পূজায় বা অন্য ধর্মের উৎসবে মুসলমানদের শুভেচ্ছা জানানোর ব্যাপারে শরিয়তের হুকুম কী?
উত্তর
ঢাকা উত্তরার জামিয়া ইমাম বুখারীর মুফতি ও মুহাদ্দিস সাইদুজ্জামান কাসেমি বলেন, বড়দিন কিংবা অন্য কোনো বিধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের শুভেচ্ছা জানানো আলেমদের সর্বসম্মত মতানুযায়ী হারাম।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যেম (রহ.) তার লিখিত ‘আহকামু আহলিয যিম্মাহ’ গ্রন্থে এ বিধানটি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, কোনো কুফরি আচার-অনুষ্ঠান উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানানো সর্বসম্মতিক্রমে হারাম। যেমন—তাদের উৎসব ও উপবাস পালন উপলক্ষে বলা যে, তোমাদের উৎসব শুভ হোক কিংবা তোমার উৎসব উপভোগ্য হোক কিংবা এ জাতীয় অন্য কোনো কথা। যদি এ শুভেচ্ছা জ্ঞাপন কুফরির পর্যায়ে নাও পৌঁছে, তবে এটি হারামের অন্তর্ভুক্ত।
এ শুভেচ্ছা ক্রুশকে সিজদা দেওয়ার কারণে কাউকে অভিনন্দন জানানোর পর্যায়ভুক্ত। বরং আল্লাহর কাছে এটি আরও বেশি জঘন্য গুনাহ। যাদের কাছে ইসলামের যথাযথ মর্যাদা নেই, তাদের অনেকে এ গুনাহে লিপ্ত হয়ে পড়ে; অথচ তারা এ গুনাহের কদর্যতা উপলব্ধি করে না। যে ব্যক্তি কোনো গুনাহের কাজ, বিদআত কিংবা কুফরি কর্মের প্রেক্ষিতে কাউকে অভিনন্দন জানায়, সে নিজেকে আল্লাহর ক্রোধ ও অসন্তুষ্টির সম্মুখীন করে।
ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উৎসব উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানানো হারাম ও এত জঘন্য গুনাহ (যেমনটি ইবনুল কাইয়্যেমের ভাষ্যে এসেছে) হওয়ার কারণ হলো, এ শুভেচ্ছা জানানোর মধ্যে কুফরি আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি স্বীকৃতি ও অন্য ব্যক্তির পালনকৃত কুফরির প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ পায়। যদিও ব্যক্তি নিজে এ কুফরি করতে রাজি না হয়। কিন্তু কোনো মুসলিমের জন্য কুফরি আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করা কিংবা এ উপলক্ষে অন্যকে শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করা হারাম। কেননা, আল্লাহ তাআলা কুফরির প্রতি সন্তুষ্ট নন। তিনি বলেন,
إِنْ تَكْفُرُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنْكُمْ وَلَا يَرْضَى لِعِبَادِهِ الْكُفْرَ وَإِنْ تَشْكُرُوا يَرْضَهُ لَكُمْ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى ثُمَّ إِلَى رَبِّكُمْ مَرْجِعُكُمْ فَيُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ
যদি তোমরা কুফরি কর, তবে (জেনে রাখ) আল্লাহ তোমাদের মুখাপেক্ষী নন। আর তিনি তার বান্দাদের জন্য কুফরি পছন্দ করেন না। আর যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও, তবে (জেনে রাখ) তিনি তোমাদের জন্য সেটাই পছন্দ করেন। [সূরা যুমার, আয়াত: ৭]
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। [সূরা মায়েদা, আয়াত: ৩]
অতএব, কুফরি উৎসব উপলক্ষে বিধর্মীদের শুভেচ্ছা জানানো হারাম; তারা সহকর্মী হোক কিংবা অন্য কেউ হোক।
আর বিধর্মীরা যদি আমাদেরকে তাদের উৎসব উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানায়, আমরা এর উত্তর দেব না। কারণ, সেটা আমাদের ঈদ-উৎসব নয়। আর এসব উৎসবের প্রতি আল্লাহ সন্তুষ্ট নন। যেহেতু আল্লাহ তাআলা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সমস্ত মানবজাতির কাছে ইসলাম ধর্ম দিয়ে পাঠিয়েছেন, যে ধর্মের মাধ্যমে পূর্বের সব ধর্মকে রহিত করে দেওয়া হয়েছে; এসব উৎসব সংশ্লিষ্ট ধর্মে অনুমোদনহীন নবসংযোজন হোক কিংবা অনুমোদিত—সবই রহিত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
‘আর কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ থেকে কবুল করা হবে না এবং সে হবে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।’ [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৮৫]
কোনো মুসলমানের জন্য এমন উৎসবের দাওয়াত কবুল করা হারাম। কেননা, এটি তাদের শুভেচ্ছা জানানোর চেয়ে জঘন্য। কারণ, এতে দাওয়াতকৃত কুফরি অনুষ্ঠানে তাদের সঙ্গে অংশগ্রহণ করা হয়।
অনুরূপভাবে, এ উপলক্ষকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মতো অনুষ্ঠান করা, উপহার বিনিময় করা, মিষ্টান্ন বিতরণ করা, খাবার-দাবার আদান-প্রদান করা, ছুটি ভোগ করা ইত্যাদি মুসলমানদের জন্য হারাম। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সঙ্গে সাদৃশ্য গ্রহণ করে, সে তাদেরই দলভুক্ত।
যে ব্যক্তি বিধর্মীদের এমন কোনো কিছুতে অংশগ্রহণ করবে, সে গুনাহগার হবে। এ অংশগ্রহণের কারণ সৌজন্য, হৃদ্যতা বা লজ্জাবোধ—যেটাই হোক না কেন। কেননা, এটি আল্লাহর ধর্মের ক্ষেত্রে আপসকামিতার শামিল। আর এটি বিধর্মীদের মনোবল শক্ত করা ও স্বধর্ম নিয়ে তাদের গর্ববোধ তৈরির কারণের অন্তর্ভুক্ত।
[মাজমুউ ফাতাওয়া ওয়া রাসায়িলিশ শাইখ ইবনে উছাইমীন, ৩/৩৬৯]
সূত্র: মুসলিম বাংলা