শারদীয় দুর্গোৎসবের সবচেয়ে মহিমান্বিত দিন আজ — মহাঅষ্টমী। মহাষষ্ঠীর দিন শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা আজ অষ্টমী তিথিতে এসে পৌঁছেছে পরম পবিত্র এক মুহূর্তে। সারা দেশের হিন্দু সম্প্রদায় আজ সকাল থেকে দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করছেন এবং রাজধানী ঢাকার গোপীবাগে রামকৃষ্ণ মিশন মঠে বিপুল আয়োজনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে কুমারী পূজা।
অষ্টমী তিথি ও পূজার সময়সূচি: বাংলাদেশের পঞ্জিকা অনুযায়ী মহাঅষ্টমী তিথি শুরু হয়েছে গতকাল রবিবার সকাল ৮টা ২৯ মিনিটে এবং শেষ হবে আজ সোমবার সকাল ১০টা ৫২ মিনিটে। মহাঅষ্টমীর দিন ভোর ৫টা ৩৯ মিনিটে সূর্যোদয়। সকাল ৯টা ২৮ মিনিটে পূর্বাহ্ন পূজার মুহূর্ত। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরসহ সারা দেশের পূজামণ্ডপগুলোতে সকাল সাড়ে ৬টা থেকে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে—চন্ডী ও মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে। সকালে মহাষ্টমী পূজা ও পুষ্পাঞ্জলি অনুষ্ঠানের পর দুপুরে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আজ রাতে অষ্টমী ও নবমীর সন্ধিক্ষণে হবে সন্ধিপূজা। অষ্টমীর শেষ ২৪ মিনিট ও নবমীর প্রথম ২৪ মিনিট — সর্বমোট ৪৮ মিনিটে সন্ধিপূজা সম্পন্ন হয়। মূলত দেবী চামণ্ডার পূজা করা হয় এই বিশেষ মুহূর্তে।
কুমারী পূজা — জীবন্ত দেবীর আরাধনা: আজ অষ্টমীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও আধ্যাত্মিকভাবে গভীর অনুষ্ঠান হলো কুমারী পূজা। রাজধানীর রামকৃষ্ণ মঠে সকাল ৬টা ১০ মিনিটে মহাঅষ্টমী পূজা শুরু হয়েছে। সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে হয় পুষ্পাঞ্জলি। বেলা ১১টায় শুরু হয় কুমারী পূজা। আজ অষ্টমীর সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও আধ্যাত্মিকভাবে গভীর অনুষ্ঠান হলো কুমারী পূজা। রাজধানীর রামকৃষ্ণ মঠে সকাল ৬টা ১০ মিনিটে মহাঅষ্টমী পূজা শুরু হয়েছে। সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে হয় পুষ্পাঞ্জলি। বেলা ১১টায় শুরু হয় কুমারী পূজা।
হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, সাধারণত এক থেকে ১২ বছরের অজাতপুষ্প সুলক্ষণা ব্রাহ্মণ বা অন্য গোত্রের অবিবাহিত কুমারী নারীকে দেবীজ্ঞানে পূজা করা হয়। শ্রীরামকৃষ্ণের কথামতে, কুমারী পূজার বিষয়ে বলা হয়েছে — শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর রূপ বেশি প্রকাশ পায় এবং মাতৃরূপ উপলব্ধি করাই কুমারী পূজার উদ্দেশ্য। নির্বাচিত কুমারীকে মহাঅষ্টমীর দিন ভোরে গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়।
তাকে সাজিয়ে কপালে সিঁদুর, পায়ে আলতা ও হাতে ফুল দেওয়া হয়। কুমারীকে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে ষোড়শোপাচারে দেবীজ্ঞানে আরাধনা করা হয়। দেবী দুর্গার জীবন্ত প্রতীক হিসেবে একজন কুমারী শিশুকে পূজা করার মধ্য দিয়ে এই আয়োজনের মাধ্যমে প্রকাশ পায় নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা, মাতৃভাবের আরাধনা এবং প্রতিটি মানুষের মধ্যে ঈশ্বরীয় সত্তাকে উপলব্ধি করার চিরন্তন দর্শন। শরতের স্নিগ্ধ সকালে মন্ত্রোচ্চারণ, শঙ্খধ্বনি, ঘণ্টার আওয়াজ আর ভক্তদের প্রার্থনায় মুখর হয়ে ওঠে পূজামণ্ডপ।
দেবীর প্রতিমার পাশাপাশি সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে সেই ছোট্ট কুমারীর দিকে, যার মধ্যে ভক্তরা খুঁজে পান জগজ্জননী মা দুর্গার প্রতীকী উপস্থিতি। মহাষ্টমী দুর্গাপূজার একটি গুরুত্বপূর্ণ তিথি। এই তিথিতে কুমারী পূজার আয়োজন ধর্মীয় আচারকে ছাড়িয়ে মানবিক মূল্যবোধের এক বিশেষ বার্তা বহন করে। শিশুর নিষ্পাপতা, পবিত্রতা, সম্ভাবনা ও শক্তির প্রতীক হিসেবে কুমারীকে দেবীর আসনে প্রতিষ্ঠা করা হয়। তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে নারীকে সম্মান করা, মাতৃত্বের মর্যাদা উপলব্ধি করা এবং সমাজে নারীর শক্তি ও সম্ভাবনাকে স্বীকৃতি দেওয়ার তাৎপর্যও সামনে আসে।
রামকৃষ্ণ মিশনে বিশেষ গুরুত্ব: স্বামী বিবেকানন্দের আধ্যাত্মিক ভাবধারা ও শ্রীশ্রীমায়ের মাতৃভাবের আদর্শে রামকৃষ্ণ মিশনের কুমারী পূজার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এই ধারায় নারীকে কেবল সামাজিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয় না; বরং প্রত্যেক নারীর মধ্যে মাতৃসত্তা ও দেবীশক্তির প্রকাশ উপলব্ধি করার শিক্ষা দেওয়া হয়। কুমারী পূজার মধ্য দিয়ে সেই ভাবনাই ভক্তদের সামনে তুলে ধরা হয়। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাধনজীবনে নারীকে মাতৃজ্ঞানে দেখার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী বিবেকানন্দও নারীশক্তির জাগরণকে সমাজের অগ্রগতির অন্যতম শর্ত হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এই আদর্শের আলোকে কুমারী পূজা কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় আয়োজন নয়, বরং নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও মানবসেবার চেতনা জাগ্রত করার উপলক্ষ।
রামকৃষ্ণ মিশনের পূজায় কুমারীকে দেবীরূপে বরণ করার মধ্য দিয়ে ভক্তরা উপলব্ধি করার চেষ্টা করেন, ঈশ্বরের আরাধনা শুধু প্রতিমার সামনে প্রণাম করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের মধ্যেও সেই চেতনার প্রকাশ রয়েছে। বিশেষ করে নারী ও শিশুর মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং সম্মান রক্ষার দায়িত্ব যে সমাজের প্রতিটি মানুষের, কুমারী পূজার দর্শন সেই কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।
কীভাবে শুরু হয়েছিল কুমারী পূজার এই ধারা: হিন্দুধর্মের শাক্ত উপাসনায় দেবীকে বিশ্বজননী, সৃষ্টির উৎস ও শক্তির আধার হিসেবে কল্পনা করা হয়। সেই বিশ্বাস থেকেই কুমারী পূজার প্রচলন। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় কুমারীকে দেবীশক্তির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। বয়স, নাম, রূপ ও আচারসংক্রান্ত বিধান বিভিন্ন প্রথায় ভিন্ন হতে পারে। তবে মূল ভাবনা একটাই, নিষ্পাপ কুমারীর মধ্যে দেবীশক্তিকে উপলব্ধি করে শ্রদ্ধা নিবেদন।
স্বামী বিবেকানন্দের জীবনে কুমারী পূজার বিশেষ দৃষ্টান্ত রয়েছে। ১৮৯৮ সালে কাশ্মীর ভ্রমণের সময় তিনি কুমারী পূজা করেছিলেন বলে রামকৃষ্ণ ভাবধারার ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে বেলুড় মঠে দুর্গাপূজার প্রচলনের সঙ্গে কুমারী পূজাও বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে শাক্ত উপাসনার ঐতিহ্য এবং নারীকে মাতৃজ্ঞানে দেখার ভাবধারা নতুন তাৎপর্য পায়। রামকৃষ্ণ মিশনের ধারায় কুমারী পূজার প্রধান আকর্ষণ হলো ভক্তি ও শ্রদ্ধার সঙ্গে একটি শিশুর মধ্যে দেবীভাব উপলব্ধি করা। এখানে শিশুটি শুধু পূজার আনুষ্ঠানিক কেন্দ্র নয়, বরং মানুষের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখার আধ্যাত্মিক উপলব্ধির প্রতীক।
চিরন্তন বার্তা: মানুষের মধ্যেই দেবীশক্তি: মহাষ্টমীর কুমারী পূজা ভক্তদের কাছে একদিকে গভীর আধ্যাত্মিক অনুভূতির, অন্যদিকে আত্মসমালোচনা ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চার উপলক্ষ। দেবী দুর্গার আরাধনার মধ্য দিয়ে মানুষ যেমন শক্তি, সাহস ও কল্যাণের প্রত্যাশা করে, তেমনি কুমারী পূজা তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় নারী ও শিশুর প্রতি সম্মান প্রদর্শন দৈনন্দিন জীবনেরও অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিমার সামনে প্রার্থনা, কুমারীর প্রতি শ্রদ্ধা এবং মানুষের কল্যাণ কামনা, এই তিনের মধ্যে যে যোগসূত্র রয়েছে, সেটিই কুমারী পূজার মূল তাৎপর্য।
মহাষ্টমীর এই আয়োজন তাই শুধু ধর্মীয় ঐতিহ্যের পুনরাবৃত্তি নয়; এটি নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা, শিশুর নিষ্পাপতার মর্যাদা এবং মানুষের মধ্যে কল্যাণ ও দেবত্ব উপলব্ধির এক অনন্য প্রকাশ। দেবী দুর্গার কাছে অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভবোধের জাগরণ কামনার মধ্য দিয়ে কুমারী পূজা শেষ হয়। কিন্তু এর শিক্ষা শেষ হয় না পূজামণ্ডপে। নারীকে সম্মান করা, শিশুকে নিরাপদ রাখা, দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হওয়া, এসবের মধ্য দিয়েই কুমারী পূজার অন্তর্নিহিত আদর্শ বাস্তব জীবনে অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।
বিআলো/অর্নব