দেশের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) নিয়ে প্রথমবারের মতো সম্মেলন আয়োজন করতে যাচ্ছে সরকার। আগামী ১ ডিসেম্বর রাজধানীর চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘উপজেলা নির্বাহী অফিসার সম্মেলন ২০২৬’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দিনব্যাপী এই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। গতকাল এ-সংক্রান্ত সারসংক্ষেপে সম্মতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একাধিক সূত্র তথ্যটি নিশ্চিত করেছে।
উপজেলা পর্যায়ে সরকারের নীতি ও অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন, উন্নয়ন কর্মসূচির অগ্রগতি ত্বরান্বিত এবং
নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মাঠ প্রশাসনের ভূমিকা আরও কার্যকর করাই এ সম্মেলনের মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে সরকারি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যা, চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাঠ প্রশাসন সমন্বয় অধিশাখা থেকে প্রধানমন্ত্রীর জন্য তৈরি করা সারসংক্ষেপে সম্মেলন আয়োজনের এ পরিকল্পনার কথা উল্লেখ রয়েছে।
প্রথমবারের মতো ইউএনও সম্মেলন আয়োজনের উদ্যোগ মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানোর একটি পদক্ষেপ। সম্মেলনে মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো কতটা গুরুত্ব পায় এবং সেগুলোর সমাধানে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তার ওপরই এ উদ্যোগের কার্যকারিতা অনেকটা নির্ভর করবে।
ডিসি সম্মেলনের আদলে ইউএনও সম্মেলন
প্রতিবছর জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তারা সরকারের মন্ত্রী ও সচিবদের সামনে তাদের বিভিন্ন সমস্যা, চ্যালেঞ্জ ও প্রস্তাব তুলে ধরেন। পরে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগ সেসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এবার একই ধরনের সুযোগ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের জন্য তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশে বর্তমানে ৫০৩টি উপজেলা রয়েছে। এসব উপজেলায় সরকারের বিভিন্ন নীতি ও উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং জনসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইউএনওরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে এর আগে ইউএনওদের নিয়ে এ ধরনের সম্মেলন আয়োজন করা হয়নি।
গত ৩ অক্টোবর রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে সমবায় ভবনের মাল্টিপারপাস হলরুমে স্থানীয় সরকার বিভাগের এক সভায় ইউএনওদের নিয়ে সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব দেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকরা যেভাবে সম্মেলনে মাঠ প্রশাসনের সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন, একইভাবে ইউএনওরা তাদের কর্মক্ষেত্রের সমস্যা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা তুলে ধরতে পারলে সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করার কথাও জানিয়েছিলেন তিনি।
আলোচনায় থাকবে সরকারের অগ্রাধিকার
প্রধানমন্ত্রীর জন্য তৈরি সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, সম্মেলনে উপজেলা পর্যায়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার ও উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কার, ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন, দারিদ্র্য বিমোচন, কৃষি উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি।
এ ছাড়া নাগরিক সেবা প্রদান, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি এবং মাঠ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেতে পারে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণসহ স্থানীয় পর্যায়ে সরকারের নীতি বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ও সম্মেলনের আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। সম্মেলনে ইউএনওরা তাদের কর্মক্ষেত্রে যেসব প্রশাসনিক জটিলতা ও বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হন, সেগুলো তুলে ধরার সুযোগ পেতে পারেন। এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের করণীয় নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
দিকনির্দেশনা দেবেন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবরা
সম্মেলনে স্থানীয় সরকার, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র, ভূমি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ, স্বাস্থ্যসেবা, সমাজকল্যাণ এবং ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব বা সচিবদের অংশগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। তারা নিজ নিজ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনা দিতে পারেন।
সরকারের নীতি ও উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় স্থানীয় বাস্তবতা, জনবলসংকট, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার মতো বিষয় সামনে আসে। সম্মেলনে এসব সমস্যা সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর পক্ষে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া সহজ হতে পারে।
সততা ও কর্মদক্ষতার ওপর গুরুত্ব
গত ৩ অক্টোবরের সভায় জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারি মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সততা ও কর্মদক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের পদায়ন ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সততা ও কর্মদক্ষতাকে প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিজেদের কর্মস্থলকে আপন এলাকা মনে করে আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম মাদক নিয়ন্ত্রণ ও দুর্নীতি কমাতে ইউএনওদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে দ্রুত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন। এসব বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় প্রস্তাবিত ইউএনও সম্মেলন মাঠ প্রশাসনের কাজের গতি, কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতা এবং জনসেবার মান নিয়ে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে।
