শৈশব মানুষের জীবনের এমন একটি সময়, যখন অনেকেই ভালো-মন্দের পার্থক্য পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেন না। কখনো কৌতূহলবশত, কখনো লোভে কিংবা নিছক ছেলেমানুষিতে কেউ বাবা-মায়ের পকেট থেকে টাকা নিয়ে ফেলেন, পরিবারের কাউকে না জানিয়ে কারও বাগান থেকে ফল পেড়ে খান কিংবা অন্যের কোনো জিনিস অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করেন। তখন বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব না দিলেও বড় হওয়ার পর অনেকের মনে অনুশোচনা জাগে। তারা ভাবতে থাকেন, সেই অন্যায়ের জন্য কীভাবে ক্ষমা পাবেন এবং যার অধিকার নষ্ট করেছেন, তার কাছে কীভাবে দায়মুক্ত হবেন।
ইসলাম মানুষকে ভুল থেকে ফিরে আসার এবং সংশোধিত হওয়ার শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও দয়ালু। তবে কোনো অন্যায়ের সঙ্গে মানুষের অধিকার জড়িত থাকলে শুধু অনুতপ্ত হওয়াই যথেষ্ট নয়; যথাসম্ভব সেই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ারও চেষ্টা করতে হয়। এমনই একটি প্রশ্ন হলো— শৈশবে/ছোটবেলায় কারও কাছ থেকে টাকা চুরি করেছিলেন, কিন্তু এখন সঠিক পরিমাণ মনে নেই। পরে অনুমান করে কিছু টাকা ফেরত দিয়েছেন। এতে কি দায়মুক্ত হওয়া যাবে? ইসলামের নির্দেশনাই বা কী?
এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা জরুরি। প্রথমত— ওই কাজের সময় তার বয়স কত ছিল এবং তিনি বালেগ হয়েছিলেন কি না। দ্বিতীয়ত— কত টাকা নেওয়া হয়েছিল, তা কতটুকু মনে আছে। তৃতীয়ত— ফেরত দেওয়া অর্থের পরিমাণ প্রকৃত পাওনার সমান বা তার চেয়ে বেশি হওয়ার যুক্তিসংগত ধারণা রয়েছে কি না।
ইসলামে মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কেউ শৈশবে অন্যায় করে থাকলেও বড় হওয়ার পর বিষয়টি বুঝতে পারলে যথাসম্ভব সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
তওবা ও মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার গুরুত্ব
আল্লাহ তাআলা তওবাকারীদের ভালোবাসেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে—
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্রতা অর্জন করে, তাদেরও ভালোবাসেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২২২)
এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, ভুল বুঝতে পারার পর আল্লাহর দিকে ফিরে আসা এবং নিজেকে সংশোধন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে চুরি বা আত্মসাতের মতো কাজে অন্য মানুষের অধিকার জড়িত থাকে। তাই এ ধরনের অন্যায় থেকে দায়মুক্ত হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পাওনা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
সাধারণভাবে তওবার ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—
১. অন্যায় কাজের জন্য আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া।
২. ভবিষ্যতে এমন অন্যায় না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
৩. অন্যের অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করা।
মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি কুরআনের নির্দেশনাতেও স্পষ্ট। আল্লাহ তাআলা বলেন—
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা যেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দাও।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৫৮)
যদিও আয়াতটি আমানত যথাযথভাবে আদায়ের নির্দেশ দিয়েছে, এর অন্তর্নিহিত নীতি হলো—অন্যের অধিকার যথাযথভাবে ফিরিয়ে দিতে হবে। সুতরাং কারও টাকা অন্যায়ভাবে নিয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা জরুরি।
অনুমান করে টাকা ফেরত দিলে কি দায়মুক্ত হওয়া যাবে?
সঠিক পরিমাণ মনে করতে না পারলে অনুমান করে কিছু টাকা ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো— ফেরত দেওয়া অর্থ প্রকৃত পাওনার সমান বা তার চেয়ে বেশি হয়েছে বলে তার যুক্তিসংগত ধারণা রয়েছে কি না।
যদি তিনি যথাসাধ্য হিসাব করে এমন পরিমাণ টাকা ফেরত দিয়ে থাকেন, যাতে তার প্রবল ধারণা হয় যে পাওনাদারের প্রাপ্য পূরণ হয়েছে, তাহলে ইনশাআল্লাহ দায়মুক্ত হওয়ার আশা করা যায়। তবে শুধু অনুমান করে কিছু টাকা দেওয়াই যে সব ক্ষেত্রে যথেষ্ট, এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না।
যদি এখনো যুক্তিসংগত আশঙ্কা থাকে যে ফেরত দেওয়া টাকা প্রকৃত পাওনার চেয়ে কম, তাহলে সামর্থ্য অনুযায়ী আরও কিছু টাকা দেওয়া উত্তম। এতে পাওনাদারের অধিকার পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
এ জন্য পুরো ঘটনা প্রকাশ করতেই হবে, এমন নয়। পাওনাদারকে উপহার, আর্থিক সহায়তা কিংবা অন্য কোনো বৈধ উপায়ে টাকা দেওয়া যেতে পারে। তবে টাকা দেওয়ার পদ্ধতিটি এমন হওয়া উচিত, যাতে তার প্রাপ্য বাস্তবে পূরণ হয়।
আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার: পাওনাদার জীবিত থাকলে তার অধিকার পূরণ করতে হবে। তিনি মারা গিয়ে থাকলে তার উত্তরাধিকারীদের কাছে পাওনা পৌঁছে দেওয়ার বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।
অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় চুরি করলে কি গুনাহ লেখা হয়?
যদি কেউ অপ্রাপ্তবয়স্ক কিংবা ১২-১৩ বছর বয়সের নিচে চুরি করেন এ ক্ষেত্রে তার বালেগ হওয়ার অবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইসলামে শরয়ি দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ক্ষেত্রে বালেগ হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَحْتَلِمَ، وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ
‘তিন ব্যক্তির ওপর থেকে (শরয়ি দায়বদ্ধতার) কলম উঠিয়ে রাখা হয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি জাগ্রত হওয়া পর্যন্ত, শিশু বালেগ হওয়া পর্যন্ত এবং মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি সুস্থ বুদ্ধি ফিরে পাওয়া পর্যন্ত।’ (আবু দাউদ ৪৪০৩)
এই হাদিস অনুযায়ী, বালেগ হওয়ার আগে শিশুর ওপর প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির মতো গুনাহের দায় আরোপ করা হয় না। তবে এর অর্থ এই নয় যে, অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় অন্যের সম্পদ নিয়ে ফেললে সেই সম্পদের অধিকারও বিলুপ্ত হয়ে যায়।
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে—
আল্লাহর কাছে গুনাহের দায়: বালেগ হওয়ার আগে শরয়ি দায়বদ্ধতার বিধান প্রাপ্তবয়স্কদের মতো নয়।
মানুষের সম্পদের অধিকার: শিশুর দ্বারা অন্যের সম্পদ নষ্ট বা আত্মসাৎ হলেও মালিকের সম্পদের অধিকার নষ্ট হয় না। তাই সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
তাই চুরি করা ব্যক্তি যদি বালেগ না হয়ে থাকেন, তাহলে তার সেই বয়সের কাজের জন্য প্রাপ্তবয়স্কদের মতো গুনাহের দায় প্রযোজ্য নয়। কিন্তু অন্যের টাকা নেওয়ার কারণে যে আর্থিক অধিকার তৈরি হয়েছে, তা যথাসম্ভব ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া সঠিক কাজ।
এখন তার করণীয় কী?
উল্লেখিত ব্যক্তি যেহেতু নিজের ভুলটি বুঝতে পেরেছেন, অনুতপ্ত হয়েছেন এবং অনুমান করে টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এখন তার করণীয় হলো—
১. পাওনার পরিমাণ যথাসম্ভব নির্ধারণ করা: পুরোনো ঘটনা মনে করার চেষ্টা করে আনুমানিক হিসাব করা।
২. প্রয়োজনে আরও টাকা ফিরিয়ে দেওয়া: যদি মনে হয় আগের দেওয়া টাকা কম হয়েছে, তাহলে সামর্থ্য অনুযায়ী আরও দিন।
৩. অপ্রয়োজনীয়ভাবে নিজেকে প্রকাশ না করা: পাওনা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য চুরির ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা সব সময় জরুরি নয়। তবে প্রয়োজনে সত্য গোপন করে অন্যায় করা যাবে না।
৪. আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া ও নেক আমল বাড়ানো: আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং ভবিষ্যতে অন্যের সম্পদের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন।
৫. অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় না ভোগা: যথাসাধ্য হিসাব করে পাওনা ফিরিয়ে দেওয়ার পর যদি যুক্তিসংগতভাবে মনে হয় যে অধিকার পূরণ হয়েছে, তাহলে অমূলক সন্দেহে নিজেকে কষ্ট দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
শৈশবে ভুলবশত বা না বুঝে অন্যের টাকা নিয়ে ফেললে বড় হওয়ার পর অনুশোচনা হওয়া এবং সেই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা প্রশংসনীয়। ইসলাম মানুষকে ভুল থেকে ফিরে আসার সুযোগ দেয় এবং তওবার দরজা উন্মুক্ত রাখে। তবে মানুষের সম্পদের অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে যথাসম্ভব তা ফিরিয়ে দেওয়াও জরুরি। শৈশবের ভুলের জন্য হতাশ না হয়ে সংশোধনের পথে এগিয়ে আসুন। আল্লাহর রহমতের আশা রাখুন, মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিন এবং ভবিষ্যতে সততা ও আমানতদারির সঙ্গে জীবনযাপন করুন।