চৌকিদারের সুপারিশে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সনদ, সেই সনদের ভিত্তিতে উপজেলা প্রশাসনের প্রত্যয়ন—এরপর দলিত-হরিজন কোটায় নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) ভর্তি। শিক্ষার্থী আতিকুর রহমানের কোটায় ভর্তির জন্য ব্যবহৃত সনদ সংগ্রহের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, চৌকিদারের সুপারিশের ভিত্তিতে তিনি সনদ দিয়েছেন। আর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদের দেওয়া সনদের ভিত্তিতেই উপজেলা প্রশাসন প্রত্যয়নপত্র দিয়েছে।
প্রত্যয়নপত্রে উল্লেখিত তারিখ অনুযায়ী, আতিকুর রহমান ২০২৬ সালের ১০ মে চর কিং ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এবং ৯ জুন উপজেলা প্রশাসন থেকে দলিত-হরিজন সম্প্রদায়ভুক্তির প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করেন। নোবিপ্রবিতে ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে কোটায় ভর্তির নির্ধারিত সময়সীমা ছিল ৯ ও ১০ জুন। অর্থাৎ, ভর্তি কার্যক্রমের নির্ধারিত সময়সীমার প্রথম দিনেই উপজেলা প্রশাসনের প্রত্যয়নপত্রটি সংগ্রহ করা হয়।
গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় আবেদনের সময় এ ধরনের সনদ জমা দেওয়ার প্রয়োজন না হলেও কোটায় ভর্তির সময় তা জমা দিতে হয়। ফলে সনদ দুটি কখন এবং কী প্রক্রিয়ায় সংগ্রহ করা হয়েছে, সনদ দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ধরনের তথ্য যাচাই করেছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কমিটি কীভাবে সেগুলো গ্রহণ করেছে—এসব প্রশ্ন সামনে এসেছে।
চর কিং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাঈম উদ্দিন আহমেদ আতিকুর রহমানের সনদে থাকা স্বাক্ষরটি তার বলে নিশ্চিত করেছেন। সনদ দেওয়ার ভিত্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানান, স্থানীয় এক চৌকিদারের সুপারিশের ভিত্তিতে আতিকুরকে সনদ দিয়েছিলেন।
তবে চৌকিদার কী তথ্যের ভিত্তিতে সুপারিশ করেছিলেন, আতিকুরের সম্প্রদায়গত পরিচয় সম্পর্কে কোনো নথি বা প্রত্যক্ষ যাচাই করা হয়েছিল কিনা এবং সনদ দেওয়ার আগে এলাকায় কোনো অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
আতিকুর রহমানকে হরিজন সম্প্রদায়ভুক্ত উল্লেখ করে উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া প্রত্যয়নপত্রে ইউএনও রাসেল ইকবালের স্বাক্ষর রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আতিকুরকে সনদ দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে তার নামে সনদ দেওয়া হয়েছিল। সেটির ভিত্তিতেই উপজেলা প্রশাসন প্রত্যয়নপত্র প্রদান করেছে।
আতিকুর প্রকৃতপক্ষে হরিজন সম্প্রদায়ের কি না, সে বিষয়ে অভিযোগ এলে পুলিশি যাচাইয়ের মাধ্যমে পুনরায় যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ রয়েছে বলেও জানান ইউএনও।
উপজেলা প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদের সনদই ছিল প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার ভিত্তি। তবে প্রত্যয়নপত্র দেওয়ার আগে উপজেলা প্রশাসন আলাদাভাবে কোনো তদন্ত বা সরেজমিন যাচাই করেছিল কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি।
আতিকুর রহমান নোয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে ২০২৫ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় ঐচ্ছিক বিষয় ছাড়া জিপিএ ৪.৫৮ পেয়ে উত্তীর্ণ হন। পরে নোবিপ্রবির আইন বিভাগে ভর্তি হন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি-সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার ‘বি’ ইউনিটে সাধারণ মেধাতালিকা থেকে আইন বিভাগে ভর্তির সুযোগ শেষ হয় ৪৫৪তম মেধাক্রম পর্যন্ত।
অন্যদিকে, আতিকুর রহমানের মেধাক্রম ছিল ২৭ হাজার ৯৯০। তিনি দলিত ও হরিজন কোটার সুবিধায় আইন বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিভাগটিতে এ কোটায় তার মেধাক্রম ছিল দ্বিতীয় সর্বনিম্ন।
আতিকুরের পরিবার সম্পর্কে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার বক্তব্যও সামনে এসেছে। তাদের দাবি, পরিবারটির আর্থিক অবস্থা ভালো এবং পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন পেশায় যুক্ত। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আতিকুরের বাবা হাসান শিক্ষকতা করতেন এবং ২০০৫ বা ২০০৬ সালের দিকে মারা যান।
পরে তার মা জোছনা বেগম আতিকুরের চাচাকে বিয়ে করেন, যিনি বর্তমানে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য। আতিকুরের এক ভাই বাংলাদেশ পুলিশে কর্মরত এবং আরেক ভাই নোয়াখালী সরকারি কলেজে পড়াশোনা করেন বলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
এক স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করেন, পরিবারটির আর্থিক অবস্থা কখনো খারাপ ছিল না। আতিকুরের মা পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেছেন—এমন দাবির সঙ্গেও তিনি দ্বিমত পোষণ করেন। দীর্ঘদিন ধরে ঐ এলাকায় বসবাস করা আরো এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, গ্রামে এমন একটি সম্ভান্ত্র পরিবারের কেউ যদি বাজারের পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ করতো তাহলে গ্রামে প্রচুর আলোচনা-সমালোচনা হতো। আমি তার পরিবারকে দীর্ঘদিন ধরে চিনি এবং তার পরিবারে এমন কোনো ঘটনা কখনো ঘটেনি।
তবে এসব বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এছাড়াও আতিকুর রহমান হাতিয়া উপজেলা তারেক জিয়া সাইবার ফোর্সের সহ-সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত আছেন।
সনদগুলো আগে সংগ্রহ না করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময়ই কেন দলিত-হরিজন কোটা ব্যবহার করেছেন এবং পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়ে স্থানীয়দের বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে আতিকুর রহমান বলেন, ‘আমি ২০২৫-২৬ সেশনে দলিত ও হরিজন কোটায় ভর্তি হয়েছি। ২০০৫ বা ২০০৬ সালের দিকে আমার বাবা মারা যাওয়ার পর আমার আম্মু প্রায় ৫-৬ মাস পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেছিলেন।’
তিনি বলেন, ‘ভর্তির সময় নিয়ম অনুযায়ী আবেদনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র আমি জমা দিয়েছি। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের নিয়ম অনুযায়ী ভেরিফিকেশন (যাচাই-বাছাই) সম্পন্ন করেই আমার ভর্তি নিশ্চিত করেছে।’
এর আগে দলিত-হরিজন সম্প্রদায়ের সনদ বা কোটা ব্যবহার করে অন্য কোথাও কোনো সুযোগ-সুবিধা কিংবা সরকারি অনুদান নিয়েছেন কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কোটা বা সনদ দিয়ে আমি এর আগে অন্য কোথাও কোনো সুযোগ-সুবিধা বা সরকারি কোনো অনুদান নিইনি। এই প্রথম শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্যই এটি ব্যবহার করেছি। আগে কখনো আমার এটার প্রয়োজন ছিল না, তাই নিইনি।’
নোবিপ্রবির গুচ্ছ ভর্তি-সংক্রান্ত কোটা যাচাই কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. আশরাফুল আলম বলেন, নীতিমালায় দলিত-হরিজন সম্প্রদায়ভুক্তির প্রমাণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের সনদ অথবা জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের কাছ থেকে নেওয়া প্রত্যয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ ছিল।
একাধিক কর্তৃপক্ষের সনদ গ্রহণযোগ্য হওয়ায় কেউ স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে সনদ সংগ্রহ করলে তা প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নোবিপ্রবির আইন বিভাগের চেয়ারম্যান মো. শফিউল্লাহ বলেন, গুচ্ছ ভর্তি কার্যক্রম সরাসরি বিভাগ পরিচালনা করে না। কেন্দ্রীয় ভর্তি কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে শিক্ষার্থীদের তালিকা পাঠায় এবং সেই তালিকার ভিত্তিতেই বিভাগে ক্লাস শুরু হয়।
চৌকিদারের সুপারিশের ভিত্তিতে সনদ দেওয়ার কথা সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নিজেই স্বীকার করেছেন। উপজেলা প্রশাসনও জানিয়েছে, ইউনিয়ন পরিষদের সনদের ভিত্তিতেই আতিকুর রহমানের নামে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এক কর্তৃপক্ষের সনদের ভিত্তিতে আরেক কর্তৃপক্ষ প্রত্যয়ন দিয়েছে। কিন্তু আতিকুরের সম্প্রদায়গত পরিচয় নিশ্চিত করতে কী ধরনের স্বতন্ত্র যাচাই করা হয়েছিল, তা সংশ্লিষ্ট বক্তব্যে স্পষ্ট হয়নি। এতে সনদ প্রদানের প্রক্রিয়া এবং কোটায় ভর্তির যোগ্যতা যাচাইয়ের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
