ভারতীয় শিল্পকলার বর্ণাঢ্য ক্যানভাসে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি করে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী ও প্রাক্তন রাজ্যসভা সাংসদ যোগেন চৌধুরী। দীর্ঘ চৌদ্দ মাস ধরে মরণব্যাধি ব্লাড ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করার পর রবিবার, পঁচিশ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল সাতাশি বছর। তাঁর এই প্রয়াণে আন্তর্জাতিক শিল্পমহল, সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
দীর্ঘদিন ধরে ব্লাড ক্যানসারের চিকিৎসা চললেও, শারদীয় উৎসবের ষষ্ঠীর দিন মূত্রনালীতে মারাত্মক সংক্রমণ নিয়ে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে এই সংক্রমণ সেপসিসের রূপ নিলে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে শনিবার তাঁকে ভেন্টিলেশনে নেওয়া হয় এবং রবিবার বেলা দশটা পনেরো মিনিটে তিনি মহাপ্রয়াণের পথ ধরেন। তাঁর এই প্রয়াণের মধ্য দিয়ে ভারতীয় আধুনিক শিল্পকলার এক সোনালী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
ক্যানভাসে কালি, জলরং, প্যাস্টেল এবং তেলরঙের জাদুকরী ব্যবহারে তিনি গড়ে তুলেছিলেন সম্পূর্ণ এক নিজস্ব শিল্পরীতি। মানবদেহের বক্ররেখা, চারপাশের সামাজিক বাস্তবতা এবং মানুষের সুগভীর মানসিক অনুভূতির শিল্পসম্মত প্রকাশ তাঁর শিল্পকর্মকে বিশ্বমঞ্চে এক অনন্য উচ্চতা এনে দিয়েছিল। ফিগারেটিভ আর্টের এই জীবন্ত কিংবদন্তির জন্ম তৎকালীন ঢাকার ফরিদপুরে। ১৯৫৫ সালে সরকারি আর্ট কলেজে শিক্ষাজীবন শুরু করার পর তিনি পাড়ি জেম প্যারিসের বিখ্যাত 'ইকোল দে বো আর্টস'-এ। দেশে ফিরে দীর্ঘ সময় শান্তিনিকেতনের কালা ভবনের অধ্যাপক হিসেবে অসংখ্য তরুণ শিল্পীকে অনুপ্রাণিত করার পাশাপাশি তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনের আর্ট গ্যালারির কিউরেটরের দায়িত্বও অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে পালন করেন।
শিল্পচর্চায় তাঁর এই আজীবন সাধনা অসংখ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছিল। মধ্যপ্রদেশ সরকারের মর্যাদাপূর্ণ 'কালিদাস সম্মান', রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডি.লিট এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের 'বঙ্গবিভূষণ' উপাধিতে ভূষিত হন এই গুণী শিল্পী। শিল্পকলার পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও তিনি রেখেছিলেন তাঁর দীপ্ত স্বাক্ষর। ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে অত্যন্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছিলেন। যোগেন চৌধুরীর সৃষ্টিশীলতা এবং তাঁর অনন্য শিল্পদর্শন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে শিল্পপ্রেমীদের মনে চিরভাস্বর হয়ে থাকবে।
