কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে পুড়ে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় টুপটুপের দুই মালিকের একজনকে আসামি করা হলেও অন্যজনের নাম নেই। এজাহারে ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া সতর্কবার্তার তথ্য উল্লেখ না করা এবং মামলার ধারার প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক), পরিবেশ অধিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, রিসোর্টটির বিরুদ্ধে আগে নোটিশ, ক্ষতিপূরণ ধার্য ও অপসারণের নির্দেশ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। এরপরও সেটি কীভাবে চালু ছিল তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আগুনের কারণ, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা খতিয়ে দেখছে।
গত ১৭ অক্টোবর সকালে মেরিন ড্রাইভের পাশে পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। এতে ১০ জন পর্যটকের মৃত্যু হয় এবং দগ্ধ হন ছয়জন। বিষয়টি তদন্তে জেলা প্রশাসন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) তাসনীম জাহানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন— উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার, উখিয়া থানার ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার এবং ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের একজন করে প্রতিনিধি।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে তাসনীম জাহান বলেন, আগুন লাগার কারণ, পর্যটকদের মৃত্যুর ঘটনায় রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের গাফিলতি, প্রয়োজনীয় নিবন্ধন ও নথিপত্র এবং অবকাঠামোগত সমস্যা খতিয়ে দেখা হয়েছে। বিস্তারিত তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন
পাওয়ার পর যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মালিক দুজন, আসামি একজন : টুপটুপ রিসোর্টটি যৌথভাবে গড়ে তোলেন চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার মো. তানভীর সুলতান মিয়া ও নিয়াজ মোর্শেদ। ১৭ অক্টোবর রাতে উখিয়া থানার এসআই আশিস সূত্রধর বাদী হয়ে অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এজাহারে চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারা হলেন— রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়া, প্রধান ব্যবস্থাপক সাঈদ আহাম্মেদ, ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাঈদ এবং সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমন। বাকি ১৯ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। সেখানে রিসোর্টের অন্য মালিক নিয়াজ মোর্শেদকে আসামি করা হয়নি।
ওসি আতিকুর রহমান মজুমদার বলেন, মামলা করার সময় পুলিশ নিয়াজ মোর্শেদের নাম জানত না। এ কারণে আপাতত তানভীরকে আসামি করা হয়েছে। নিয়াজকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এজাহারে কোনো ভুল বা অসংগতি থাকলে অভিযোগপত্রে তা সংযোজন করা হবে।
কক্সবাজার আদালতের আইনজীবী ইউসুফ আরমান বলেন, যৌথ মালিকানার রিসোর্টে একজন মালিককে আসামি করে অন্যজনকে বাদ দেওয়া রহস্যজনক। কর্মচারী ও অজ্ঞাতনামা আসামি করা আইনবহির্ভূত। ফায়ার সার্ভিসের সতর্কবার্তার তথ্য এজাহারে না থাকায় মামলাটি দুর্বল হয়েছে। দণ্ডবিধির ৩০৪ (ক) ধারায় করা হয়েছে এ মামলা, যেখানে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর। ফায়ার সার্ভিসের সতর্কবার্তার কথা এজাহারে উল্লেখ করা হলে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন এবং সর্বনিম্ন ১০ বছর হতে পারত।
পুলিশ, হাসপাতাল ও জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন— ঢাকার বনশ্রীর ইসরাত জাহান ও মিলিতা মেহেজাবিন, খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান ও নাফিসতা মীম, চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহমেদ। বাকি চারজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. সুবক্তগীন মাহমুদ বলেন, নিহতদের পরিচয় জানা গেলেও কোন মরদেহটি কার, তা এখনই শনাক্ত করা সম্ভব নয়। আগুনে মরদেহগুলো বিকৃত হয়ে যাওয়ায় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে।
দগ্ধ ছয়জন হলেন— মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন, তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান, মান্নান, মেহেরুন্নেসা, মাসুদ ও সামিদা। তাদের মধ্যে চারজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। বাকি দুজন কক্সবাজার সদর হাসপাতাল থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ঢাকায় ফিরে গেছেন।
সুমনের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন, হয়নি শুনানি : মামলার চার নম্বর আসামি রিসোর্টের সহকারী ব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন সুমনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে রবিবার আদালতে পাঠায় পুলিশ। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিএনএর নমুনা নিয়ে ঢাকায় অবস্থান করায় সেদিন রিমান্ড শুনানি হয়নি।
কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শাহজাহান এলাহী নূরী বলেন, রিমান্ড শুনানিতে তদন্ত কর্মকর্তার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক হওয়ায় শুনানি না করে জাহিদ হোসেন সুমনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা সশরীরে উপস্থিত হয়ে আবেদন করলে রিমান্ড শুনানি হবে।
