Published on
:
2 min read
সুশান্ত বণিক, আসানসোল
একই শহর। কিন্তু পাশাপাশি দুই এলাকার ছবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এক দিকে দুর্গাপুজো নিয়ে উৎসাহের জোয়ার। অন্য দিকে আয়োজন সাদামাটা। পুরোনো দিনের স্মৃতি উঁকি দিয়ে যায়। বার্নপুর ইস্কো করাখানার শ্রমিক-কর্মীদের এ বারের পুজোয় যুক্ত হয়েছে বাড়তি আনন্দ। সম্প্রসারণ প্রকল্পে বিনিয়োগ হচ্ছে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। কয়েকশো নতুন নিয়োগ হয়েছে। কমবেশি ৪০ হাজার টাকা বোনাসও মিলেছে। ফলে পুজো ঘিরে উচ্ছ্বাসের মাত্রা অনেকটা বেশি। এবি টাইপ আবাসনের পুজো কমিটির সম্পাদক বাপি চট্টোপাধ্যায় বলছেন, ‘আমাদের পুজো এ বার সবার থেকে আলাদা।’ এবি টাইপ আবাসনের মণ্ডপ এবং আলোকসজ্জায় তা আরও স্পষ্ট।
মাত্র দেড় কিলোমিটার দূরে বার্নপুরের ওয়াগন কলোনির কর্মী আবাসন। সেখানে দুর্গাপুজো ঘিরে ছবিটা একেবারে উল্টো। কোনওক্রমে পুজোর আয়োজন হয়েছে। পুজো কমিটির সম্পাদক কারখানার প্রাক্তন কর্মী নওল কিশোর রাম জানাচ্ছেন, এখানকার পুজো ৮০ বছরের পুরোনো। অথচ ২০১৮-তে কারখানা বন্ধ হওয়ার পরেই সবকিছু ম্লান হতে শুরু করেছে। যত দিন কারখানা খোলা ছিল, শ্রমিক এবং কর্মীরা একদিনের বেতন দিতেন এই পুজোর আয়োজনে। পুজোর চার দিন দেদার খাওয়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখর হয়ে থাকত এলাকা। নওল কিশোর বললেন, ‘প্রাক্তন কর্মীরা এখন নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী চাঁদা দেন। বাকিটা স্থানীয়দের থেকে সাহায্য মেলে। সেই টাকায় পুজো হয়।’ স্মৃতিরোমন্থন করেন আসানসোলের ধাদকা ব্লু ফ্যাক্টরি পুজোর উদ্যোক্তারা। ৫৭ বছর আগে পুজো শুরু হয়েছিল কারখানার কর্মী এবং আধিকারিকদের হাত ধরে। অফিসার্স ক্লাবের মাঠে তৈরি হতো মণ্ডপ। সেখানে আজও পুজো হয়, তবে আকার এবং আয়তনে অনেক ছোট এবং সাদামাটা। পুজো কমিটির সম্পাদক গৌতম মিশ্র জানালেন, মহালয়া থেকেই পুজো শুরু হতো, কিন্তু ২০১১-তে কারখানার ঝাঁপ পাকাপাকি ভাবে বন্ধ হওয়ার পরে পুজো হারিয়েছে তার জৌলুস।
গৌতম বললেন, ‘আবাসন এলাকায় বসবাসকারী প্রাক্তন শ্রমিক এবং কর্মীদের সামান্য চাঁদায় এখন পুজো হচ্ছে।’ এ বারও অফিসার্স ক্লাবের বারান্দায় চলছে মণ্ডপ তৈরির কাজ। প্রাক্তন কর্মী প্রকাশ শ্রীবাস্তব জানালেন, পুজো বন্ধ হোক, কেউই চাননি। তাই কষ্ট করেও তা চলছে। তবে সম্প্রতি রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল এই বন্ধ কারখানার জমিতে নতুন শিল্প গড়ার কথা বলার পরে এলাকার মানুষ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন, আবার হয়তো ফিরবে সুদিন। রূপনারায়ণপুরের হিন্দুস্তান কেবলস ওল্ড কলোনির পুজো এ বার ৭২ বছরে পড়েছে। একটা সময়ে কারখানার কর্মী এবং আধিকারিকরা নিজেদের বেতনের টাকার একটি অংশ দিয়ে এই পুজোর সূচনা করেছিলেন। কারখানা যত দিন চালু ছিল, পুজো ছিল রঙিন। পুজো কমিটির কোষাধ্যক্ষ, কারখানার প্রাক্তন কর্মী নবকুমার মাজিলা বললেন, ‘মেলা থেকে পঙক্তিভোজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এলাকা গমগম করত। এখন আর সে সব নেই। আবাসিকরা চান বলেই অতি সাধারণ ভাবে পুজো হয়।’
তিনি জানালেন, ২০১৭–য় কারখানা বন্ধ হতে অনেকেই এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছেন। তবে প্রত্যেক বছর পুজোর আগে চাঁদা পাঠিয়ে দেন। সেই টাকায় হয় পুজোর আয়োজন। আড়ম্বর নয়, অতীতের স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে দুর্গাপুজো করেন বন্ধ কারখানার প্রাক্তন শ্রমিকরা।
