গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি যুদ্ধের ভয়াবহতা সবচেয়ে নির্মমভাবে আঘাত হেনেছে শিশুদের জীবনে। যুদ্ধে প্রায় ৬০ হাজার শিশু তাদের বাবা-মা উভয়কে অথবা তাঁদের যেকোনো একজনকে হারিয়েছে। লাখ লাখ শিশু বাস্তুচ্যুত, বহু শিশু আহত ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও প্রাণহানি থামে নি, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা। জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের সাম্প্রতিক তথ্য আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, গাজার মানবিক সংকট এখনো গভীর এবং এর সবচেয়ে অসহায় শিকার শিশুরা।
মিডলইস্ট মনিটরের ১৯ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে ইউনিসেফের যোগাযোগ কর্মকর্তা ও উপ-মুখপাত্র রিকার্ডো পিরেস জানিয়েছেন যে, গাজায় এখনো প্রায় আট লাখ শিশু বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে। তাদের অধিকাংশকে তাঁবু কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়িতে অনিরাপদ পরিবেশে দিন কাটাতে হচ্ছে। যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, স্বজন হারানোর বেদনা, নিরাপত্তাহীনতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এসব শিশুর প্রায় সবারই মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন। অথচ যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও গাজায় ৩৪০ জনের বেশি শিশু নিহত হয়েছে এবং শত শত শিশু আহত হয়েছে বলে ইউনিসেফ জানিয়েছে। যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্য যদি মানুষের জীবন রক্ষা এবং মানবিক বিপর্যয় বন্ধ করা হয়, তাহলে এর পরও শিশুদের হত্যা অব্যাহত থাকা আন্তর্জাতিক উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। যুদ্ধবিরতি কেবল ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; তা বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। বেসামরিক মানুষ, বিশেষত শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হামলা বন্ধ রাখা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অপরিহার্য দায়িত্ব।
আসন্ন শীত গাজার শিশুদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। অতিরিক্ত জনাকীর্ণ আশ্রয়কেন্দ্র, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং নিম্নমানের জীবনযাত্রা তাদের নানা রোগ ও নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে ফেলছে। ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর কিংবা অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাসকারী শিশুদের জন্য শীতবস্ত্র, নিরাপদ আশ্রয়, পুষ্টিকর খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। অপুষ্টি, সংক্রামক রোগ এবং মানসিক ট্রমার সম্মিলিত প্রভাব তাদের স্বাভাবিক বিকাশকে দীর্ঘমেয়াদে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তাই আসন্ন শীতের আগেই পর্যাপ্ত ত্রাণ ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তবে সংকটের মধ্যেও কিছু অগ্রগতি আশার সঞ্চার করেছে। যুদ্ধবিরতির ফলে মানবিক সহায়তা ও বাণিজ্যিক পণ্য সরবরাহ বেড়েছে এবং খাদ্যনিরাপত্তায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে। পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ লাখ ৬০ হাজারের বেশি শিশু আবার লেখাপড়ায় ফিরেছে; এর মধ্যে সংস্থাটির পরিচালিত দুই শতাধিক শিক্ষাকেন্দ্রও রয়েছে। এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিক্ষা শিশুদের শুধু জ্ঞান অর্জনের সুযোগ দেয় না, বরং যুদ্ধের মানসিক ক্ষত কাটিয়ে ওঠা, সামাজিক সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথও তৈরি করে। কিন্তু শিক্ষাকেন্দ্রে ফিরে যাওয়াই যথেষ্ট নয়; নিরাপদ পরিবেশ, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
গাজার পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার বিপর্যয় পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, সেখানকার ছয়টি বর্জ্য শোধনাগারই অচল হয়ে পড়েছে। ফলে অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি সাগরে গিয়ে পড়ছে, যা পরিবেশদূষণ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর হুমকি। বিশুদ্ধ পানি ও কার্যকর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ছাড়া জনাকীর্ণ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে। তাই খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহের পাশাপাশি পানি, স্যানিটেশন এবং জরুরি অবকাঠামো পুনরুদ্ধারকে মানবিক সহায়তার অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। গাজার সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব শুধু উদ্বেগ প্রকাশ কিংবা ত্রাণ পাঠানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখা, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশাধিকার বজায় রাখা এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পানি-স্যানিটেশন অবকাঠামো পুনর্গঠনে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক নীতিমালা অনুযায়ী শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে যুদ্ধে বাবা-মা হারানো শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, মানসিক চিকিৎসা ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য আন্তর্জাতিক তহবিল গঠন এবং জবাবদিহিমূলক কর্মসূচি গ্রহণ জরুরি।
