ডিপি ওয়ার্ল্ডের চুক্তিতে বন্দরের দক্ষতা ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির প্রত্যাশা ব্যবসায়ীদের
-
বাসস: - আপডেট সময় ০৮:৩৭:৪২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের চুক্তিতে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী নেতারা।
তাদের মতে, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো গেলে পণ্য খালাসে বিলম্ব কমবে, আমদানি-রপ্তানি ব্যয় হ্রাস পাবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরো শক্তিশালী হবে।
ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো শুধু বন্দর ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, বরং শিল্পায়ন, রপ্তানি সম্প্রসারণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। বন্দরে জাহাজ ও কনটেইনারের দীর্ঘ অপেক্ষা কমানো গেলে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ব্যয় সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে পণ্য সরবরাহে গতি আসবে, রপ্তানি আদেশ সময়মতো পূরণ করা সহজ হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের বাণিজ্য অবকাঠামো সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হবে।
ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক ফজলুল হক বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান। তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালন দক্ষতা বাড়ানো গেলে আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিনি বলেন, বন্দরের নিজস্ব আয় বাড়ানোর চেয়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি কতটা লাভবান হচ্ছে, সেটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষ বন্দরসেবার মাধ্যমে আমদানি ব্যয় কমানো, রপ্তানি বাড়ানো এবং পণ্য পরিবহনে সময় সাশ্রয় করা সম্ভব হলে ব্যবসায়িক ব্যয়ও কমবে। এতে দেশের উৎপাদক, আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকরা উপকৃত হবেন।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে বিনিয়োগ অন্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও উৎসাহিত করবে বলে মনে করেন ফজলুল হক। তার মতে, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা সম্পর্কে বিশ্ববাজারে ইতিবাচক বার্তা দেবে। তবে উন্নত সেবার নামে বন্দর ব্যবহারকারীদের ওপর অযৌক্তিক মাশুলের চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়। সেবার মান বাড়ানোর পাশাপাশি পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধির সুফল ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছাতে হবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারের চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এ উদ্যোগের ফলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে, পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হবে এবং দেশের অর্থনীতি আরো গতিশীল হবে।
মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বন্দরের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো গেলে পরিচালন ব্যয় কমিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হবে। এতে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কেবল বিরোধিতার জন্য সরকারের কোনো উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত না করে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্ট সবার গঠনমূলক ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।
চুক্তিতে দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো বিষয় থাকলে তা সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যৌক্তিক আপত্তি থাকলে সরকার তা নিয়ে আলোচনা করতে পারে। ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ও অংশীজন হিসেবে যুক্তিসংগত দাবির পক্ষে অবস্থান নেবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বৃদ্ধির অর্থনৈতিক গুরুত্ব বোঝা যায় আন্তর্জাতিক তুলনামূলক চিত্র থেকে। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের ৪০০ বন্দরের মধ্যে দক্ষতা সূচকে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৩৬৪তম। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বন্দরে একটি জাহাজকে পণ্য খালাসের জন্য তিন দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। অথচ সমসাময়িক অনেক বন্দরে এ সময় ১৫ থেকে ২৪ ঘণ্টা। চট্টগ্রাম বন্দরে একটি কনটেইনারের অবস্থানকাল প্রায় ৯ দিন, যেখানে তুলনীয় বন্দরে তা সর্বোচ্চ আড়াই দিন।
জাহাজ ও কনটেইনারের দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, এ বিলম্বের কারণে প্রতিদিন প্রায় ১০ কোটি টাকা এবং বছরে প্রায় ৩ হাজার ৬৫০ কোটি টাকার সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বন্দরে কনটেইনারের অবস্থানকাল এক দিন কমানো সম্ভব হলে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়তে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে এনসিটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। বন্দরের মোট কনটেইনার ওঠানামার প্রায় ৪৪ থেকে ৪৫ শতাংশ এ টার্মিনালের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। ফলে এনসিটির পরিচালন দক্ষতা বাড়ানো গেলে বন্দরের সামগ্রিক সক্ষমতা উন্নয়নের পাশাপাশি দেশের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমেও গতি আসতে পারে।
সরকার এনসিটি পরিচালনার জন্য দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি করেছে। চুক্তি অনুযায়ী, জাহাজের আগমনের সময়সূচি সমন্বয়, প্রয়োজনীয় সরবরাহ ও পণ্য পরিবহনের প্রস্তুতি, জাহাজ থেকে কনটেইনার খালাস, ইয়ার্ডে সংরক্ষণ এবং শুল্কায়নসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে দ্রুত কনটেইনার টার্মিনাল থেকে বের করে দেওয়ার ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালন করবে প্রতিষ্ঠানটি। রপ্তানির জন্য আসা কনটেইনার পরিচালনাও এর আওতাভুক্ত।
আধুনিক যন্ত্রপাতি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও উন্নত পরিচালন পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে কনটেইনার জট কমানো এবং পণ্য খালাসের সময় কমানো এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। বন্দরের কার্যক্রমে সময় সাশ্রয় হলে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের পণ্য পরিবহন, সংরক্ষণ এবং জাহাজের অপেক্ষার পেছনে অতিরিক্ত ব্যয় কমতে পারে। দ্রুত পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের নির্ভরযোগ্যতাও বাড়বে।
চুক্তির আর্থিক শর্ত অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে এককালীন প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম দেবে। পণ্য ওঠানামা থেকে অর্জিত মোট রাজস্বের ৬৭ শতাংশ পাবে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এটি নিট মুনাফার অংশ নয়; পরিচালন ব্যয় বাদ দেওয়ার আগের মোট রাজস্বের অংশ। এছাড়া প্রথম ১০ বছরে টার্মিনালের আধুনিকায়ন ও উন্নয়নে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ এবং প্রতি বছর ন্যূনতম ১০ কোটি টাকা প্রদানের শর্ত রয়েছে।
ডিপি ওয়ার্ল্ড বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৬০টির বেশি বন্দর ও টার্মিনাল পরিচালনা করে। সমুদ্রবন্দরের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি অভ্যন্তরীণ টার্মিনাল ও সরবরাহব্যবস্থার ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, কনটেইনার ব্যবস্থাপনা ও পণ্য পরিবহনে প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এনসিটির পরিচালন দক্ষতা এবং সেবার মান উন্নত করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চুক্তির বিষয়ে সহযোগিতামূলক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম ফজলুল হক। তিনি বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থা রেখে দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থে সহযোগিতা করাই ব্যবসায়ীদের মূল লক্ষ্য। সরকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিষয়ে চিন্তাভাবনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মনে করেন তিনি। সরকারের উদ্যোগ বাস্তবায়নে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে যেতে চান ব্যবসায়ীরা।
বেই-বার্থ মেরিটাইমের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা রাসেল মাহমুদ বলেন, দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে পণ্য দ্রুত সরবরাহ করা গেলে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়বে, আমদানি ব্যয় কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা শক্তিশালী হবে। তার মতে, এনসিটিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ। বন্দরের বর্তমান সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, কনটেইনার জটের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং দ্রুত আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম নিশ্চিত করার প্রয়োজন বিবেচনায় এ চুক্তি বন্দরের আধুনিকায়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধির একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ।
চুক্তিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট মেয়াদে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া মানেই বন্দরের মালিকানা হস্তান্তর নয়। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এ চুক্তির আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ড এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবে; চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মালিকানা ও সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ বহাল থাকবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, সেবার মান উন্নয়ন, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বন্দরের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর। এসব ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করা গেলে জাহাজ ও কনটেইনারের অপেক্ষার সময় কমানো, ব্যবসায়িক ব্যয় হ্রাস এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের বন্দর অবকাঠামো আধুনিকায়ন এবং ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
ট্যাগস :
