Published on
:
2 min read
অনির্বাণ ঘোষ
হাসপাতালের বিছানাটাই এতদিন ছিল তাঁর পৃথিবী। চোখের সামনে দিয়ে কত মানুষ এলেন, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন, কেউ বা চিরদিনের মতো চলে গেলেন। টানা ১২ বছর ধরে একই ওয়ার্ডে শুয়ে শুয়ে সব দেখেছেন বছর পঞ্চাশের গোপাল পাত্র। দুর্গাপুজোর আলো, মণ্ডপের ভিড়, প্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে অঞ্জলি দেওয়ার দৃশ্য— সবই তাঁর কাছে ছিল দূরের এক পৃথিবী!
এ বার সেই পৃথিবীর দরজাই খুলে দিলেন আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কয়েক জন তরুণ চিকিৎসক। দীর্ঘ ১২ বছর পরে হাসপাতালের ওয়ার্ডের চৌহদ্দি পেরিয়ে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে পৌঁছলেন ২৪ ঘণ্টা শয্যাশায়ী গোপাল। প্রতিমা দর্শনের আনন্দে তখন চোখেমুখে তাঁর বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস। আপনজনহীন জীবনে কয়েক মুহূর্তের এই প্রাপ্তিই যেন তাঁর কাছে পুজোর সেরা উপহার!
পশ্চিম মেদিনীপুরের জামবনি থানা এলাকার হামিরপুর গ্রামের বাসিন্দা গোপাল এক সময়ে ট্রাকের খালাসি ছিলেন। ২০১৪-র ২৯ অক্টোবর পথ দুর্ঘটনা সব ওলটপালট করে দেয়। হলদিয়া থেকে দুর্গাপুরে কয়লা নিয়ে যাওয়ার সময়ে পূর্ব মেদিনীপুরের সুতাহাটার কাছে অন্য একটি ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় গোপালদের ট্রাকের। দুর্ঘটনায় এমন ভাবে দু’টি পা পিষে গিয়েছিল তাঁর, দু’টি পায়েরই হাঁটু থেকে নীচের অংশ বাদ দিতে হয় চিকিৎসকদের। বাঁ হাতেও তৈরি হয় পেশিতে আঘাতজনিত সঙ্কোচন, যার জেরে সেই হাতের জোর চলে যায় পাকাপাকি ভাবে। দীর্ঘ কয়েক মাসের চেষ্টায় সুস্থ হয়ে উঠলেও বিধি ছিল বাম!
ব্যক্তিগত জীবনে গোপালের অবলম্বন বলতে বিশেষ কেউ নেই। ১৯৯৩-তেই মারা গিয়েছিলেন স্ত্রী। সন্তান নেই। দুর্ঘটনার পরে দুই ভাইপো এক-দু’বার দেখতে এলেও তার পর আর নিয়মিত যোগাযোগ থাকেনি। বাড়ি ফেরার মতো পারিবারিক আশ্রয় ও সহায় না থাকায় ধীরে ধীরে আরজি কর হাসপাতালের ক্যাজুয়াল্টি ব্লকের অবজার্ভেশন ওয়ার্ডই হয়ে ওঠে গোপালের ঠিকানা। সেই ওয়ার্ড পরে ইমার্জেন্সি ভবন থেকে সার্জারি বিল্ডিংয়ে স্থানান্তরিত হলে সেখানেই পাকাপাকি ঠাঁই হয় তাঁর। ওয়ার্ড বদলালেও বদলায়নি বিছানায় আটকে থাকা জীবন।
সেই জীবনে সামান্য আনন্দের পরশ এনে দিতে এগিয়ে আসেন আরজি করের জেনারেল সার্জারির স্নাতকোত্তর পড়ুয়া বা পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ট্রেনি (পিজিটি) চিকিৎসক ত্রিনেশ মণ্ডল, গৈরিক রায় ও শ্রুতি সিং। মহাষ্টমীর দিন আউটডোর বন্ধ। তাই কাজের চাপ কম থাকায় ওই দিন, সোমবার হাসপাতালের কর্মী গৌতমকে সঙ্গে নিয়ে তাঁরা গোপালকে ওয়ার্ড থেকে বের করে নিয়ে যান হাসপাতালের আশপাশের কয়েকটি দুর্গাপুজোর মণ্ডপে।
দীর্ঘ একযুগ পরে চোখের সামনে প্রতিমা, চারপাশে পুজোর আলো, মানুষের ভিড় আর উৎসবের আবহ! হাসপাতালের চেনা চার দেওয়ালের বাইরে এই কয়েকটি মুহূর্তই গোপালের কাছে হয়ে ওঠে অমূল্য। ঠাকুর দেখে আনন্দে আপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। গোপালের কথায়, ‘এই ডাক্তার-নার্সরাই তো এখন আমার স্বজন। ওঁরা যা করলেন আমার জন্যে, অশেষ কৃতজ্ঞ আমি। কত বছর পরে যে এত আনন্দ পেলাম!’
গোপালের এই কাহিনি অবশ্য শুধু একজন রোগীর একাকিত্বের গল্প নয়। ওই ওয়ার্ডেই রয়েছেন আরও সাত–আট জন, যাঁদের পরিবারের কোনও খোঁজ মেলেনি। তাঁদের কেউ কয়েক মাস, কেউ এক-দু’বছর ধরে হাসপাতালেই রয়েছেন। চিকিৎসার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতাল-নির্ভর এই মানুষগুলির জীবনে একটু স্বাভাবিকতা, একটু সঙ্গ যে কতটা জরুরি, গোপালের পুজো দেখা যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়।
পিজিটি ত্রিনেশ বলেন, ‘১২ বছরের অপেক্ষার পরে একদিনের এই আনন্দ হয়তো ওঁর জীবনের সব যন্ত্রণা মুছে দিতে পারবে না। কিন্তু হাসপাতালের বিছানায় আটকে থাকা মানুষটির জীবনে কয়েক মুহূর্তের জন্যে হলেও যে বাইরের পৃথিবীর জানলাটা সমবেত প্রয়াসে আমরা খুলে দিতে পেরেছি, সেটাই সবচেয়ে তৃপ্তির।’ তিনি জানান, চিকিৎসকদের কাছে রোগীর মুখে এই আনন্দের ঝলকই তাঁদের পুজোর সেরা প্রাপ্তি।
