পর পর দুটি বিয়ে বিচ্ছেদের পর গত তিন বছর আগে জীবিকার উদ্দেশ্যে সুইটি আক্তার (২৫) পাড়ি জমান সৌদি আরবে। এক সপ্তাহ আগে মাকে ফোন করে বলেছিলেন দুই মাস পর দেশে আসার কথা। এরই মধ্যে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির শিরচ্ছেদের খবর ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
সরকারি কোনো মাধ্যমে নিশ্চিত না হলেও ইতোমধ্যে পরিবার বুঝতে পারে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নারীই তাদের মেয়ে সুইটি।
জানা গেছে, সুইটি আক্তার টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মহেড়া ইউনিয়নের নগর ছাওয়ালী গ্রামের ফজল মিয়ার মেয়ে।
এখন চরম উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে স্বজনদের। তবে সুইটি আক্তারের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পরিবার পায়নি।
মঙ্গলবার সুইটির গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, মেয়ের ছবি বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন মা। আর নির্বাক বাবা তাকিয়ে আছেন মেয়ের ফিরে আসার অপেক্ষায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া শিরচ্ছেদের খবর তাদের মনে তৈরি করেছে গভীর শঙ্কা।
সুইটি আক্তার বেঁচে আছেন, নাকি তার পরিণতি হয়েছে ভয়াবহ কিছু এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পরিবার।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় উপজেলার তরফপুর গ্রামে সুইটির প্রথম বিয়ে হয়। এক বছরের মাথায় ওই বিয়ে বিচ্ছেদ হয়। এর এক বছর পর উপজেলার হিলড়া গ্রামে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয়। ধার দেনা করে ওই স্বামীকে সৌদি আরবে পাঠায় সুইটির পরিবার। সৌদিআরব গিয়ে ছয় মাস পর থেকে সুইটির সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন তার স্বামী। পরে দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গেও বিবাহ বিচ্ছেদ করেন তিনি।
এরপর ২০২৩ সালে জীবিকার সন্ধানে স্থানীয় দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে পাড়ি জমান সুইটি আক্তার। পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজের কথা বলে তাকে পাঠানো হয় বলে দাবি স্বজনদের। এজন্য দালাল নতু মিয়াকে দেড় লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তারা।
তারা আরও জানান, সৌদি আরবের মক্কায় আল মাজাল আল আরবি গ্রুপ কোম্পানিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। দেশটিতে পৌঁছানোর প্রায় ছয় মাস পর গ্রেপ্তার হন তিনি। তবে গ্রেপ্তারের খবর পরিবার জানতে পারে প্রায় এক বছর পর। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে সুইটিই তাদের আটকের বিষয়টি জানান। সুইটি পরিবারকে মারামারি মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে বললেও প্রবাসে থাকা তার এক বান্ধবী পরিবারকে জানায় এক বাংলাদেশি যুবকের সঙ্গে সম্পর্কের জেরে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৩ অক্টোবর সকালে পরিবারের সঙ্গে সর্বশেষ যোগাযোগ করেন সুইটি। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, দুই মাস পর দেশে ফিরবেন। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিরচ্ছেদের খবর ও ছবি ছড়িয়ে পড়লে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। এখন মেয়ের কোনো নির্ভরযোগ্য খবরের অপেক্ষায় দিন কাটছে মা-বাবার।
পরিবারের ও স্থানীয়দের দাবি, সুইটি আক্তার জীবিত থাকলে তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক। আর তার মৃত্যুর খবর সত্য হলে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হোক।
প্রতিবেশী বিদ্যুৎ সাহা বলেন, ‘সুইটির কি অপরাধ ছিল, আমরা জানি না। তবে সৌদি সরকারের এভাবে শিরচ্ছেদ করা ঠিক হয়নি।’
সুইটি মা জহুরা বেগম বলেন, ‘আমার সুইটিরে আইনা দাও তোমরা। ব্যাইচা থ্যাক বা মইরা যাক আমার মেয়েরে আমার কাছে আন। আমার মেয়ে মক্কায় বয়স্ক মানুষের সেবা করত। সে ঝগড়া করেনা। অন্য মেয়েরা ঝগড়া করছে, তহন সুইটিরেও ধইরা নিছে।’
সুইটির বাবা ফজল মিয়া বলেন, ‘আমি ভ্যান চালিয়ে কষ্ট কইরা কামাই করি। সুখের আশার ধার দেনা কইরা মেয়েকে বিদেশে পাঠাইছি। ছয় মাস ভালই কাজ কাম করল। তারপর থ্যাইকা আর খবর পাইনা। অন্য সাইটে ঝগড়া হইছে আর পুলিশ আমার মেয়েরে ধইরা নিছে।’
এদিকে মির্জাপুর থানার ভারপ্রপাত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লা আল মামুন জানান, এ ব্যাপারে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে খবরটি ছড়িয়ে পড়ায় পুলিশ সুইটির বাড়িতে গিয়ে খোঁজ খবর নেওয়ার চেষ্টা করছে।
উপজেলার নির্বাহী অফিসার জহিরুল আলমের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘সরকারিভাবে এ বিষয়ে আমরা কোনো তথ্য পাইনি। তাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি শুনেছি। এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে।’
