।
তবে হাসপাতালেও নিরাপদ থাকতে পারেননি শামীম। ওই রাতেই একদল লোক হাসপাতাল ঘেরাও করে ভেতরে প্রবেশ করে তার ওপর হামলা চালায়। এ সময় চিকিৎসক, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের জিম্মি করার অভিযোগ রয়েছে। গুরুতর আহত শামীমকে পরে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
শামীমের ওপর হামলার প্রত্যক্ষদর্শী ডা. এস. এ. সবুর বলেন, তার চেম্বারে হামলার পরও জীবিত ছিলেন শামীম। তাকে বাঁচাতে হামলাকারীদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তবে উত্তেজিত জনতার হাত থেকে তাকে রক্ষা করতে পারেননি। পরে পুলিশ শামীমকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানেই রাতে আবারও হামলার শিকার হন তিনি।
শামীমের স্ত্রী নাজমা খাতুনের ভাষ্য, স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত কথোপকথন কে রেকর্ড করেছিল এবং কীভাবে তা ছড়িয়ে পড়েছিল, তা তারা জানেন না। তার বক্তব্য, শামীম কোনো অপরাধ করে থাকলে আইন অনুযায়ী তার বিচার হতে পারত। কিন্তু তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
নিহতের ছোট ভাই তৌশিফ রহমান সাগরের দাবি, অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে এবং ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে এলাকায় উত্তেজনা তৈরি করা হয়। এরপর তার ভাইয়ের ওপর তিন দফা হামলা চালানো হয়। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র শামীম ধর্মবিষয়ক বই লিখেছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে মসজিদে ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ থেকে ১৫ বছর আগে ছিনতাইকারী বা অজ্ঞান পার্টির কবলে পড়ার পর মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন শামীম। এরপর দীর্ঘদিন তার চিকিৎসা চলে।
শামীমের পরিবারের অভিযোগ, স্থানীয় বড়শান্তা জামায়াত কার্যালয় থেকে স্বামী-স্ত্রীর কথোপকথনের অডিওটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাদের দাবি, অডিও ছড়িয়ে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে শামীমের বিরুদ্ধে উত্তেজনা সৃষ্টি করা হয়। তবে অডিওটি কে ধারণ করেছিল, কে প্রথম ছড়িয়েছিল এবং কীভাবে সেটি ওই কার্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত হলো, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে, জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি এইচ এম এমদাদুল হক। বৃহস্পতিবার রাতে সংবাদ সম্মেলনে তিনি দলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ নাকচ করেন।
এ ঘটনায় দেবহাটা থানায় হত্যা মামলা করেন নিহতের বড় ভাই আব্দুল জলিল। মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর আগে এজাহারভুক্ত তিনজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায় পুলিশ। তাদের মধ্যে মোক্তার হোসেন খান ও আসাদুল ইসলাম মোল্যার নাম জানা গেছে। পরে মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
আমিনীর চাচাতো ভাই বশির আহমেদ জানান, ঘটনার রাতে আমিনী তাকে বলেছিলেন, তিনি আত্মসমর্পণ করবেন। পরে আমিনী ফেসবুক মেসেঞ্জারে একটি মোবাইল নম্বর পাঠান। প্রায় এক ঘণ্টা পর প্রশাসনের লোকজন বশিরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং ওই নম্বরের বিষয়ে জানতে চান। বশির তাদের সহযোগিতা করেন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আমিনীকে নিয়ে যান।
এবিষয়ে দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এইচ এম শাহীন জানান, পুলিশের উপস্থিতিতেই শামীমকে হত্যা করা হয়। সে সময় হাসপাতালে মাত্র তিনজন পুলিশ সদস্য ছিলেন এবং তারা উত্তেজিত জনতাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি। পরে এঘটনায় মামলা হলে পুলিশ এখনো পর্যন্ত মামলার প্রধান আসামিসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। বাকিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
নাজমুল শাহাদাৎ/ এসএন
