ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনিতে মুখর হয়ে উঠেছে পাথরঘাটার বিভিন্ন পূজামণ্ডপ। বিজয়া দশমীতে দেবীর চরণে শেষ পুষ্পাঞ্জলি, দেবীবরণ ও সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। উৎসবের আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল বিদায়ের বিষাদ। ভক্তদের কণ্ঠে কণ্ঠে ধ্বনিত হয় চিরচেনা প্রত্যাশা—‘আসছে বছর আবার হবে’।
বুধবার (২১ অক্টোবর) বিজয়া দশমী উপলক্ষে পাথরঘাটার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানোর আয়োজন করা হয়। পাঁচ দিনের শারদীয় দুর্গোৎসবের শেষ দিনে সকাল থেকেই মণ্ডপগুলোতে ভক্তদের ভিড় দেখা যায়।
পাথরঘাটা সার্বজনীন কেন্দ্রীয় শ্রীশ্রী কালী মন্দির (কালীবাড়ি) ও কেন্দ্রীয় শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ মন্দির পূজামণ্ডপে সকাল থেকেই দেবীবরণে জড়ো হন শত শত নারী। বরণের থালায় ছিল সিঁদুর, পান, ফুল ও মিষ্টি। কেউ কেউ হাতে নেন শঙ্খ, প্রদীপ ও কলস। একে একে দেবীর মুখে মিষ্টি ছোঁয়ানো এবং চরণে সিঁদুর নিবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। পরে দেবীকে সিঁদুর পরিয়ে নারীরা একে অপরের কপাল ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন।
মন্দির দুটির পুরোহিত চিত্তরঞ্জন চক্রবর্তী জানান, সকাল ৮টা ৫ মিনিটে দশমীর পূজা শুরু হয়। এ সময় শ্যামা পূজা, অপরাজিতা পূজা ও দুর্গাপূজাসহ বিভিন্ন দেবদেবীর আরাধনা করা হয়। ধর্মীয় আচার শেষে দর্পণ বিসর্জন দেওয়া হয়। পরে ভক্তরা দেবীর চরণে শেষ পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করেন।
সিঁদুর খেলার তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, স্বামীর দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনায় বিবাহিত নারীরা এ আয়োজনে অংশ নেন।
সকাল ৯টার পর থেকে শুরু হয় সিঁদুর খেলা। বেলা ১০টার দিকে মন্দির প্রাঙ্গণে শত শত মানুষের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। একদিকে চলতে থাকে বিদায়ী আরতি ও শেষ অঞ্জলি, অন্যদিকে ঢাকের তালে নাচে-গানে মেতে ওঠেন দর্শনার্থীরা। নারী-পুরুষের পাশাপাশি তরুণ ও শিশুরাও উৎসবে অংশ নেয়। অনেক স্বামীকে তাঁদের স্ত্রীর কপালে সিঁদুর পরিয়ে পরিবারের মঙ্গল কামনা করতেও দেখা যায়।
স্বামীর সঙ্গে মন্দিরে আসা ভক্ত পূর্ণিমা রানী সরকার বলেন, মায়ের কাছে সবার সুস্থতা ও ভালো থাকার প্রার্থনা করেছেন তিনি। সবাই মিলে সিঁদুর খেলার আনন্দ উপভোগ করতে প্রতি বছর মন্দিরে ছুটে আসেন।
বন্ধুদের সঙ্গে নাচে-গানে মেতে ওঠা তরুণ কৌশিক সাহা বলেন, মা আবার ফিরে আসবেন—এই বিশ্বাস থেকেই তাঁরা বিদায়ের দিনটিকে আনন্দময় করে রাখার চেষ্টা করেন। তাঁদের প্রত্যাশা, ‘আসছে বছর আবার হবে’।
লাল-সাদা শাড়িতে সজ্জিত নারীরা ঢাকের তালে সিঁদুর খেলায় অংশ নেন। একে অপরের কপাল ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে তাঁরা স্বামীর দীর্ঘায়ু ও পরিবারের কল্যাণ কামনা করেন।
পূজামণ্ডপে আসা সুবর্ণা রানী সাথী বলেন, সারা বছর তাঁরা এই কয়েকটি দিনের জন্য অপেক্ষা করেন। দেখতে দেখতে উৎসবের দিনগুলো শেষ হয়ে যাওয়ায় মন খারাপ হচ্ছে। তবে তাঁর বিশ্বাস, মা দুর্গা সবাইকে বিপদ থেকে রক্ষা করবেন এবং আগামী বছর আবার ফিরে আসবেন।
আরেক ভক্ত মনিকা রানী সরকার বলেন, দেবীর চরণে সিঁদুর নিবেদন করে পরিবারের সবার মঙ্গল ও স্বামীর দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন তিনি। তাঁর মতে, বিজয়ার সিঁদুর খেলা শুধু একটি প্রথা নয়, এটি পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও দৃঢ় করার উপলক্ষ।
বিজয়া দশমী উপলক্ষে পূজামণ্ডপগুলোতে শুভেচ্ছা বিনিময়, প্রণাম, আশীর্বাদ ও মিষ্টিমুখের আয়োজনও চলে। ছোটরা বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে আশীর্বাদ নেয়। সমবয়সীরা কোলাকুলি করে একে অপরকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানায়।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আগমনের সূচনা হয়। এরপর আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত চলে দুর্গোৎসব। বিজয়া দশমীতে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গাকে এক বছরের জন্য বিদায় জানান ভক্তরা। তাঁদের বিশ্বাস, পুত্র-কন্যাদের নিয়ে কৈলাসে স্বামীর ঘরে ফিরে যাবেন দেবী দুর্গা। এক বছর পর নতুন শরতে আবারও ধরায় আসবেন তিনি।
এভাবেই পাথরঘাটার পূজামণ্ডপগুলোতে আনন্দ, প্রার্থনা ও বিদায়ের আবেগের মধ্য দিয়ে শেষ হয় শারদীয় দুর্গোৎসব। দেবীর বিদায়ে ভক্তদের মনে বিষাদ থাকলেও সবার কণ্ঠে ধ্বনিত হয় আগামী শরতে মায়ের ফিরে আসার প্রত্যাশা—‘আসছে বছর আবার হবে’।
The post পাথরঘাটায় সিঁদুর খেলা ও দেবীবরণের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজার বিদায় appeared first on ভোরের চেতনা.
