দেশভাগ তাঁকে উদ্বাস্তু করেছিল। সেই উদ্বাস্তু জীবনের ক্ষত, মানুষের ভাঙাচোরা মুখ, শরীরের বিকৃতি সবই হয়ে উঠেছিল তাঁর তুলির ভাষা। কালি-প্যাস্টেল-জলরঙে আজীবন ডুবে থাকা আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম স্তম্ভ যোগেন চৌধুরী আর নেই। বাইপাস সংলগ্ন একটি বেসরকারি হাসপাতালে রবিবার সকালে প্রয়াত হলেন তিনি। গত ১৪ মাস ধরে ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন ৮৭ বছর বয়সি এই শিল্পী। সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মূত্রনালীর সংক্রমণ। যার জেরে ষষ্ঠীর দিন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তাঁকে। অবস্থায় বিশেষ উন্নতি হয়নি, বরং আরও খারাপের দিকে যেতে থাকে। শেষমেশ মৃত্যু হল শিল্পীর।
যোগেন চৌধুরী বলতেন, ‘শরীর এক জৈবিক বিস্ময়।’ তাঁর চিত্রকলার পরতে পরতে ফুটে উঠেছে সেই বিস্ময়। ১৯৬০ সালে কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজ থেকে পাশ করার পর উচ্চশিক্ষায় প্যারিস পাড়ি দেন তিনি। সেখানে Ecole des Beaux Arts, William Hayter-এর বিখ্যাত Atelier 17-এ অঙ্কনের পাঠ নেন। রেখা জালের অদ্ভুত কারসাজি তাঁকে হাতে ধরে শিখিয়েছিল ইউরোপ। অন্যদিকে নিজের শিকড়, বাংলার উদ্বাস্তু জীবনের ক্ষত ছিল তাঁর শিল্পের ভিত। দু’য়ে মিলে ভারতীয় চিত্রশিল্পের দুনিয়ায় এক বিরাট মাইলফলক তৈরি করেছিলেন যোগেন। ছবিতে আড়াআড়ি রেখার জাল ছিল তাঁর বিশেষত্ব। তুলির টানে একে একে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন ফোলা, বিকৃত, অথচ অসম্ভব মানবিক সব মুখ। ছবির দুনিয়ায় গণেশ, দম্পতি এবং নারী ছিল তাঁর প্রিয় বিষয়।
রেখা জালের অদ্ভুত কারসাজি তাঁকে হাতে ধরে শিখিয়েছিল ইউরোপ। অন্যদিকে নিজের শিকড়, বাংলার উদ্বাস্তু জীবনের ক্ষত ছিল তাঁর শিল্পের ভিত। দু’য়ে মিলে ভারতীয় চিত্রশিল্পের দুনিয়ায় এক বিরাট মাইলফলক তৈরি করেছিলেন যোগেন।
১৯৩৯ সালে বাংলাদেশের ফরিদপুরের দহরপাড়া গ্রামে জন্ম যোগেন চৌধুরীর। তাঁর পিতা প্রমথনাথ চৌধুরী ছিলেন ফরিদপুরের জমিদার। জমিদার পরিবারের সন্তান যোগেনের মধ্যে শিল্পী মন খুঁজে পেয়েছিলেন তাঁর মা। আঁকার হাতেখড়ি সেখান থেকেই। কলকাতার নিজের বাড়ির দেওয়ালে একটি ময়ূরের ছবি এঁকেছিলেন তিনি। এটিই ছিল তাঁর জীবনের প্রথম চিত্র। এরপর ধাপে ধাপে এগোতে থাকে শিল্পকর্ম। প্যারিস থেকে ফেরার পর সমাজ সচেতন শিল্পী হিসেবে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেন যোগেন। সমাজ ও রাজনীতির কদর্য বিষয় নিয়ে তাঁর ব্যঙ্গাত্মক চিত্র ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলে দেয়। খ্যাতির পাশাপাশি আসে একের পর এক সম্মান।
১৯৭২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ভবনের কিউরেটর ছিলেন তিনি। পরে শান্তিনিকেতন কলাভবনের অধ্যাপক, ও প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। পদ্মভূষণ, ললিতকলা একাডেমি, ফ্রান্সের প্রিক্স দে লা জঁ পেন্তুর, সব সম্মানই পেয়েছেন। ২০১৪-তে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছিলেন যোগেন চৌধুরী, কিন্তু রাজনীতির চেয়ে অনেক বড় ছিল তাঁর স্টুডিও।
কলকাতায় নিজের হাতে গড়া ‘চারুবাসনা দ্য যোগেন চৌধুরী সেন্টার ফর আর্টস’ রয়ে গেল তাঁর শেষ স্বপ্ন হিসেবে। বাংলা চিত্রকলায় রবীন্দ্রনাথ, যামিনী রায়ের পর যে কয়েকজন নিজস্ব ব্যাকরণ তৈরি করতে পেরেছিলেন, যোগেন চৌধুরী তাঁদের শেষ স্তম্ভ। তাঁর জীবন রেখা থামলেও, তাঁর ছবির মায়াজালে আছন্ন রয়ে গেল শিল্পের পৃথিবী।
