একটা পরিসংখ্যান দিয়ে শুরু করা যাক, যেটি প্রচলিত ধারণাকে উল্টে দেয়। সবাই ভাবে, প্রযুক্তির সবচেয়ে কাছের প্রজন্ম যারা চ্যাটজিপিটি দিয়ে অ্যাসাইনমেন্ট লেখে, যারা এআই টুল ছাড়া এক দিনও চলতে পারে না তারাই এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবে। বাস্তবতা কিন্তু বলছে উল্টো কথা। দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি একটি তথ্য প্রকাশ করেছে, যা রীতিমতো চমকে দেওয়ার মতো ।
২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬-এর জুলাই পর্যন্ত দেশটিতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের চাকরি কমেছে ২ লাখ ১১ হাজার, যার মধ্যে ২ লাখ ৮ হাজারই এমন খাত থেকে, যেগুলো এআই দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত। একই সময়ে ৫০ ঊর্ধ্বদের চাকরি বেড়েছে ২ লাখ ৯ হাজার, আর তার প্রায় ৭০ শতাংশই ঠিক সেই একই ধরনের এআইনির্ভর খাতে। দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজার এখন একটি ‘জ্যেষ্ঠতাভিত্তিক’ রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে তরুণদের চাকরি কমছে এআই বাস্তবায়নের কারণে। ব্যাংক অব কোরিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত যে অভিজ্ঞ কর্মীরা এআইকে অস্ত্র বানিয়ে আরো দক্ষ হয়ে উঠছেন অথচ নবীন কর্মীদের ভূমিকা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
এই একটি তথ্যই পুরো বিতর্কটাকে নতুন করে সাজিয়ে দেয়। প্রশ্নটা তাহলে ‘এআই চাকরি খাবে কি না’ নয়। প্রশ্নটা হলোÑএআই কার হাত শক্ত করছে আর কার পায়ের নিচের মাটি সরিয়ে দিচ্ছে। আর উত্তরটা অস্বস্তিকর, যারা সবে ক্যারিয়ার শুরু করছে, ঠিক তাদের পায়ের নিচেই মাটি সরছে সবচেয়ে বেশি।
বৈশ্বিক চিত্র : দুই দশকের সর্বনিম্ন থেকে আবার ঊর্ধ্বমুখী
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ সালে দুই দশকের সর্বনিম্নে নেমে আসার পর বিশ্বব্যাপী তরুণ বেকারত্বের হার আবার বাড়তে শুরু করেছে । আইএলওর হিসাব বলছে, পূর্ব এশিয়ায় ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কর্মী এমন পেশায় নিয়োজিত, যেগুলো এআই দ্বারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই হার তুলনামূলক কম, প্রায় ৬ দশমিক ১ শতাংশ তরুণ কর্মী এআই-প্রভাবিত পেশায় জড়িত। সংখ্যাগুলো ছোট মনে হলেও প্রকৃত অর্থ ভয়াবহ কোটি কোটি তরুণের প্রথম চাকরিই এখন এমন এক প্রযুক্তির মুখোমুখি, যা মাত্র কয়েক বছর আগেও কল্পনার বাইরে ছিল।
চীনের সাম্প্রতিক তথ্য এই আলোচনাকে আরো তীব্র করে তোলে। ২০২৬ সালের আগস্টে দেশটিতে ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সিদের (শিক্ষার্থী বাদে) বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৯ শতাংশে, যা জুলাইয়ের ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়েছে। দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা আর প্রযুক্তি খাতে এআইনির্ভর রূপান্তর দুটো মিলে রেকর্ডসংখ্যক স্নাতককে ঠেলে দিচ্ছে এক অনিশ্চিত বাজারে।
কিন্তু এখানেই একটা প্যারাডক্স। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এমন এক তথ্য, যা সাধারণ বোধবুদ্ধির বিপরীত এশিয়ার সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত তরুণরাই মুখোমুখি হচ্ছেন সবচেয়ে বেশি বেকারত্বের। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার সাধারণ জনগোষ্ঠীর উচ্চশিক্ষিতদের তুলনায় বহু দেশেই বেশি শ্রীলঙ্কা, ভারত, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনামসহ প্রায় প্রতিটি বড় অর্থনীতিতেই এই ব্যবধান স্পষ্ট। অর্থাৎ ডিগ্রি এখন আর নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়; বরং কখনো কখনো তা উল্টো বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, কারণ এআই যেসব কাজ প্রতিস্থাপন করছে, সেগুলো মূলত এন্ট্রি-লেভেল বিশ্লেষণাত্মক ও কেরানিসুলভ পদ, যেগুলোর জন্যই স্নাতকরা প্রথাগতভাবে প্রস্তুত হয়ে থাকেন।
ভিয়েতনামের চিত্রটা এই আলোচনায় সবচেয়ে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার মতো। ২০২৬ সালের একটি জরিপ বলছে, ভিয়েতনামের প্রায় ৩৯ শতাংশ কর্মী নিজেদের ‘এআই অগ্রগামী’ শ্রেণিতে ফেলেন, যা আসিয়ানে সর্বোচ্চ এবং বৈশ্বিক গড়ের প্রায় ২ দশমিক ৪ গুণ। অথচ একই দেশের মাত্র ২৯ দশমিক ২ শতাংশ কর্মীর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা সনদ আছে। প্রযুক্তি গ্রহণের গতি আর প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ভিত্তি এই দুইয়ের মধ্যে যে বিশাল ফাঁক, সেটাই আজকের এশিয়ার আসল সংকট। ফল আরো করুণ নিয়োগকর্তাদের হিসাবে, নতুন স্নাতকদের প্রায় ৭০ শতাংশকে কর্মক্ষেত্রে যোগ দেওয়ার পর নতুন করে প্রশিক্ষণ দিতে হয়, কারণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বাজারের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই ফাঁক শুধু দক্ষতার নয়, মনস্তাত্ত্বিকও। একটি বৈশ্বিক জরিপে দেখা গেছে, পঁয়ত্রিশ বছরের নিচে বিশ্বজুড়ে ৬১ শতাংশ কর্মীর মধ্যে কাজ করছে ‘নিজের ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার ভয়’ ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামে, যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ শতাংশে। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ তরুণ কর্মী স্বীকার করেন, তারা প্রস্তুত না হয়েই এআই ব্যবহারের চাপে পড়ছেন নিজের ইচ্ছায় নয়, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাধ্য হয়ে। ইন্দোনেশিয়ায় এই চাপ অনুভব করেন ৮০, ভারতে ৭৬ ও ভিয়েতনামে ৭৫ শতাংশ তরুণ কর্মী। অর্থাৎ এআই শুধু চাকরির সংখ্যা কমাচ্ছে না, এক ধরনের ক্রমাগত উদ্বেগও তৈরি করছে, যা আগের কোনো প্রযুক্তিগত রূপান্তরে এত ব্যাপকভাবে দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ: পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকানো বাস্তবতা
এবার ঘরের কথায় আসা যাক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে সামগ্রিক বেকারত্বের হার প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ হলেও ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের মধ্যে তা ৭ দশমিক ২ শতাংশ জাতীয় গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি এবং বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৯৪ লাখ তরুণ বেকার। আরো গভীরে গেলে দেখা যায়, দেশের প্রায় ২৭ শতাংশ তরুণ প্রায় ১ কোটি ২৬ লাখ মানুষ NEET শ্রেণিভুক্ত, যাদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী এবং অধিকাংশই গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা। এ সংখ্যাটা আসলে এআইজনিত চাকরি হারানোর গল্প নয়, এটি তার চেয়েও গভীর এক কাঠামোগত ব্যর্থতার গল্প, যেখানে প্রযুক্তি আসার আগেই লাখো তরুণ শ্রমবাজারের বাইরে পড়ে আছেন।
আর যখন প্রশিক্ষণের প্রশ্ন আসে, চিত্রটা আরো উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। একটি সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, গত এক বছরে দেশের মাত্র ১২ শতাংশ তরুণ কোনো না কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, আর তাদের মধ্যেও মাত্র ৪৯ শতাংশ কম্পিউটার ব্যবহারের প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। এর মানে দাঁড়ায়, দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর একটা বিশাল অংশ এখনো প্রাথমিক ডিজিটাল সাক্ষরতার সীমানাই পার হতে পারেননি, যেখানে বিশ্বের অন্য প্রান্তের তরুণরা এরই মধ্যে জেনারেটিভ এআই দিয়ে কোড লিখছেন, ছবি বানাচ্ছেন, ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান দিন দিন প্রশস্ত হচ্ছে আর এই ব্যবধানই ভবিষ্যতে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এআইচালিত অর্থনীতিতে টিকে থাকার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে এখানে একটা ইতিবাচক দিকও আছে, শ্রমবাজারে তরুণদের সংযুক্ত করার চেষ্টা থেমে নেই। সম্প্রতি ব্র্যাকের একটি ক্যারিয়ার এক্সপোতে পঞ্চাশ হাজারের বেশি চাকরিপ্রার্থী নিবন্ধন করেছেন এবং প্রায় সাড়ে তিন হাজার জন সরাসরি চাকরির প্রস্তাব পেয়েছেন, যা প্রমাণ করে, সঠিক প্ল্যাটফর্ম এবং সংযোগ থাকলে তরুণদের মধ্যে চাকরি পাওয়ার সক্ষমতা ও আগ্রহ দুটোই আছে। প্রয়োজন শুধু সেই সংযোগ আর দক্ষতার সেতুবন্ধ তৈরি করা।
সংকট এখনো নিয়ন্ত্রণযোগ্য
তবে পুরো ছবিটা শুধু হতাশার নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ডালাস ফেডারেল রিজার্ভের একটি গবেষণা এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য যোগ করে। তাদের বিশ্লেষণ বলছে, এআই-প্রভাবিত খাতে তরুণ কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার প্রকৃত প্রভাব সামগ্রিক বেকারত্বের হারে এখনো মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি ঘটিয়েছে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পতনের বেশিরভাগই আসছে ছাঁটাই থেকে নয়; বরং যারা শ্রমবাজারের বাইরে ছিলেন, তারা সরাসরি চাকরিতে প্রবেশ করতে না পারার কারণে। অর্থাৎ প্রচলিত কর্মীরা এখনো গণহারে চাকরি হারাচ্ছেন না, বরং নতুনদের জন্য দরজা সরু হয়ে যাচ্ছে। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর অর্থ হলোÑএখনো এমন একটা সময়ের জানালা খোলা আছে, যেখানে সঠিক পদক্ষেপ নিলে এই সংকট বড় আকার ধারণ করার আগেই ঠেকানো সম্ভব।
দক্ষিণ কোরিয়ার আরেকটি জরিপও এই আশার আলোকেই সমর্থন করে দেশটির প্রায় ৭১ শতাংশ প্রতিষ্ঠান স্বীকার করেছে, তাদের মোট কাজের প্রায় ১০ শতাংশ এআই দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয়েছে, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাকরির সংখ্যায় ব্যাপক ধস এখনো ঘটেনি। বরং এখনই সময় লক্ষ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়নের, যাতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী তরুণ ও নবীন কর্মীরা সুরক্ষিত থাকেন।
তাহলে করণীয় কী
এই পুরো আলোচনা থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট সমস্যাটা এআই নিজে নয়, সমস্যা হলো প্রস্তুতির ঘাটতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ধীরগতি। আইএলওর সুপারিশও ঠিক এই জায়গাতেই আঙুল রাখে মানবকেন্দ্রিক এআই নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গ্রহণ, মানসম্মত শিক্ষায় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সেবা শক্তিশালীকরণ, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ এবং শোভন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর বাস্তব অর্থ দাঁড়ায় অন্তত চারটি জায়গায় মনোযোগ দেওয়া। প্রথমত, ডিজিটাল সাক্ষরতাকে শুধু ‘কম্পিউটার শেখা’ থেকে ‘এআই টুল ব্যবহারের সক্ষমতা’তে উন্নীত করতে হবে কারিগরি ও কলেজপর্যায়ের পাঠ্যক্রমে এখনই এই রূপান্তর প্রয়োজন, নইলে আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দশকে সেই ৭০ শতাংশ স্নাতকের কাতারে পড়বেন, যাদের চাকরিতে ঢুকে নতুন করে সব শিখতে হয়।
এআই তরুণদের চাকরি ‘কেড়ে নেবে কি না’ এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতে লেখা হবে, কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ এখনই নির্ধারিত হয়ে যাচ্ছে আজকের সিদ্ধান্তে। দক্ষিণ কোরিয়ার তরুণরা যখন দেখছেন তাদের জ্যেষ্ঠ সহকর্মীরা এআই দিয়ে আরো শক্তিশালী হয়ে উঠছেন আর তারা নিজেরা পিছিয়ে পড়ছেন, তখন বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। প্রযুক্তি থামানো যাবে না, কিন্তু প্রস্তুতির ঘাটতি পূরণ করা যায়। প্রশ্নটা তাই এখন আর ‘চাকরি থাকবে কি না’ নয়। প্রশ্নটা হলোÑআজকের তরুণ প্রজন্মকে আমরা সময়মতো সেই প্রস্তুতি দিতে পারব কি না।
লেখক: স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী, জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
