চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় দুবাইভিত্তিক বৈশ্বিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর বন্দরের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি ও সেবার মান উন্নয়নের প্রত্যাশা করছেন ব্যবসায়ীরা। তবে চুক্তির পরও শ্রমিক-কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন চুক্তির শর্তাবলি প্রকাশ, শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা এবং জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছে।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, প্রাইভেট টার্মিনাল যত বেশি আসবে, ততই দেশের জন্য ভালো। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনায় এন-সিটির দক্ষতা বাড়বে এবং সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি কমবে। তবে দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় যেন না বাড়ে, সেদিকে নজর রাখার তাগিদ দেন তিনি।
চট্টগ্রাম বন্দরের পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালের উদাহরণ দিয়ে আমিরুল হক বলেন, সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল (আরএসজিটি) সেখানে দক্ষতার সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫৮টি কনটেইনার, যা ৮২ টিইইউর সমতুল্য, হ্যান্ডলিংয়ের রেকর্ড করেছে বলে জানান তিনি।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ মনে করেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানের একটি প্রতিষ্ঠানের আগমন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করবে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এনসিটি পরিচালনা করা হলে আমদানি-রপ্তানিসহ দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসতে পারে।
ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়লে জাহাজের অপেক্ষার সময়, পণ্য খালাসে বিলম্ব, ডেমারেজ মাশুল ও পরিবহন ব্যয় কমবে। এতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে।
শ্রমিক সংগঠনের বিরোধিতা
এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তরের বিরোধিতা করে আসছে শ্রমিক-কর্মচারীদের বিভিন্ন সংগঠন। শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ), বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ ও বন্দর রক্ষা কমিটিসহ কয়েকটি সংগঠন গত প্রায় দুই বছর ধরে এ বিষয়ে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরও তাদের বিরোধিতা অব্যাহত রয়েছে।
শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার চুক্তিটিকে দেশের স্বার্থবিরোধী উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার কথা জানিয়েছেন। শ্রমিকদের স্বার্থ সুরক্ষায় সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করারও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক হুমায়ুন কবীর জানিয়েছেন, তাঁরা এনসিটি চুক্তি বাতিল চান। পাশাপাশি শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
চুক্তির প্রতিবাদে বন্দর রক্ষা কমিটি আজ সোমবার (১২ অক্টোবর) বন্দর ওয়ান স্টপ সার্ভিস ভবনের সামনে গণঅনশনের ডাক দিয়েছে। সংগঠনটি শ্রমিক, কর্মচারী, রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষকে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা বলেছেন, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষতা কিংবা বিদেশি বিনিয়োগের বিরোধিতা তাঁদের মূল অবস্থান নয়। তাঁদের দাবি, বন্দর পরিচালনায় পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, রাজস্ব আয়, শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও অধিকার এবং বন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
১৫ বছরের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব
গত ৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ১৫ বছরের চুক্তি করেছে ডিপি ওয়ার্ল্ড।
জানা যায়, নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে চুক্তির মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা না হলে মেয়াদ বাড়ানো কার্যকর হবে না। সে ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ মেয়াদ বাড়ানোর আলোচনা থেকে সরে আসতে পারবে।
চুক্তি অনুযায়ী, শুরুতেই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি দেবে ডিপি ওয়ার্ল্ড। এ ছাড়া টার্মিনালের আধুনিকায়নে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বন্দরের রাজস্ব সুরক্ষায় ন্যূনতম কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও (মিনিমাম ভলিউম গ্যারান্টি) রাখা হয়েছে।
ইনভেস্ট বাংলাদেশ সূত্র জানায়, টার্মিনালের গড় আয়ের ভিত্তিতে প্রতি টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ রয়্যালটি বা রাজম্বের অংশ পাবে। এর পাশাপাশি অপারেটরকে প্রতিবছর নির্ধারিত ফি দিতে হবে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে বন্দরের রাজস্ব আয় সুরক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চুক্তিতে পরিচালন দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রাও (কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটর) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মধ্যে ট্রাকের বন্দরে অবস্থানের সময় কমানো এবং ক্রেনের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মতো বিষয় রয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা টানা তিন মাস অর্জন করতে ব্যর্থ হলে অপারেটরের ওপর আর্থিক জরিমানা আরোপের বিধান রাখা হয়েছে।
এছাড়া বন্দরের কর্মচারীদের চাকরি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সুরক্ষায় চুক্তিতে নির্দিষ্ট ধারা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। টার্মিনালের কার্যক্রমে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কার্যকর পরিচালনাগত তদারকিও অব্যাহত থাকবে পুরো টার্মিনাল এলাকায় সার্বক্ষণিক সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা বহাল রাখার পাশাপাশি অপারেটরকে প্রতি সপ্তাহে ও প্রতি মাসে নির্ধারিত ছকে বিস্তারিত পরিচালনাগত তথ্য জমা দিতে হবে। এসব প্রতিবেদনে জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ের হিসাব, কনটেইনার পরিচালনার তথ্য ও মোট আয়ের বিবরণ থাকবে। এর মাধ্যমে টার্মিনালের কার্যক্রম, উৎপাদনশীলতা ও রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে পারবে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দর আধুনিকায়নে সরকারের উদ্যোগ
দেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক সংযোগ জোরদারে সরকার আন্তর্জাতিক মানের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করছে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন, সেতু ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
গতকাল রোববার রাজধানীর একটি হোটেলে ‘সেমিনার অন বাংলাদেশ ন্যাশনাল পোর্ট স্ট্র্যাটেজি ২০২৬’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডসহ বিশ্বের শীর্ষ পাঁচটি কনটেইনার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের তিনটিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়েছে। বাণিজ্যকে সহজ ও লাভজনক করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
মন্ত্রী বলেন, জাতীয় বন্দর ব্যবস্থাপনা কৌশল আরও আগেই প্রণয়ন করা উচিত ছিল। তবে তা হতে হবে জাতির বৃহত্তর স্বার্থকে সামনে রেখে। ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগের পরিবর্তে রাষ্ট্রের স্বার্থে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
The post এনসিটি নিয়ে ব্যবসায়ীদের আশা, শ্রমিকদের আপত্তি appeared first on সুপ্রভাত বাংলাদেশ.
