ছড়া দেখা হবে কোনো এক অভ্যুদয়ে
প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৭ এএম
দেখা হবে কোনো এক অভ্যুদয়ে।
তোমার হাতে থাকবে কার্তুজ, কামান
আমার হাতে থাকবে সহস্র গান
রক্তের বদলে শব্দ ঝরবে রাস্তায়,
মুখোমুখী হবো আমরা কোনো অনাস্থায়!
তুমি ফোটাবে বোমা, আমি ওড়াবো পালক,
পরোয়া করি না, আমিই নিজের চালক,
তোমার পকেটে থাকবে গুলির রুল,
আমার পকেটে থাকবে রুমাল, ফুল।
তুমি জিতে গিয়ে পরাজিত হবে ঘরে,
আমি মহা বিস্ময় হবো, খোলা প্রান্তরে।
আমি হাসবো, থরথর তুমি কাঁপবে ভয়ে।
আমি চোখ খুলে রবো, আমার রুহে,
জন্ম নেবে পুরোনো পৃথিবী নবীনাবহে।
আরও পড়ুন
গল্প কালো মেম
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫১ পিএম
ছবি: খবরের কাগজ
-->ফুলকুমারীর কথা আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। গ্রামে ওকে ফুলু নামে ডাকা হতো। সে ছিল আমাদের স্কুলের সহপাঠী। ক্লাস সিক্স থেকে এইট পর্যন্ত একসঙ্গে পড়েছিলাম। তার গায়ের রং কালো হলেও আমরা সহপাঠীরা প্রায় সবাই মনে মনে ওর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। ওকে আমরা নাম দিয়েছিলাম ‘কালো মেম’। ক্লাস এইটের কথা। আমার গ্রামের ছেলেমেয়েরা সবাই প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে একসঙ্গে হেঁটে স্কুলে যেতাম। রাস্তার দুপাশে আখের খেত হওয়ায় একা যেতে ভয় হতো। বিশেষ করে গ্রামের মেয়েরা তো ওই রাস্তা দিয়ে একা যেতে প্রচণ্ড ভয় পেত। তাই কোনো মেয়ে পারতপক্ষে একা নির্জন বুনো রাস্তা দিয়ে যেত না।
সেদিন সকাল থেকেই টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল। মন চাইছিল না স্কুলে যেতে। তবুও মার বকুনি খেয়ে ছাতা নিয়ে প্রস্তুত হয়েছি স্কুলে যাব। হঠাৎ উত্তর দিক থেকে প্রচুর চিৎকার আর চেঁচামেচি শোনা গেল। বড়দের সঙ্গে আমিও দৌড়ে গেলাম। গিয়ে দেখি আমাদের স্কুলের রাস্তায় গোটা পঞ্চাশেক যুবক ও বয়স্ক পুরুষ। কয়েকজন নারীও আছেন। আখের খেতের এই মাথা থেকে ওই মাথায় কাউকে খোঁজা হচ্ছে। বড়রা কাউকে বকা দিচ্ছে। একজনকে বলতে শুনলাম, জানোয়াররা, মানুষ না।
আরেকজন বলছে, দেশের মা-বোনদের নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই। আমার এক কাকা, যার চারজন স্কুলপড়ুয়া মেয়ে। একটা ছেলে সন্তানের অনেক আশা করেছিলেন। কিন্তু তার আশা পূরণ হয়নি। তিনি বলেন, এখন তো আমার মেয়েদের চিন্তায় আর ঘুম হবে না।
আমার চোখ একজনের দিকে গিয়ে আটকে গেল। আরে ফুলু। আমাদের কালো মেম সাহেব! সে কাঁদছে কেন? তার স্কুলের ইউনিফরমে কাঁদা কেন? কেউ একজন তাকে স্নেহের সুরে বলছে, কাঁদিস না মা। আবার কেউ বলছে, একা একা পথে বের হওয়ার দরকার কী?
এরপর ফুলু হলো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। সহপাঠী রতন বলল, চল আমরা ফুলুদের বাড়ির পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকব! তাহলে বিচারে কী হয় তা শোনা যাবে। কিন্তু চতুর্থ দিন আবার বিচার বসার কথা থাকলেও তার আর প্রয়োজন হয়নি। ফুলুকে বাড়িতে পাওয়া যাচ্ছে না। ওর মা ওকে নিয়ে চলে গেছে। ওর নিরীহ বাবা কিছুই বলতে পারছে না।
কেউ কেউ সহজ-সরল যোসেফ গমেজকে বলছে, কেমন কর্তা হয়েছ মেয়ে আর বউ কোথায় তা বলতে পার না? মাতবররা খুশি, কারণ তাদের আর বিচারে বসতে হয়নি। যে জানোয়ারটা ফুলুকে জোর করে আখের খেতে নিয়ে গিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতে চেয়েছিল সে হলো এই এলাকার প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার বখাটে ছেলে। নেতার কথাতেই গ্রাম্য মাতবররা ওঠে-বসে। তারা রফা করার চেষ্টা করছে।
আমরা চার বন্ধু আমাদের ‘কালো মেম’ নিখোঁজ হওয়ায় খুব আঘাত পেলাম। রতন কোনোদিন বিড়ি-সিগারেট খায়নি। সে বিড়ি কিনে বিড়িতে টান দিয়ে উদাসভাবে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি শুতে গিয়ে কত যে বালিশ ভিজিয়েছি, তা বলতে পারব না।
আমরা আরও বেশি আঘাত পেলাম যখন শুনলাম কালো মেম ঢাকায় চলে গেছে। সে সেখান থেকে কলকাতা তার মামার বাড়ি চলে যাবে। তার মানে তাকে আমরা আর দেখতে পাব না। আর দেশে থেকেইবা কী হবে, সেখানে এতটুকুন একটা মেয়েকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। গ্রামের সব মানুষ জানার পরও উল্টো কিশোরী ফুলুর দিকেই দোষের পাল্লা ভারী হচ্ছে। একজন মাতবরকে বলতে শুনলাম, ফুলুরই ইচ্ছা ছিল। তাই ওকে নেতার ছেলে শুভ কুপ্রস্তাব দিয়েছিল। আমি মনে মনে শুয়োরের বাচ্চা বলে গালি দিয়েছিলাম ওই নেতাকে। ওর আসলে বিবেক বলে কিছু নেই। শুধু নামেই নেতা হয়েছে।
বর্গাচাষি ফুলুর বাবা ছিলেন অশিক্ষিত। গরিব। তাই তাকে নীরবে শুধু কাঁদতে হয়েছে। আমরা সেই ফুলুর কথা, আমাদের কালো মেমের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। এসএসসি, এইচএসসি পাস করে সব বন্ধু বিভিন্ন শহরে চলে যাই পড়াশোনার জন্য। যে কালো মেমকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করত, সেই রতন এইচএসসির পর ধর্মীয় সংঘে প্রবেশ করে ব্রাদার হয়েছে। কমল যে কথা কম বলত সে আজ উদীয়মান উকিল। আর রবার্ট সাব-ইন্সপেক্টর হয়ে রাজশাহীতে দারোগা হিসেবে জয়েন করেছে।
আমি একটি পত্রিকায় রিপোর্টার।
ব্রাদার রতন বাদে আমাদের সবারই এখন যার যার সংসার আছে। আমরা যার যার মতো নিজেদের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। একদিন ব্রাদার রতন ফোন দিয়ে বলল, দোস্ত শুনেছিস, আমাদের ফুলু গ্রামে ফিরে এসেছে। সে এখন চিকিৎসক। আমি অবাক হলাম। সঙ্গে খুশিও।
ফুলকুমারী কলকাতা গিয়ে ডাক্তারি পড়েছে। ইতোমধ্যে তার বিয়ে হয়েছে। একটি মেয়েও আছে। ফুলকুমারী প্রতিজ্ঞা করেছে, যে গ্রাম থেকে সে অপমান হয়ে একদিন তার মায়ের সঙ্গে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল, সে গ্রামেই তার বাবার নামে হাসপাতাল দেবে। গ্রামের মানুষের সেবা করবে।
তার প্রতি শ্রদ্ধায় আমাদের সবার বুকটা ভরে ওঠে।
আরও পড়ুন
ইতিহাস ঐতিহ্য জৈন্তার ভাষা ঐতিহ্যের এক স্মারকের নাম
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪৪ পিএম
সিলেট জেলার মোট উপজেলার সংখ্যা বর্তমানে ১৩। তার মধ্যে অন্যতম চারটি উপজেলা হচ্ছে জৈন্তা, গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও কানাইঘাট। এই চার উপজেলা প্রাচীন জৈন্তারাজ্যের অন্তর্গত ছিল। তাছাড়া বর্তমান ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের কিছু অংশ ছিল প্রাচীন জৈন্তারাজ্যের অংশ। জৈন্তারাজ্য আনুমানিক ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত একটি স্বাধীন রাজ্য ছিল। জৈন্তার রাজধানী ছিল নিজপাট। মুঘল শাসকরা অনেক চেষ্টা করেও জৈন্তারাজ্যকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে পারেনি। বংশ পরম্পরায় খাসিয়া রাজারা ৩০০ বছরের বেশি সময় জৈন্তারাজ্য শাসন করেন। ১৮৩৫ সালে জৈন্তারাজ্য ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। এর মধ্যদিয়ে স্বাধীন জৈন্তারাজ্যের অবসান ঘটে। তবে অবিভক্ত জৈন্তার ইতিহাস-ঐতিহ্যকে এখনো এই জনপদের মানুষ ধারণ করে। এখনো জৈন্তারাজার আমলের অনেক প্রাচীন স্থাপনা বা স্মৃতিচিহ্ন এ জনপদে রয়ে গেছে। এখনো অনেক বিষয়ে প্রাচীন জৈন্তারাজ্যের ১৭ পরগণার মানুষ ঐকমত্য পোষণ করে।
বৃহত্তর জৈন্তা সিলেট জেলার অন্তর্গত। এখানে সিলেটি ভাষাটাই এই জনপদের মানুষের মূল আঞ্চলিক ভাষা। প্রতিটি আঞ্চলিক ভাষার মধ্যেও কিছু উপভাষা থাকে। উপভাষা সাধারণত কয়েক কিলোমিটার পরপর পরিবর্তন হয়। উপভাষা ও আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে অনেক বিষয়ের মিল থাকলেও অনেক বিষয়ে পার্থক্যও লক্ষ্য করা যায়। এই পার্থক্যটা যেমন উচ্চারণে, তেমনি ধ্বনিতে, শব্দে, বাক্যে। জৈন্তাপুরের মানুষের মুখে শোনা প্রাচীন সেই আঞ্চলিক উপভাষাটি যেন কালের পরিবর্তনের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে।
জৈন্তাপুরের উপভাষার কিছু শব্দ ছিল বা এখনো কিছু প্রচলিত আছে–যা আমরা ছোটবেলা খুব বেশি শুনতাম। কালের পরিবর্তনে এই শব্দগুলো এখন আমাদের খুবই কম শোনা হয়। এখানে কয়েকটি বাক্য বলছি–যা কেবলমাত্র জৈন্তা অঞ্চলের উপভাষার বাক্য। সিলেটের অন্য কোনো অঞ্চলের সঙ্গে এ অঞ্চলের বাক্যগুলোর কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। এটাই হচ্ছে একটি উপভাষার স্বাতন্ত্র্য বা স্বার্থকতা। যেমন–মুই ইতা খাম না। এই বাক্যটি সিলেটের অন্য কোনো অঞ্চলের মানুষ নাও বুঝতে পারে। কিন্তু একজন প্রকৃত বৃহত্তর জৈন্তা অঞ্চলের মানুষ এই বাক্যটি খুব সহজেই বুঝতে পারবে। এই বাক্যটির শুদ্ধ বাংলা হলো–আমি এগুলো খাই না। আর সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় হলো–আমি ইতা খাই না। এমন আরেকটি জৈন্তাপুরের নিজস্ব বাক্য হলো–হি এবলাকু আইছে দারু ফারাত। এই কথাটির শুদ্ধ বাংলা হলো–সে এখন আসছে কাঠ কাটতে। আর সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় এই বাক্যটি হলো–হে এখন আইছে লাকড়ি ফারাত। আরেকটি জৈন্তার নিজস্ব বাক্য হলো–তুই করগুল্লি রে? শুদ্ধ বাংলায় এই বাক্যটি হলো–তুই কে? আর সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় এ বাক্যটি হলো–তুই কে বে?
একটি অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে সেই অঞ্চলের ভাষারও একটা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। একটি অঞ্চলের ভাষাকে উপেক্ষা করে সেই অঞ্চলের প্রকৃত ইতিহাস রচনা করা যায় না। ভাষা ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে। ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সেই অঞ্চলের ভাষা সম্পর্কিত ও সমন্বিত। সুতরাং জৈন্তাপুরের ভাষা জৈন্তা অঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। জৈন্তার এই ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে এ অঞ্চলের মানুষের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও নিজস্বতার অন্যতম পরিমাপক বা মানদণ্ড হিসেবে। ভাষা বাঁচিয়ে রাখতে যেমন তার চর্চা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন যেকোনো আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষার শব্দভান্ডার দিয়ে সাহিত্যচর্চা করা। জৈন্তার ইতিহাস-ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে অবশ্যই এ অঞ্চলের মানুষের কথ্যভাষাকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এ দায়িত্বটুকু আমার, আপনার, সবার।
আরও পড়ুন
অতিপ্রাকৃত গল্প পাহারায় কালো বিড়াল
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম
কেহেলের চিৎকারে তার বন্ধুরা এগিয়ে গেল। সেখানে আশপাশ খুঁজে দেখার পর তারা লক্ষ্য করল, একটা খাটিয়ায় অল্প কিছু মানুষ মুর্দা নিয়ে যাচ্ছে। এদের এক বন্ধু, কে মারা গেছে জিজ্ঞেস করতেই, একজন বলল, তুমি কি গ্রামের সবাইকে চেন? তখন কেহেলের অন্য একজন বন্ধু বিষু বলল, আজ এই গ্রামে কেউ মারা গেছে তা শুনিনি। কখন মারা গেছে? কোন বাড়ির মানুষ? মুর্দাবহনকারীদের কেউই উত্তর দিল না। তারা শুনতে পেল কি না, তাও বোঝা গেল না! মানুষগুলো কেমন অদ্ভুত! চোখের পলকে তারা চলে গেল। কেহেল ফিরল না।
কিছুতেই কেহেলকে খুঁজে না পেয়ে অগত্যা তার বন্ধুরা বাড়ি ফিরে গেল। তারা কেহেলের বাড়িতে গিয়েও দেখল কেহেল নেই! বিষয়টি থানা পুলিশ পর্যন্ত গড়ালেও সুরাহা হলো না, বরং এতে তার বন্ধুদের দিকেই অভিযোগের তীব্র বাতাস বইতে লাগল। সন্ধ্যার পরে তাদের এখানে আসা উচিত হয়নি। আগেই বোঝা উচিত ছিল জায়গাটা বিশেষ ভালো নয়। মুরব্বিদের কথা না মেনে ভুল হয়েছে হয়তো। কিন্তু, হিসু করার কথা বলে কেহেল গেল কোথায়?
কেহেলদের বাড়িতে এখন অন্যরকম অবস্থা। মা-বাবা কারও চোখে ঘুম নেই। সবাই কেহেলকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে তার বন্ধুরাও বিব্রত। একজন হুজুরকে নিয়ে আসা হলো, কিন্তু তিনি কিছু না বলেই চলে গেলেন। তবে সবাই বুঝল এ সমস্যা এই হুজুরের কাজ নয়।
আবারও একজন হুজুরকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে আসা হলো। উনি অনেক দূর থেকে এসেছেন। বাড়ির চারপাশ ভালো করে ঘুরে বেড়িয়ে এসে স্থির হয়ে বসে পড়লেন। তার পর অনেক সময় পরে মুখ খুললেন। কী হয়েছে তা বলার সাধ্য তার নেই। তবে কেহেল কোনো এক দুষ্ট ও শক্তিধর জিনের শরীরে প্রসাব করে দিলে বিপত্তি বাঁধে। এর বেশি কিছু তার জানা নেই। আর কোনো কথা তিনি না বলে হাদিয়া নিয়ে বিদায় হলেন। বিশ্রী স্বপ্ন দেখে কোহেলের বন্ধুর সোহেলের ঘুম ভেঙে গেল! স্বপ্নে দেখল কেহেলের লাশ পড়ে আছ বারান্দায়!! একটা কালো বেড়াল লাশের পাহাড়ায়। সে ভোরেই ছুটল, ততক্ষণে কেহেলের বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেছে। কী হয়েছিল? লাশ সেই পোড়াবাড়ির পাশের দিঘি থেকে ভেসে উঠেছে। কোনো মতে লাশ চেনা যাচ্ছিল। ওর বন্ধুরা সবাই বলাবলি করছিল, কেহেল সাঁতার শেখেনি! প্রস্রাব করতে গিয়ে পা পিছলে হয়তো পুষ্করণীতে পড়ে গিয়ে থাকতে পারে। পোস্টমর্টেমে পানিতে ডুবে মৃত্যুর কথা উল্লেখ করা রয়েছে। এই গ্রামে তিন দিনে কেন? পাঁচ-সাত দিনেও কেউ মারা যায়নি বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বন্ধুরা সবাই চায়ের টেবিলে। আজ কেহেল সঙ্গে নেই। ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন কেমন করছে। চা ঠাণ্ডা হয়ে যায়, তবুও কারও মুখে চা ঢোকে না।
আরও পড়ুন
প্রবন্ধ আঁধার তাড়ানো আলো চাই
প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩১ পিএম
আমরা মানুষ–সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। জন্মের মুহূর্তে আমরা কিছুই জানি না, কাউকে চিনি না। এক অচেনা পৃথিবীতে এসে প্রথমেই কান্নায় ভেঙে পড়ি। সেই কান্নাই যেন পৃথিবীর উদ্দেশে আমাদের প্রথম ভাষা–আমি কিছুই জানি না, জানতে চাই; আমি কাউকে চিনি না, চিনতে চাই; আমি বড় অসহায়, আমাকে আগলে রাখো।
শৈশব পেরিয়ে কৈশোর, কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের পথে এগোতে এগোতে অজানাকে জানার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা আমাদের অন্তরে জন্ম নেয়। সেই আকাঙ্ক্ষার হাত ধরেই আমরা পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ ও প্রকৃতির কাছ থেকে প্রতিনিয়ত শিখতে থাকি। এই নিরবচ্ছিন্ন শেখার প্রক্রিয়াই হলো শিক্ষা।
জন্মের পর আমাদের প্রথম পাঠশালা হলো পরিবার। মা-বাবার স্নেহ, আপনজনের ভালোবাসা, আদর্শ ও উপদেশের মধ্যদিয়ে আমরা শিষ্টাচার, ভদ্রতা, সহমর্মিতা এবং মানবিকতার প্রথম পাঠ গ্রহণ করি। এরপর বিদ্যালয়ে এসে আমরা প্রবেশ করি জ্ঞানের এক নতুন জগতে। শিক্ষকরা আমাদের হাতে তুলে দেন আলোর প্রদীপ। অক্ষরজ্ঞান থেকে শুরু করে বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস, গণিত, শিল্প, সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির বিস্ময়কর ভুবন আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। এ জ্ঞান আমাদের চিন্তার দিগন্ত প্রসারিত করে, কল্পনায় ডানা মেলে দেয় এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলার শক্তি জোগায়।
বর্তমান যুগ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। এই দ্রুত পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে টিকে থাকতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। একজন শিক্ষার্থী যখন নিয়মিত অধ্যয়ন করে, নতুন কিছু জানার আগ্রহ লালন করে এবং নিজের দক্ষতা বিকাশে সচেষ্ট থাকে, তখন সে ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে। শিক্ষা তাকে সমস্যা সমাধান করতে শেখায়, সৃজনশীলভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে এবং নতুন কিছু সৃষ্টির সাহস জোগায়। ফলে সে নিজের জীবনকে যেমন সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে পারে, তেমনি সমাজ ও দেশের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একটি শিক্ষিত জাতিই একটি সমৃদ্ধ ও উন্নত দেশের ভিত্তি। আজকের শিক্ষার্থীরাই আমাদের আগামী দিনের শিক্ষক, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, বিচারক, শিল্পী ও রাষ্ট্রনায়কসহ নানা পেশার যোগ্য উত্তরসূরি হবে। তাই প্রতিটি শিক্ষার্থীর উচিত সময়ের মূল্য উপলব্ধি করা, মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করা, শিক্ষকদের সম্মান করা, নিয়মিত বই পড়া এবং সৎ কাজের অভ্যাস গড়ে তোলা। শুধু পাঠ্যবই নয়, প্রকৃতি, সমাজ ও জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন। শিক্ষা এমন এক অমূল্য সম্পদ, যা কোনো শক্তিই মানুষের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারে না।
ধনসম্পদ একদিন হারিয়ে যেতে পারে, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে; কিন্তু অর্জিত জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সৎ চরিত্র মানুষের চিরন্তন সম্পদ হয়ে থাকে। এই সম্পদই মানুষের প্রকৃত পরিচয়, তার মর্যাদা এবং জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত শিক্ষার আলোকশিখা হৃদয়ে ধারণ করা। কারণ শিক্ষা শুধু একটি জীবনকে নয়, একটি পরিবার, একটি সমাজ, একটি জাতি এবং সমগ্র মানবসভ্যতাকে আলোকিত করে। শিক্ষার আলোয় আলোকিত মানুষই পারে অজ্ঞতার আঁধার দূর করে একটি মানবিক, বিজ্ঞানমনস্ক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে। শিক্ষা হোক আমাদের আত্মশক্তি, মানবতার ভিত্তি এবং একটি সুন্দর আগামী নির্মাণের অনন্ত প্রেরণা।
