রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার চৈত্রকোল ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে নারী শিক্ষার উন্নয়ন ও স্থানীয় বেকারদের কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত চৈত্রকোল আদর্শ নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। বছরের পর বছর কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিদ্যালয়ের ভবনগুলো ভগ্নদশায় পরিণত হয়েছে। পরিত্যক্ত ভবন ও আশপাশের এলাকা আবর্জনার স্তূপ, গরু-ছাগলের বিষ্ঠা এবং ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টি বন্ধ থাকায় এর পরিত্যক্ত ভবনগুলোতে গরু-ছাগল রাখা, তাস-জুয়া ও মাদকসেবীদের আড্ডাসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে। এমনকি শ্রেণিকক্ষগুলো পরিত্যক্ত থাকায় এবং দেখভালের দায়িত্বশীল লোক না থাকায় কক্ষগুলোতে মুরগির খামার চালু করা হয়েছিল, যা স্থানীয় লোকদের নিষেধাজ্ঞায় বন্ধ করতে বাধ্য হয়।
জানা গেছে, ২০০০ খ্রিস্টাব্দে চৈত্রকোল গ্রামের মো. শাহাজাহান আলী নারী শিক্ষার উন্নয়ন ও স্থানীয় বেকারদের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি প্রতিষ্ঠানটির নামে ৩৪ শতাংশ জমি দান করেন। প্রতিষ্ঠার পর প্রথম ৩-৪ বছর বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালিত হলেও পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীর অভাব ও অনুকূল পরিবেশ না থাকায় কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্থবির হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, দীর্ঘ ১৫ থেকে ২২ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রয়েছে। তবে বিদ্যালয়টি ঠিক কোন সময় থেকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়েছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
বিদ্যালয়টির EIIN নম্বর ১২৭৮৭২ হলেও বর্তমানে সেটি স্থগিত রয়েছে বলে জানা গেছে। অনলাইনে INSTITUTE SEARCH-এ প্রতিষ্ঠানটির তথ্য খুঁজতে গেলে ‘No Institute Data Found’ প্রদর্শিত হয়।
সরেজমিনে বিদ্যালয়ের বেহাল চিত্র
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিদ্যালয়ের ভবনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানের কোনো সাইনবোর্ড বা নামফলক চোখে পড়েনি। ভবন ও আশপাশের স্থানে ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে রয়েছে। কোথাও গরু-ছাগলের বিষ্ঠা, আবার কোথাও আবর্জনার স্তূপ দেখা গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়টি দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় এর ভবনগুলো বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অনুসন্ধানে, চৈত্রকোল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোখছেদ আলী বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২০ বছর ধরে কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।’
ওই এলাকার ইউপি সদস্য তোজাম্মেল হক বলেন, ‘বিদ্যালয়টি ১৫-২০ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। শিক্ষকরা বর্তমানে নিজেদের পেশায় নিয়োজিত আছেন।’
বিদ্যালয়টির সাবেক শিক্ষার্থী বৃষ্টি খাতুন বলেন, ‘আমি ওই স্কুলে লেখাপড়া করেছি। ২০০৩ সালের দিকে তখন থেকেই বিদ্যালয়টি বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে আমি এক সন্তানের জননী। ঢাকায় থাকি, বেড়াতে এসে আজও বিদ্যালয়টি বন্ধ অবস্থায় দেখছি।’
এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির জমিদাতা মো. শাহাজাহান আলীর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নারী শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ও জনস্বার্থে আমি সম্পত্তি দান করেছিলাম। কিন্তু আমার সেই উদ্দেশ্য পূরণে প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। বিদ্যালয়টি দীর্ঘ ২২-২৩ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানটির ঘরগুলোতে বিভিন্ন অনৈতিক কার্যক্রম চলছে, যা আমার উদ্দেশ্য ও জনস্বার্থের পরিপন্থী।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে প্রতিষ্ঠানের ৩৪ শতাংশ জমি আমার নামে উপজেলা ভেন্ডাবাড়ি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের জে.এল. নম্বর চৈত্রকোল-১১, হোল্ডিং নম্বর ২৫-৭৯৩, খতিয়ান নম্বর ২৫-৭৯৩ ও দাগ নম্বর ১০৫৩-এ রয়েছে। ডি.সি.আর.-এর মাধ্যমে উক্ত জমির মালিক হিসেবে সরকারের নির্ধারিত বকেয়া খাজনাসহ পরিশোধ করেছি।’
শাহাজাহান আলী জানান, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় এবং দানের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত না হওয়ায় তিনি জমিটি ফেরত পাওয়ার জন্য বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে আবেদন করেছেন। জনস্বার্থ ও দানের উদ্দেশ্যের পরিপন্থী অবস্থার অবসান ঘটাতে আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে জমিটি তাঁর কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য সরকারের সদয় বিবেচনা কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহমান বলেন, ‘চৈত্রকোল নিম্নমাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম বন্ধ থাকায় প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে দাপ্তরিকভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।’
